হৃদয় জুড়ানো ডাবলসে নতুন ইতিহাস

মেহেদী হাসান

খেলা

সমালোচনার জবাব দিতে কখনো কখনো একটি ইনিংসই যথেষ্ট। আর সেই ইনিংস যদি হয় ডাবল সেঞ্চুরি, তবে তা হয়ে ওঠে আরও

2026-11-07T23:29:39+00:00
2026-11-07T23:29:39+00:00
 
  শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬,
২৩ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
খেলা
হৃদয় জুড়ানো ডাবলসে নতুন ইতিহাস
মেহেদী হাসান
প্রকাশ: শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:২৯ পিএম 
হৃদয়ই সিলেটে ব্যাট হাতে দিলেন সব প্রশ্নের জবাব। ছবি : সংগৃহীত
সমালোচনার জবাব দিতে কখনো কখনো একটি ইনিংসই যথেষ্ট। আর সেই ইনিংস যদি হয় ডাবল সেঞ্চুরি, তবে তা হয়ে ওঠে আরও বিশেষ। এক সপ্তাহ আগেও মিরপুরে খামখেয়ালি শট খেলে আউট হওয়ায় তাওহীদ হৃদয়কে নিয়ে উঠেছিল নানা প্রশ্ন। জাতীয় দলে তার জায়গা নিয়েও শুরু হয়েছিল আলোচনা। সেই হৃদয়ই সিলেটে ব্যাট হাতে দিলেন সব প্রশ্নের জবাব। 

কঠিন পরিস্থিতিতে একপ্রান্ত আগলে রেখে খেললেন দায়িত্বশীল এক ইনিংস। ধৈর্য, দৃঢ়তা আর আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের মিশেলে প্রথমে পেলেন ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি, এরপর সেটিকে রূপ দিলেন ডাবল সেঞ্চুরিতে। তাতেই ভাঙলেন বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের রেকর্ড। সমালোচনার জবাবটা এর চেয়ে জোরালো আর কী হতে পারত!

৩০৪ বলে ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করে বাংলাদেশের চতুর্থ ব্যাটার হিসেবে টেস্টে এই মাইলফলক স্পর্শ করেছেন হৃদয়। তার আগে এই কীর্তি ছিল কেবল মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসানের। তবে তাদের পাশে নাম লেখানোর পাশাপাশি নিজের জন্য আলাদা ইতিহাসও গড়েছেন ২৫ বছর বয়সি এই ব্যাটার। বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটার হিসেবে নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দিয়েছেন তিনি। ছাড়িয়ে গেছেন মুশফিকের অপরাজিত ২১৯ রানের রেকর্ডও, হয়ে উঠেছেন টেস্টে এক ইনিংসে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক।

শনিবার তৃতীয় দিনের খেলা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের ৩ উইকেটে ৮৮ রান নিয়ে। আগের দিন ২৯ রানে অপরাজিত থাকা হৃদয়ের সঙ্গে উইকেটে ছিলেন মুশফিকুর রহিম। দিনের শুরুতে দুজনের ব্যাটে আশার আলো দেখছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ১২৪ থেকে ১৩৮ রানের মধ্যে মুশফিক ও লিটন কুমার দাসকে হারিয়ে আবারও বিপাকে পড়ে স্বাগতিকরা। তখন দলের হাল ধরার দায়িত্ব একাই কাঁধে তুলে নেন হৃদয়।

এরপর একে একে ফিরেছেন মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদ। অন্যপ্রান্তে সঙ্গী বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি হৃদয়ের মনোযোগ। দ্বিতীয় দিন গোড়ালিতে চোট পাওয়ায় সাদমান ইসলাম প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে পারেননি। ফলে কার্যত ১০ ব্যাটার নিয়েই লড়তে হয়েছে বাংলাদেশকে। এর মধ্যে তানজিদ হাসান তামিম ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও ইনিংস বড় করতে পারেননি। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে হৃদয়ের প্রতিটি রান হয়ে উঠেছিল দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

শুরু থেকেই নিজের ব্যাটিংয়ে দারুণ ভারসাম্য রেখেছেন তিনি। অযথা ঝুঁকি না নিয়ে উইকেটে সময় দিয়েছেন, আবার আলগা বল পেলেই শাস্তি দিয়েছেন বোলারদের। ১০৯ বলে পাঁচ চারে পূর্ণ করেন অর্ধশতক। পরের ৫০ রান তুলতে তার লাগে মাত্র ৬২ বল। অর্থাৎ উইকেটে থিতু হওয়ার পর ধীরে ধীরে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছেন হৃদয়। লাঞ্চের ঠিক আগের ওভারে, ইনিংসের ৬৯তম ওভারে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তিনি। তখন তার নামের পাশে ছিল ১১টি চার ও একটি ছক্কা।


