বাংলাদেশ কীভাবে এশিয়ার উন্নয়ন মডেলের সাম্প্রতিক উদাহরণ হতে পারে

সময়ের আলো ডেস্ক

জাতীয়

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। তাদের শ্রম কেবল দেশের রফতানি খাতকে এগিয়ে আনে নি, বরং

2026-03-26T19:48:01+00:00
2026-03-26T19:48:01+00:00
 
  শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬,
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
বাংলাদেশ কীভাবে এশিয়ার উন্নয়ন মডেলের সাম্প্রতিক উদাহরণ হতে পারে
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬, ৭:৪৮ পিএম 
তৈরি পোশাক শিল্প। সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। তাদের শ্রম কেবল দেশের রফতানি খাতকে এগিয়ে আনে নি, বরং করের ভিত্তিও তৈরি করেছে। এই শিল্প দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১১ শতাংশে অবদান রাখে। শ্রমিকদের প্রদানকৃত কর এবং তাদের কর্মসংস্থানই বিস্তৃত অর্থনীতিকে সহায়তা করছে, যা সরকারি স্কুল এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থ যোগাচ্ছে।  

কয়েক দশক ধরে এই শিল্প দরিদ্রতম দেশগুলোর মধ্যে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের পর্যায়ে উন্নীত করেছে। দেশটি এখন জাতিসংঘের ‘স্বল্পোন্নত দেশ’ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের মানদণ্ড পূরণে কাজ করছে। আধুনিক উন্নয়ন মডেলটি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে অন্য কোনো দেশ কি এই পথ অনুসরণ করতে পারবে? 

এই মডেল একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দেশগুলো সস্তা শ্রম দিয়ে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রবেশ করে, কর্মসংস্থান তৈরি করে পারিবারিক আয় বৃদ্ধি করে। আয় বৃদ্ধি পেলে করভিত্তি তৈরি হয়, যা স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং অবকাঠামোতে সরকারি বিনিয়োগে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে ধীরে ধীরে অর্থনীতি উচ্চ-মূল্য সংযোজনের দিকে এগোয়।

দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং চীন এই পথের কোনো না কোনো সংস্করণ অনুসরণ করেছে। বাংলাদেশও একই পথ অনুসরণ করেছে। বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্য থেকে বের করার ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রমাণিত পথ এবং এত বড় পরিসরে অন্য কোনো মডেল কার্যকর হয়নি।

তবে এআই এই পথের জন্য নতুন হুমকি সৃষ্টি করছে। সমস্যা মূলত সরাসরি শ্রম প্রতিস্থাপনের মধ্যে নয়, বরং সেই কারণগুলো সরিয়ে দিচ্ছে যা স্বল্প মজুরির দেশে উৎপাদন শুরু করার পেছনে কাজ করেছিল। যেমন এআই-চালিত কাটিং মেশিন এবং রোবোটিক সেলাই প্রযুক্তি যত সস্তা হচ্ছে, ঢাকার একজন শ্রমিক এবং গুয়াংডংয়ের একটি যন্ত্রের খরচের পার্থক্য কমছে। 

এক সময় এই যুক্তি উল্টে যায়। তখন কাঁচামাল স্বল্প মজুরির দেশে পাঠিয়ে প্রস্তুত পণ্য ফেরত আনার পরিবর্তে ভোক্তা বাজারের কাছাকাছি স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন করা বেশি যুক্তিসংগত হয়। ফলে কারখানাগুলো শুধু বিদ্যমান শ্রমিক ছাঁটাই করে না, নতুন শ্রমিকও নেয় না। এমন কারখানার ওপর সরকার কর আরোপ করতে পারে না, যা তার ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এটি এআইকে পূর্বের স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থার থেকে আলাদা করে। হুমকি শুধুমাত্র বিদ্যমান চাকরির জন্য নয়, বরং পুরো উন্নয়ন মডেলের জন্য। বিংশ শতকে এই ধারাবাহিকতা কেবল কর রাজস্বই দেয়নি, এটি ব্যাপক কর্মসংস্থান, পারিবারিক আয়, অভ্যন্তরীণ ভোগ, দক্ষতা সঞ্চয় এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি গঠনে অবদান রেখেছে।

তাত্ত্বিকভাবে, খুব বেশি মানুষের নিয়োগ ছাড়াই কোনো দেশ পণ্যের ওপর কর আদায় করতে পারে, তবে সেটি প্রকৃত অর্থে উন্নয়ন নয়। এটি সম্পদনির্ভর অর্থনীতি, যা রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল। কর্মসংস্থান থেকে পুনর্বণ্টনের শৃঙ্খল শুধু আর্থিক প্রক্রিয়া নয়, এটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠনের সামাজিক ভিত্তি।

এআই ও কর্মসংস্থান নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনায় একটি মূল সমস্যা হলো—এখানে প্রধান চরিত্র সফটওয়্যার প্রকৌশলী, প্যারালিগ্যাল এবং আর্থিক বিশ্লেষক। তাদের প্ল্যাটফর্ম ও নীতিনির্ধারকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে। তারা চাকরি হারালে তা নীতিগত সংকটে পরিণত হয়। কিন্তু একই কাঠামোগত শক্তি যখন উন্নয়নশীল দেশের কারখানার মেঝে দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন তা প্রায় এআই গল্প হিসেবেই দেখা হয় না।

অনেক উন্নয়নশীল দেশের যুক্তি অনুযায়ী—এআই হোয়াইট-কলার জ্ঞানভিত্তিক কাজকে প্রভাবিত করে, কিন্তু তারা এখনো উৎপাদন খাতে আছে, তাই সময় আছে। এই যুক্তি বুঝতে চায় না যে স্বয়ংক্রিয়তা কত দ্রুত একটি দেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ক্ষয় করতে পারে।


এআই শাসন নিয়ে আলোচনা মূলত তাদের দেশগুলোকে কেন্দ্র করে যারা সবচেয়ে উন্নত মডেল তৈরি ও ব্যবহার করে। সেখানে অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত, ভুয়া তথ্য এবং নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি বেশি আলোচিত। এগুলো বাস্তব ঝুঁকি, তবে এগুলো এমন সমাজের ঝুঁকি যেখানে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং বহুমুখী করভিত্তি বিদ্যমান।

এ আলোচনার পরিসর সম্প্রসারিত হচ্ছে। এ বছর ভারতের এআই সম্মেলনে ‘প্রভাব’ বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা ইতিবাচক। তবে আলোচনায় প্রযুক্তি গ্রহণ এবং শ্রমনির্ভর অর্থনীতির করভিত্তির কাঠামোগত হুমকির বিষয়টি পর্যাপ্তভাবে উঠে আসে না। এআই শাসনকে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখানো বাস্তব চিত্রকে বিকৃত করে।

শত কোটি উৎপাদন শ্রমিক এবং নির্মাণাধীন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে চীনও একই পুনর্বণ্টন ঝুঁকির মুখে। প্রকৃত বিভাজন প্রযুক্তি নেতৃস্থানীয় ও অনুসারী দেশের মধ্যে নয়, বরং সেই দেশগুলোর মধ্যে যারা পুনর্বণ্টন ব্যবস্থা সামলাতে পারবে এবং যারা পারবে না।

অর্থনৈতিক দিকটিও সমস্যা জোরদার করে। উন্নয়নশীল দেশগুলো সহজে হারানো শ্রম থেকে কর আদায় করতে পারে না। বিদেশি কোম্পানির মুনাফা স্থানান্তর ঠেকাতে ওইসিডির বৈশ্বিক ন্যূনতম কর সংস্কার করা হয়েছে, কিন্তু কিছু কোম্পানির ক্ষেত্রে এর কোনো সমাধান নেই।

সুতরাং, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এআই-চালিত শ্রম স্থানচ্যুতির আর্থিক প্রভাবকে বৈশ্বিক আলোচ্যসূচিতে তোলার জন্য চাপ দিতে হবে। জি-২০-এ একটি বিশেষ কর্মদল গঠনের দাবি জানানো উচিত, যা এআই নয়, বরং শ্রমনির্ভর অর্থনীতির করভিত্তির ওপর এর কাঠামোগত প্রভাব নিয়ে কাজ করবে। আন্তর্জাতিক কর কাঠামো হালনাগাদ করা জরুরি। পরবর্তী বড় এআই সম্মেলনে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোকে এই পুনর্বণ্টন কাঠামোর ঝুঁকির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও তোলা উচিত।

বাংলাদেশ সফল হয়েছে। এখন যারা অপেক্ষা করছে, তাদের জন্য প্রশ্ন আর এ নয় যে এআই শেষ পর্যন্ত তাদের কারখানায় পৌঁছাবে কি না, বরং কারখানাগুলো আদৌ নির্মাণ হবে কি না। 


/ইউএমএইচ


  বিষয়:   এশিয়ার উন্নয়ন মডেল  বাংলাদেশ 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: