ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের ভয়াবহ অভিযান পড়ছে প্রাণ-প্রকৃতির ওপর। হরমুজ প্রণালি ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনার কারণে যে জ্বালানি সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তা কোথাও কোথাও কয়লাভিত্তিক জ্বালানির পুনরুত্থান ঘটাচ্ছে। জনজীবনে সরাসরি দৃশ্যমান তেল সংকটের প্রভাব। কোথাও কর্মঘণ্টা কমানো হচ্ছে, কোথাও আবার ঘরে বসে কাজের নির্দেশ আসছে। নিউইয়র্ক টাইমসে জোনাথন মিংলে লিখেছেন, ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের কথা মনে আছে, এবার পরিস্থিতি আরও খারাপ।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের বিস্তার : ইরান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির একটি বড় অংশ পরিবাহিত হতো। হঠাৎ সেই প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে, মজুদ কমতে শুরু করেছে। সরকারগুলো বাধ্য হয়েছে জরুরি ব্যবস্থা নিতে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাও মানুষকে কম ভ্রমণ, কম জ্বালানি ব্যবহার এবং ধীরে গাড়ি চালানোর আহ্বান জানিয়েছে।
উৎপাদন ও মিত্রদের ওপর চাপ বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র : যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে জ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে জোর দিচ্ছে। প্রশাসন তেল ও গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর নীতিতে অটল রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির কিছু প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি একটি বড় বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করতে সরকারি অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
অন্যদিকে মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ানো হয়েছে। তাদের বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি কিনতে এবং প্রয়োজন হলে নিজেরাই তেল সংগ্রহ করতে। এতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও টানাপড়েন তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যান্ড : সীমিত সহায়তা, সতর্ক নীতি এই দেশগুলো সরাসরি বাজারে বড় হস্তক্ষেপ না করে সতর্ক নীতি নিয়েছে। যুক্তরাজ্যে সরকার জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়লেও সর্বজনীন ভর্তুকি দেওয়া হয়নি। বরং আর্থিকভাবে দুর্বলদের জন্য সহায়তা তহবিল বাড়ানোর চিন্তা চলছে।
অস্ট্রেলিয়া তিন মাসের জন্য জ্বালানি কর অর্ধেক করেছে। এতে দাম কিছুটা কমেছে। নিউজিল্যান্ড মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য নগদ সহায়তা চালু করেছে। কানাডা তুলনামূলকভাবে বাজারকে নিজস্ব গতিতে চলতে দিয়েছে।
দ্বিমুখী পথ ইউরোপীয় ইউনিয়নের : ইউরোপ এক কঠিন দ্বিধায় পড়েছে। একদিকে তারা সবুজ জ্বালানির দিকে এগোতে চায়। অন্যদিকে সংকটের চাপে কয়লার ব্যবহার বাড়াতে হচ্ছে। ইতালি কয়লা বিদ্যুৎ বন্ধের পরিকল্পনা পিছিয়েছে। জার্মানি বিদ্যুৎ ঘাটতি সামাল দিতে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র চালু রাখার কথা বলছে। একই সঙ্গে কর কমানো ও ভর্তুকির মাধ্যমে জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বিদ্যুতের ওপর কর কমিয়ে তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
এশিয়ায় কয়লার জোরালো প্রত্যাবর্তন : এশিয়ায় সংকট সবচেয়ে তীব্র। ভারত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশ দিয়েছে। জাপান পুরোনো কয়লা কেন্দ্রগুলো আবার চালু করছে। দক্ষিণ কোরিয়া বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার সীমা তুলে দিয়েছে। বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোও বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার বাড়াচ্ছে। এতে পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়লেও তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় এই পথই বেছে নেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাশ্রয়ের কঠোর পদক্ষেপ : এই অঞ্চলের দেশগুলো চাহিদা কমাতে সরাসরি পদক্ষেপ নিয়েছে। শ্রীলঙ্কা চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে। ভিয়েতনাম কর্মীদের ঘরে বসে কাজ করতে উৎসাহ দিচ্ছে। থাইল্যান্ডে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখা গেছে। টেলিভিশন উপস্থাপকরা টাই ছাড়া পোশাকে অনুষ্ঠান করছেন। সরকারি দফতরে তাপমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। মানুষকে কম গাড়ি চালাতে এবং গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তুতির কারণে কম ক্ষতিগ্রস্ত চীন : চীন তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত। তারা আগেই তেল, গ্যাস ও বিকল্প জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগ করেছিল। তাদের বিশাল মজুদ রয়েছে। ফলে সরাসরি সংকটের প্রভাব কম পড়েছে। তবে তারা সতর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা থাকায় উৎপাদন ও মজুদ আরও বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
বিপুল চাপে আফ্রিকা : আফ্রিকার অনেক দেশ তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে দাম বাড়ায় তাদের অর্থনীতি চাপে পড়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা সাময়িকভাবে জ্বালানি কর কমিয়েছে। তানজানিয়া জ্বালানি মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ইথিওপিয়া ভর্তুকি চালু করেছে। জিম্বাবুয়ে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ইথানলের ব্যবহার বাড়াতে চাইছে। দক্ষিণ সুদান বিদ্যুৎ সরবরাহ সীমিত করছে।
দক্ষিণ আমেরিকায় বাড়ছে দাম : ভর্তুকি কম, বিকল্প জ্বালানিতে জোর দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশ সরাসরি দাম নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী নয়। চিলি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দাম বাড়িয়েছে। তবে গণপরিবহন ভাড়া স্থির রাখা হয়েছে। আর্জেন্টিনা কর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত পিছিয়েছে। ব্রাজিল আখ থেকে উৎপাদিত জ্বালানির ওপর নির্ভর করে কিছুটা স্বস্তিতে আছে। তাদের যানবাহন সহজেই এই জ্বালানি ব্যবহার করতে পারে।
কী বলছেন জোনাথন মিংলে : নিউইয়র্ক টাইমসে জোনাথন মিংলে লিখেছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আগে যেসব তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের শেষ চালান এশিয়ার পথে রওনা হয়েছিল, সেগুলো এখন পৌঁছে যাওয়ার কথা।
ইউরোপগামী শেষ ট্যাঙ্কার চালানগুলোও এপ্রিলের মাঝামাঝি পৌঁছে যাবে। এরপর অনেক দেশের পেট্রোল, ডিজেল, তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ কমে যাবে। যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরলের ভাষ্য, এবারের সংকট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি এর আগে কখনোই এতটা প্রকট হয়নি। এমনকি ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের চেয়েও এবারের পরিস্থিতি খারাপ। কোভিড মহামারির চেয়েও। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের চেয়েও এবারের পরিস্থিতি খারাপ। এবারের সংঘাতের পরিসর অনেক বড়। তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের বৃহৎ পরিসর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্রুত এই ঘাটতি পূরণের উপায় নেই।
সময়ের আলো/কেএইচও