সেঞ্চুরির পথে কাট শট থেকে এসেছে ১৭ রান, তিনটি চার মেরে। পুরো ইনিংসে তার শট নিয়ন্ত্রণের হার ছিল ৮৯ শতাংশ। প্রথম ১০০ রানের মধ্যে চার থেকে আসে ৪৪ রান, ছক্কা থেকে ছয়। পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, কতটা নিয়ন্ত্রিত ব্যাটিং করেছেন তিনি।

লাঞ্চের বিরতির পর অবশ্য ব্যাটিংয়ের ধরনে আরও আগ্রাসন যোগ করেন হৃদয়। নিজের পরের ৪৯ বলের মধ্যে হাঁকান আরও তিনটি ছক্কা। তার ব্যাটে বদলাতে থাকে ম্যাচের চিত্র। একসময় ১৮৪ রানে সপ্তম উইকেট হারিয়ে বড় বিপদে পড়েছিল বাংলাদেশ। সেখান থেকে লেজের ব্যাটারদের নিয়ে দলকে লড়াইয়ে ফেরানোর দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেন তিনি।

হৃদয়ের এই ইনিংসের পেছনে মানসিক দৃঢ়তার গল্পটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দ্বিতীয় দিনের বিকালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পেসার জেইডেন সিলস তাকে টানা সেøজিং করেন। পাশাপাশি বাউন্সার দিয়ে হুক ও পুল শট খেলতে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেন। হৃদয় মুখে জবাব দিলেও আবেগের বশে বোলারের ফাঁদে পা দেননি। তৃতীয় দিনেও ধরে রেখেছেন সেই সংযম। প্রতিপক্ষের চাপ, সতীর্থদের বিদায় কিংবা দলের কঠিন পরিস্থিতি— কোনোকিছুই তাকে লক্ষ্য থেকে সরাতে পারেনি।

তাইজুল ইসলামের সঙ্গে তার জুটিটি বাংলাদেশের ইনিংসে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে দেয়। দুজন মিলে ১৩৮ মিনিট ব্যাট করে যোগ করেন ১১৭ রান। অন্যপ্রান্তে দারুণ সঙ্গ দিয়েছেন তাইজুল। ৫৬ বলে তিন চারে তার সংগ্রহ ২২ রান। দিনের শুরুতে ২৯ রানে অপরাজিত থাকা হৃদয় একের পর এক সতীর্থকে হারিয়েও নিজের লড়াই চালিয়ে গেছেন। একদিকে উইকেট আগলে রেখেছেন, অন্যদিকে সুযোগ বুঝে রান বাড়িয়েছেন।

দিনের শেষে সংবাদ সম্মেলনে হেড কোচ ফিল সিমন্স বেশ উচ্ছ্বাস নিয়ে বলেন, ‘আমরা ছেলেদের সবসময় বলি, সুযোগ এলে সেটা লুফে নিতে হবে এবং ভালোভাবে কাজে লাগাতে হবে। তুমি যখন মাঠে থাকবে, তখন দায়িত্ব তোমার। দলের জন্য যা প্রয়োজন, সেটাই করে যেতে হবে। হৃদয়ের কাছে আমাদের যা প্রত্যাশা ছিল, আজ সে সবকিছুই করে দেখিয়েছে।’

‘হৃদয়ের ইনিংসটি অসাধারণ ছিল। সত্যিই অবিশ্বাস্য একটি ইনিংস। বাউন্ডারিতে ফিল্ডার থাকার পরও সে চার-ছক্কা মেরেছে। সব মিলিয়ে হৃদয়ের প্রচেষ্টা ছিল দুর্দান্ত। সে ম্যাচের পরিস্থিতি খুব ভালোভাবে বুঝেছে। কখন শট খেলতে হবে, কখন শেষের তিন ব্যাটারকে স্ট্রাইক দিতে হবে, সবকিছুই দারুণভাবে সামলেছে’— যোগ করেন সিমন্স।

এক সপ্তাহ আগে মিরপুরে যে ব্যাটারকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, সিলেটে সেই হৃদয়ই হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভরসা। প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকে ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দেওয়া, দেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের রেকর্ড ভাঙা— সব মিলিয়ে এটি তার ক্যারিয়ারের এক অবিস্মরণীয় দিন। সমালোচনার জবাব দিয়েছেন ব্যাটে, আর নিজের নাম লিখিয়েছেন বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায়।


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   হৃদয়  ডাবলস  ইতিহাস 


Advertisement
Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: