ফুটবলে আক্রমণ যতই ধারালো হোক, দীর্ঘ টুর্নামেন্টে সাফল্যের ভিত্তি তৈরি হয় রক্ষণে। একটি ভুল, এক আনমার্কড খেলোয়াড় কিংবা সামান্য জায়গা ছেড়ে দেওয়াই বদলে দিতে পারে পুরো ম্যাচের চিত্র। ফিফা আসিয়ান কাপের মঞ্চে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি, রক্ষণভাগ কতটা সামলাতে পারবে চাপ?
তপু বর্মণ ও বিশ্বনাথ ঘোষের অনুপস্থিতিতে এই জায়গাটিই এখন কোচ টমাস ডুলির জন্য বড় পরীক্ষার। তারিক কাজীকে ঘিরে রক্ষণভাগের নেতৃত্বের প্রত্যাশা থাকলেও তার সঙ্গে সেন্টার-ব্যাকে কে থাকবেন, সেটি এখনও আলোচনার বিষয়। জিদান ইউসুফ ও শাকিল আহাদ তপুর মতো তুলনামূলক নতুন মুখকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিতে হতে পারে। দুই প্রান্তে সাদ উদ্দিন, রহমত মিয়া কিংবা জায়ান আহমেদের ভূমিকার ওপরও নির্ভর করবে পুরো রক্ষণ কাঠামোর ভারসাম্য।
সাম্প্রতিক ম্যাচের পরিসংখ্যান বাংলাদেশের রক্ষণ নিয়ে একেবারে নেতিবাচক বলা যাচ্ছে না। সর্বশেষ আট ম্যাচে বাংলাদেশ করেছে ১০ গোল, বিপরীতে হজম করেছে ১১টি। ভারত ও নেপালের বিপক্ষে ক্লিনশিট এসেছে। সিঙ্গাপুর ও সান ম্যারিনোর বিপক্ষেও রক্ষণ নিয়ে বড় ধরনের অস্বস্তি দেখা যায়নি। তবে ভিয়েতনামের বিপক্ষে তিন গোল এবং ঘরের মাঠে হংকংয়ের কাছে চার গোল হজমের স্মৃতি এখনও সতর্কবার্তা হয়ে আছে।
এই রক্ষণভাগে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা তারিক কাজীর। জাতীয় দলের হয়ে ৩৭ ম্যাচ খেলা এই ডিফেন্ডার সেন্টার-ব্যাকের পাশাপাশি রাইট-ব্যাক হিসেবেও খেলতে পারেন। তপু বর্মণ না থাকায় তার ওপর বাড়তি দায়িত্ব পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু তাকে যদি মাঝখানে খেলানো হয়, তাহলে পাশে থাকা জিদান কিংবা শাকিল তপুকে দিয়ে সেই জায়গার ভারসাম্য কতটা ধরে রাখা যাবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
রাইট-ব্যাকে সাদ উদ্দিনের অভিজ্ঞতা আছে। জাতীয় দলের নিয়মিত সদস্যও তিনি। তবে আক্রমণে তার উঠে যাওয়ার প্রবণতা কখনো কখনো বাংলাদেশের রক্ষণাত্মক ট্রানজিশনে সমস্যা তৈরি করেছে। সাদ সামনে চলে গেলে তার পেছনের জায়গা দ্রুত পূরণ করতে না পারলে প্রতিপক্ষের জন্য তৈরি হয় আক্রমণের পথ।
অন্য প্রান্তে রহমত মিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় দলের হয়ে ২৭ ম্যাচ খেলা এই লেফট-ব্যাক গত কয়েক বছরে অবশ্য নিয়মিত খেলার সুযোগ পাননি। ফলে বড় টুর্নামেন্টের টানা চাপের মধ্যে তার ম্যাচ ফিটনেস ও ছন্দও নজরে থাকবে।
তরুণ শাকিল আহাদ তপুর জন্য আসছে আরও বড় পরীক্ষা। সেন্টার-ব্যাক ও রাইট-ব্যাক; দুই জায়গাতেই খেলতে পারেন তিনি। সিনিয়র দলের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা থাকলেও আসিয়ান কাপের মতো প্রতিযোগিতায় উচ্চচাপের ম্যাচে তাকে কতটা কার্যকর পাওয়া যায়, সেটি এখনও দেখার বিষয়।
আর জায়ান আহমেদকে ঘিরে বাংলাদেশের প্রত্যাশার জায়গাটা একটু আলাদা। বিদেশে বেড়ে ওঠা এই ফুটবলারের সবচেয়ে বড় শক্তি তার গতি। শুধু রক্ষণ সামলানো নয়, জায়গা তৈরি করে দ্রুত বল ওপরে পাঠাতেও পারেন তিনি। লাল-সবুজ জার্সিতে ইতিমধ্যে তার কিছুটা প্রমাণ দিয়েছেন জায়ান। ফলে ডুলির রক্ষণ থেকে আক্রমণে ওঠার পরিকল্পনায়ও তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সবচেয়ে বেশি কৌতূহল অবশ্য জিদান ইউসুফকে ঘিরে। তপু বর্মণের অনুপস্থিতিতে সেন্টার-ব্যাকের জায়গায় বড় দায়িত্ব পেতে পারেন এই তরুণ। বয়সে তরুণ হলেও অনূর্ধ্ব-২০ এএফসি এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। এবার সিনিয়র দলের বড় মঞ্চে সেই অভিজ্ঞতা কতটা কাজে লাগাতে পারেন, সেটিই দেখার।
বাংলাদেশের রক্ষণ নিয়ে আরেকটি পুরোনো সমস্যাও ডুলিকে ভাবাবে। দল প্রথমে গোল হজম করলে অনেক সময় রক্ষণাত্মক লাইন আরও নিচে নেমে যায়। তখন মাঝমাঠ ও ডিফেন্সের মধ্যে তৈরি হয় বড় ফাঁক। প্রতিপক্ষ সেই জায়গা ব্যবহার করতে পারলে পরপর আক্রমণের সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে দুই ফুল-ব্যাক একই সময়ে সামনে উঠে গেলে পেছনের জায়গা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই আসিয়ান কাপে বাংলাদেশের রক্ষণভাগের সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতার ওপর নির্ভর করবে না। তারিকের নেতৃত্ব, জিদানের পরিণত হওয়ার ক্ষমতা, দুই ফুল-ব্যাকের ওঠানামার সমন্বয় এবং মাঝমাঠের সঙ্গে রক্ষণের দূরত্ব। সবকিছুর ওপর নির্ভর করবে এই দেয়াল কতটা অটুট থাকে।
ডুলির সামনে তাই কাজটা শুধু সেরা চার ডিফেন্ডার বেছে নেওয়ার নয় বরং এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে একজন এগিয়ে গেলে অন্যজন তার জায়গা পূরণ করবেন, মাঝমাঠ রক্ষণকে সুরক্ষা দেবে এবং প্রথমে গোল হজম করলেও দল ভেঙে পড়বে না। আসিয়ান কাপে বাংলাদেশের টিকে থাকার বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হবে এই রক্ষণভাগই।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে