মার্কিন জনগণের উদ্দেশে খোলা লিখেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। যেখানে তিনি তেহরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন-ইসরাইল অভিযানের পেছনের যুক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানান। এছাড়া ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতির পেছনে যে উদ্দেশ্যগুলো রয়েছে, তা বিবেচনা করার জন্য মার্কিন নাগরিকদের আহ্বান জানান।
বুধবার (১ এপ্রিল) এই চিঠিতে পেজেশকিয়ান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে ইরানকে যে ভাবা হয়েছে সেই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। কয়েক দশক আগের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অসন্তোষের কারণ তুলে ধরেছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন যে, ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপগুলো আগ্রাসনের নয়, বরং আত্মরক্ষার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সংঘাতের পরিস্থিতি নিয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার আগে এই খোলা চিঠিটি প্রকাশ করা হয়েছে।
চিঠিতে তিনি যা লিখেছেন তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো-
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের প্রতি, এবং সেই সমস্ত মানুষের প্রতি যারা, বিকৃতি ও মনগড়া বিবরণের স্রোতের মাঝেও, সত্যের সন্ধান করে চলেছেন এবং একটি উন্নততর জীবনের আকাঙ্ক্ষা করেন।
ইরান-এই নাম, চরিত্র এবং পরিচয়ের কারণেই মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন ও অবিচ্ছিন্ন সভ্যতা। বিভিন্ন সময়ে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও, ইরান তার আধুনিক ইতিহাসে কখনও আগ্রাসন, সম্প্রসারণ, উপনিবেশবাদ বা আধিপত্যের পথ বেছে নেয়নি। বিশ্বশক্তিগুলোর দখলদারিত্ব, আগ্রাসন এবং ক্রমাগত চাপ সহ্য করার পরেও তার অনেক প্রতিবেশীর চেয়ে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও ইরান কখনও যুদ্ধ শুরু করেনি। তবুও যারা তার ওপর আক্রমণ করেছে, তাকে সে দৃঢ়সংকল্প ও সাহসিকতার সাথে প্রতিহত করেছে।
আমেরিকা, ইউরোপ বা প্রতিবেশী দেশগুলোর জনগণসহ অন্য কোনো জাতির প্রতি ইরানের জনগণের কোনো শত্রুতা নেই। তাদের গৌরবময় ইতিহাস জুড়ে বারবার বিদেশি হস্তক্ষেপ ও চাপের মুখেও ইরানিরা সরকার এবং তাদের শাসিত জনগণের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য বজায় রেখেছে।
এই কারণে, ইরানকে হুমকি হিসেবে মনে করা ঐতিহাসিক বাস্তবতা বা বর্তমান পর্যবেক্ষণযোগ্য তথ্যের কোনোটির সাথেই সংগতিপূর্ণ নয়। এই ধরনের ধারণা হলো ক্ষমতাধরদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক খামখেয়ালিপনার ফসল। চাপ প্রয়োগের ন্যায্যতা প্রমাণ, সামরিক আধিপত্য বজায় রাখা, অস্ত্র শিল্পকে টিকিয়ে রাখা এবং কৌশলগত বাজার নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল।
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বাহিনী, ঘাঁটি এবং সামরিক সক্ষমতা ইরানের চারপাশে কেন্দ্রীভূত করেছে— এমন একটি দেশ, যা অন্তত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে কখনও কোনো যুদ্ধ শুরু করেনি। এই ঘাঁটিগুলো থেকেই চালানো সাম্প্রতিক মার্কিন আগ্রাসনগুলো দেখিয়ে দিয়েছে যে, এই ধরনের সামরিক উপস্থিতি প্রকৃতপক্ষে কতটা হুমকিস্বরূপ। স্বাভাবিকভাবেই, এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন কোনো দেশই তার প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা জোরদার করা থেকে বিরত থাকবে না। ইরান যা করেছে—এবং করে চলেছে—তা হলো বৈধ আত্মরক্ষার উপর ভিত্তি করে নেয়া একটি পরিমিত প্রতিক্রিয়া, এবং কোনোভাবেই তা যুদ্ধ বা আগ্রাসনের সূচনা নয়।
তবুও এই সমস্ত চাপ ইরানকে দুর্বল করতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং দেশটি অনেক ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী হয়েছে।
ইরান আলোচনা চালিয়েছিল, একটি চুক্তিতে পৌঁছেছিল এবং তার সমস্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছিল। সেই চুক্তি থেকে সরে আসা, সংঘাতের দিকে পরিস্থিতিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং আলোচনার মাঝেই দুটি আগ্রাসী পদক্ষেপ গ্রহণ করা ছিল মার্কিন সরকারের নেয়া ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্ত।
আমি আপনাদের আহ্বান জানাই অপতথ্যের চক্র থেকে বাইরে তাকাতে— যা এই আগ্রাসনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ইরান ও তার জনগণ সম্পর্কে আপনাদের যে বিকৃত তথ্যগুলো বলা হচ্ছে, এই বাস্তবতাগুলো কি তার সাথে মেলে?
আজ বিশ্ব এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সংঘাতের পথে চলতে থাকা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি ব্যয়বহুল ও নিষ্ফল। এর ফলাফল আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তার হাজার বছরের গৌরবময় ইতিহাসে ইরান বহু আগ্রাসনকারীকে পেছনে ফেলে টিকে আছে। ইতিহাসে তাদের কেবল কলঙ্কিত নামই অবশিষ্ট আছে, আর ইরান টিকে আছে— সহনশীল, মর্যাদাপূর্ণ এবং গর্বিত হয়ে।
সময়ের আলো/আআ