শ্যাওলা খেয়ে সূর্যের আলো থেকে শক্তি

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

সমুদ্রের পানিতে ভেসে থাকা ছোট্ট সবুজ কোনো পাতা— দূর থেকে এমনটাই মনে হতে পারে। কাছে গেলে দেখা যাবে, সেটি আসলে

2026-10-03T01:31:18+00:00
2026-10-03T01:31:18+00:00
 
  শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬,
১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
শ্যাওলা খেয়ে সূর্যের আলো থেকে শক্তি
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩১ এএম 
এলিসিয়া প্রজাতির নরমদেহী এক ধরনের সামুদ্রিক সি স্লাগ। ছবি : সংগৃহীত
সমুদ্রের পানিতে ভেসে থাকা ছোট্ট সবুজ কোনো পাতা— দূর থেকে এমনটাই মনে হতে পারে। কাছে গেলে দেখা যাবে, সেটি আসলে একটি প্রাণী। নাম এলিসিয়া, এক ধরনের নরমদেহী সামুদ্রিক সি স্লাগ। তবে অন্য প্রাণীদের মতো শুধু খাবার খেয়ে বেঁচে থাকার বদলে এলিসিয়ার কিছু প্রজাতি এমন এক অদ্ভুত কৌশল ব্যবহার করে, যা প্রাণিজগতে অত্যন্ত বিরল। 

শ্যাওলা খাওয়ার সময় তারা শ্যাওলার ভেতরের ক্লোরোপ্লাস্ট নামের বিশেষ অংশ নিজের শরীরে রেখে দেয়। এরপর সেই ক্লোরোপ্লাস্ট সূর্যের আলো ব্যবহার করে শক্তি তৈরির কাজ চালিয়ে যায়। ফলে প্রাণীটি কিছু সময়ের জন্য অনেকটা গাছের মতোই সূর্যের আলো থেকে শক্তি পেতে পারে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্লোরোপ্লাস্ট। উদ্ভিদ ও শ্যাওলার কোষের ভেতরে থাকা এই ক্ষুদ্র অঙ্গাণুতেই ফোটোসিন্থেসিস বা সালোকসংশ্লেষণ ঘটে। সূর্যের আলো ব্যবহার করে পানি ও কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে জৈব শক্তি তৈরির এই প্রক্রিয়াই গাছকে নিজের খাবার তৈরি করতে সাহায্য করে। 

সাধারণ প্রাণীর শরীরে খাবারের সঙ্গে ঢুকে পড়া ক্লোরোপ্লাস্ট হজম হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এলিসিয়ার ক্ষেত্রে ঘটে ঠিক উল্টোটা। প্রাণীটি শ্যাওলার কোষ থেকে ক্লোরোপ্লাস্ট আলাদা করে নেয় এবং নিজের শরীরে সেগুলো জমা রাখে।

বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়ার নাম দিয়েছেন ক্লেপ্টোপ্লাস্টি। সহজ করে বললে, অন্য জীবের কাছ থেকে ফোটোসিন্থেসিসের যন্ত্র ‘চুরি’ করে নিজের কাজে লাগানো। এলিসিয়া শ্যাওলা খাওয়ার সময় সেটির কোষের ভেতরের ক্লোরোপ্লাস্ট নিজের শরীরে টেনে নেয়, কিন্তু শ্যাওলার অন্যান্য অংশ হজম করে ফেলে। ফলে খাবার থেকে পাওয়া এই ক্লোরোপ্লাস্ট তার শরীরের ভেতরে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকতে পারে।

এই ক্লোরোপ্লাস্টই এলিসিয়ার শরীরকে উজ্জ্বল সবুজ দেখানোর অন্যতম কারণ। কিছু প্রজাতির শরীর এতটাই পাতার মতো যে শ্যাওলার মধ্যে থাকলে তাদের আলাদা করে চেনাই কঠিন। তাদের এই সবুজ রং আশপাশের পরিবেশে মিশে থাকতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে শরীরে জমা ক্লোরোপ্লাস্ট আলোর উপস্থিতিতে ফোটোসিন্থেসিস চালিয়ে যায়। এর মাধ্যমে প্রাণীটির শরীরে কিছু পরিমাণ শক্তি তৈরি হয়।

২০২৫ সালে ‘সেল’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এই অদ্ভুত ক্ষমতার পেছনে থাকা আরও একটি রহস্যের সন্ধান পাওয়া যায়। গবেষকরা এলিসিয়া ক্রিসপাতার শরীরে শ্যাওলা থেকে নেওয়া ক্লোরোপ্লাস্ট কোথায় এবং কীভাবে দীর্ঘ সময় টিকে থাকে তা বিশ্লেষণ করেন। তারা দেখতে পান, ক্লোরোপ্লাস্টগুলো প্রাণীটির শরীরের কোষে এলোমেলোভাবে পড়ে থাকে না। বরং এগুলো বিশেষ এক ধরনের কোষীয় কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়। গবেষকরা সেই কাঠামোর নাম দিয়েছেন ‘ক্লেপ্টোসোম’।

ক্লেপ্টোসোম ক্লোরোপ্লাস্টকে শরীরের ভেতরে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে এবং সেগুলোকে দীর্ঘ সময় কার্যকর থাকার সুযোগ দেয়। অর্থাৎ এলিসিয়া শুধু ক্লোরোপ্লাস্ট চুরি করেই থেমে থাকে না, নিজের শরীরের ভেতরে সেগুলোকে ধরে রাখার জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও তৈরি করেছে। এ কারণেই কয়েকটি প্রজাতি শ্যাওলা খাওয়ার পর অনেক দিন নতুন করে খাবার না খেলেও টিকে থাকতে পারে।

এখানেই শেষ নয়, দীর্ঘ সময় খাবার না পেলে এলিসিয়া তার শরীরে জমা থাকা ক্লোরোপ্লাস্টকে প্রয়োজনে আবার খাবার হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, কয়েক সপ্তাহ অনাহারে থাকার পর প্রাণীটির শরীরের সবুজ রং ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। একই সঙ্গে ফোটোসিন্থেসিসের ক্ষমতাও কমে যায়। অর্থাৎ শরীরে থাকা ক্লোরোপ্লাস্ট একদিকে সূর্যের আলো থেকে শক্তি তৈরির কাজ করে, অন্যদিকে খাবারের সংকট দেখা দিলে সেগুলো ভেঙে শরীরের জন্য পুষ্টির উৎস হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।

এই কারণেই এলিসিয়াকে অনেক সময় ‘সৌরশক্তিচালিত সি স্লাগ’ বলা হয়। বিশেষ করে এলিসিয়া ক্লোরোটিকার মতো কিছু প্রজাতি পর্যাপ্ত শ্যাওলা খাওয়ার পর দীর্ঘ সময় নতুন করে খাবার ছাড়াই টিকে থাকতে পারে। পর্যাপ্ত ক্লোরোপ্লাস্ট সংগ্রহ করতে পারলে এদের কয়েকটি প্রজাতি প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের বড় একটি অংশ আবার শ্যাওলা না খেয়েও কাটাতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রাণীটি গাছ হয়ে যায়। এটি প্রাণীই থাকে এবং তার সূর্যালোকনির্ভর ব্যবস্থা পুরোপুরি নির্ভর করে অন্য জীব থেকে সংগ্রহ করা ক্লোরোপ্লাস্টের ওপর।

বিজ্ঞানীদের কাছে এই প্রাণীটি তাই শুধু প্রকৃতির একটি অদ্ভুত কৌশলের উদাহরণ নয়। এর মাধ্যমে কোষ কীভাবে অন্য জীবের অংশ নিজের ভেতরে গ্রহণ করে এবং দীর্ঘ সময় কার্যকর রাখে, সে সম্পর্কেও নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। জীবের বিবর্তনের ইতিহাসেও কোষের ভেতরে অন্য জীবের অংশগ্রহণের ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। 

কোটি কোটি বছর আগে এক ধরনের কোষ অন্য একটি জীবকে নিজের ভেতরে নিয়ে তাকে ধ্বংস না করে কাজে লাগাতে শুরু করেছিল— এমন প্রক্রিয়ার দীর্ঘ বিবর্তনের ফলেই আধুনিক কোষের মাইটোকন্ড্রিয়া ও ক্লোরোপ্লাস্টের মতো অঙ্গাণুর উৎপত্তি হয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। এলিসিয়া সেই প্রাচীন ঘটনার সরাসরি পুনরাবৃত্তি করছে না, তবে তার শরীরে অন্য জীবের অংশ দীর্ঘ সময় সক্রিয় রাখার ক্ষমতা বিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি জীবন্ত উদাহরণ।

এলিসিয়ার এই ক্ষমতা ভবিষ্যতে জীবপ্রযুক্তির গবেষণায়ও কাজে লাগতে পারে। অন্য কোষে ফোটোসিন্থেসিসের ব্যবস্থা কীভাবে চালু করা যায়, বিদেশি অঙ্গাণুকে কীভাবে দীর্ঘ সময় কার্যকর রাখা যায় এবং কোষ কীভাবে ভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া জৈব উপাদানকে নিজের কাজে ব্যবহার করে— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এই প্রাণীকে নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে মানুষের জন্য ‘জীবন্ত সৌরপ্যানেল’ তৈরি হয়ে গেছে বা শিগগিরই এমন প্রযুক্তি পাওয়া যাবে— এমন কোনো প্রমাণ এখনও নেই। এসব সম্ভাবনা এখনও গবেষণার পর্যায়েই রয়েছে।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এলিসিয়া সূর্যের আলো সরাসরি খায় না। সে আগে শ্যাওলা খায়, তারপর শ্যাওলার সূর্যালোক ধরার যন্ত্র নিজের শরীরে রেখে দেয়। সেই ক্লোরোপ্লাস্ট আলো পেলেই ফোটোসিন্থেসিস চালিয়ে যায়। অর্থাৎ সমুদ্রের তলায় পাতার মতো দেখতে ছোট্ট এই প্রাণীটি নিজের শরীরে এমন এক জৈব ব্যবস্থা তৈরি করে, যা তাকে সূর্যের আলো থেকে শক্তি পেতে সাহায্য করে। খাবার ফুরিয়ে গেলে সেই সঞ্চিত ক্লোরোপ্লাস্টই আবার তার জন্য জরুরি শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রকৃতিতে বেঁচে থাকার কৌশল যে কতটা অপ্রত্যাশিত হতে পারে, এলিসিয়া তারই এক অসাধারণ উদাহরণ।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও
  বিষয়:   শ্যাওলা  সূর্যের আলো  শক্তি 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: