ইতালীয় ফুটবলের নীল আকাশে ফের কালো মেঘের ঘনঘটা। টানা দুই বিশ্বকাপে দর্শক হয়ে থাকার পর এবার আশা ছিল ২০২৬ উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে অন্তত দেখা যাবে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। গেল দুই আসরে ৩২ দলের বিশ্বকাপে ভাগ্য বিধাতা মুখ তুলে চাননি। এবার যেহেতু ৪৮ দল নিয়ে হবে, সেহেতু ইতালির সমর্থকদের মতো বিশ্বের অন্য দলগুলোরও প্রত্যাশা ছিল হয়তো শিকে ছিঁড়বে?
কিন্তু বিধি বাম! টানা দুই আসরের মতো এবারও প্লে-অফে আটকা পড়ল ইতালি। গতরাতে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে সেই চিরচেনা স্নায়ুচাপের লড়াইয়ে আরও একবার স্বপ্নভঙ্গ দলটির। নির্ধারিত সময়ের লড়াই সমতায় শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকার ভাগ্য পরীক্ষায় বসনিয়ার কাছে হেরে বিদায় নিল রবার্তো মানচিনির উত্তরসূরিরা। এর মাধ্যমে ইতিহাসের এক লজ্জাজনক অধ্যায় রচনা করল ইতালি; টানা তিনবার বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব থেকে বাদ পড়ার দুঃস্বপ্ন এখন তাদের সঙ্গী।
বলা হয় বেদনার রং নাকি নীল! অথচ ইতালি ফুটবল দল নীল রঙের জার্সি গায়ে জড়িয়ে বছরের পর বছর বিশ্ব ফুটবলকে শাসন করেছে। কিন্তু গেল তিন আসরে নীল যেন সত্যিই বেদনার রঙ হয়ে এসেছে আজ্জুরিদের জীবনে। গ্যালারিতে নীল জার্সি পরিহিত লাখো ভক্ত-সমর্থকরা যখন গলা ফাটিয়ে নীল ঢেউ তোলেন, তখন মাঠে খেলোয়াড়দের বিবর্ণ পারফরম্যান্স সেই নীল জলরাশিতে কালবৈশাখীর ছাপ ফেলে দেয়।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার ফুটবলাররাও গতকাল রাত তাই করেছেন। ইতালির নীল সমুদ্রে ‘নিউম’ ঝড় তুলে আজ্জুরিদের হৃদয়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। নিউম বসনিয়ার বিখ্যাত উপকূল, যেখানে অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ে। গতকাল ইতালির নীল সমুদ্রের জলরাশি অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের সঙ্গে মিতালি গড়ার আগেই নিউম ঝড়ের কবলে পড়ে।
বসনিয়ার বিপক্ষে গতকাল শুরু থেকেই সাবধানী ছিল ইতালি। নির্ধারিত সময়ের খেলা ১-১ গোলে নিষ্পত্তির পর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। তবে টাইব্রেকার পরীক্ষায় মন্দ ভাগ্য ইতালির। ৪-১ (১-১) গোলের ব্যবধানে হেরে যায় দলটি। পুরো ৯০ মিনিট বসনিয়ার রক্ষণব্যুহ ভাঙতে মরিয়া হয়ে লড়েছে নীল জার্সিধারীরা। বলের দখল এবং আক্রমণ- সবকিছুতেই আধিপত্য ছিল ইতালির, কিন্তু ফিনিশিং লাইনে গিয়ে বারবার খেই হারিয়েছে তাদের ফরোয়ার্ডরা। ম্যাচের শুরুতেই ভাগ্যের সহায়তায় লিড পায় ইতালি।
১৫ মিনিটে বসনিয়ার গোলরক্ষকের এক মারাত্মক ভুলে বল পেয়ে যান নিকোলো বারেল্লা। সতীর্থের ব্যাক-পাস ক্লিয়ার করতে গিয়ে করা সেই ভুলের পূর্ণ সুযোগ নেন বারেল্লা; তার বাড়ানো পাসে বক্সের বাইরে থেকে নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে ইতালিকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন ফরোয়ার্ড ময়েস কিন। তবে গোল খেয়ে দমে না গিয়ে একের পর এক আক্রমণ শানাতে থাকে বসনিয়া। কিন্তু ফিনিশিংয়ের দুর্বলতা আর ইতালিয়ান গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মার দেয়াল হয়ে দাঁড়ানোর কারণে বারবার হতাশ হতে হয় তাদের।
ম্যাচের ৪১ মিনিটে বড় ধাক্কা খায় ইতালি। বল নিয়ে বিপজ্জনকভাবে এগিয়ে যাওয়া বসনিয়ার মেমিককে বক্সের ঠিক বাইরে ফাউল করে বসেন ডিফেন্ডার আলেসসান্দ্রো বাস্তোনি। রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখালে ১০ জনের দলে পরিণত হয় ইতালি। দ্বিতীয়ার্ধের ৬০ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেন কিন। মাঝমাঠ থেকে একাই বল টেনে নিয়ে গোলরক্ষককে একা পেয়েও শটটি গোলপোস্টের অনেক ওপর দিয়ে মারেন ২৬ বছর বয়সি এই ফরোয়ার্ড। এই সুযোগ নষ্টের খেসারত ইতালিকে দিতে হয় ৭৯ মিনিটে। ডান দিক থেকে আসা ক্রসে অভিজ্ঞ এডিন জেকোর প্রচেষ্টাকে দোন্নারুম্মা প্রাথমিক বাধা দিলেও ফিরতি বলে লক্ষ্যভেদ করেন হারিস তাবাকোভিচ।
১-১ সমতায় ফেরার পর নির্ধারিত সময়ের বাকি অংশ এবং অতিরিক্ত সময়ে দুই দলই বেশ কিছু আক্রমণ চালালেও জালের দেখা পায়নি কেউ। টাইব্রেকারে প্রথম শটেই লক্ষ্যভেদ করে বসনিয়াকে উৎসবে মাতান বেঞ্জামিন তাহিরোভিচ। চাপের মুখে ইতালির হয়ে প্রথম শট নিতে এসে ব্যর্থ হন পিও এস্পোসিতো, তার মিসে শুরুতেই ব্যাকফুটে চলে যায় আজ্জুরিরা।
দ্বিতীয় শটে অবশ্য দুই দলই জালের দেখা পায়, যা লড়াইয়ে ফেরার ক্ষীণ আশা জাগিয়ে রেখেছিল ইতালিয়ান শিবিরে। তবে তৃতীয় শটে বসনিয়া গোল পেলেও ইতালির অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার ব্রায়ান ক্রিস্টান্তে বল জালে জড়াতে ব্যর্থ হলে সব সমীকরণ ওলটপালট হয়ে যায়। চতুর্থ শটে বসনিয়া আর কোনো ভুল করেনি; নিখুঁত লক্ষ্যভেদে ৪-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে তারা।
বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ইউরোপিয়ান অঞ্চলের আরেক ম্যাচে রবার্ট লেভানডস্কিও পোল্যান্ডকে হতাশায় ডুবিয়ে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে সুইডেন। প্লে-অফ ফাইনালে ভিক্টোর গায়কোর্সের শেষ মুহূর্তের গোলে পোলিশদের ৩-২ গোলে হারিয়েছে সুইডিশরা। ডেনমার্ককে টাইব্রেকারে ৩-১ গোলে হারিয়ে উইরোপ অঞ্চলের আরেক দল হিসেেেব বিশ্বকাপের টিকেট কাটে চেক রিপাবলিক। কসোভোকে ১-০ গোলে হারিয়ে ২৪ বছর পর বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় তুরস্ক।
এদিকে বিশ্বকাপের আন্তঃমহাদেশীয় দুটি প্লে-অফে ম্যাচ জিতে দীর্ঘ বিরতির পর বিশ্বকাপের জায়গা করে নেয় ডিআর কঙ্গো ও ইরাক। জ্যামাইকাকে ১-০ গোলে হারিয়ে হাইতির মতো ডিআর কঙ্গো ৫২ বছর পর বিশ্ব আসরে জায়গা করে নেয় আফ্রিকা অঞ্চলের দেশটি। এটিই কোনো দেশের দুটি বিশ্বকাপের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা বিরতি এবার। আরেক প্লে-অফে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে ৪০ বছর পর বিশ্বকাপের টিকেট কাটে ইরাক।
সময়ের আলো/আআ