ফারাক্কা আবারও সামনে এনেছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এক পুরোনো ও স্পর্শকাতর ইস্যু- গঙ্গার পানি বণ্টন। তিন দশক আগে স্বাক্ষরিত চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে চলতি বছরের ডিসেম্বরে, আর সেই সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে ন্যায্য হিস্যা, গ্যারান্টি ক্লজ ও পানির অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্ন। শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার বাস্তবতা, অতীত চুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবার ফারাক্কাকেন্দ্রিক এই সমঝোতা নবায়নে আরও শক্ত অবস্থান নিতে চাইছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ-ভারত দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে চলতি বছরের ডিসেম্বরে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের পর ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার এ চুক্তি নবায়নে পানি অধিকারের ইস্যুতে ন্যায্যতা নিশ্চিতের প্রতি জোর দিতে চাচ্ছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে আগামী মে-জুন মাসের কাছাকাছি সময়ে দুই দেশের পানি সম্পদমন্ত্রীদ্বয়ের বৈঠক হতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-দিল্লি দুপক্ষই গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের পক্ষে। তবে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন বর্তমান সরকার নবায়ন করা চুক্তিতে বিগত ১৯৭৭ সালের চুক্তির (শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে) মতো এটিতে গ্যারান্টি এবং আরব্রিটেশন ক্লজ অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ৯৬ সালে করা ৩০ বছরমেয়াদি চুক্তিতে সরাসরি গ্যারান্টি ক্লজ ছিল না। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আসন্ন দিল্লি সফরে পানি ইস্যুতে আলোচনা হলে তিনি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন নিয়ে কথা বলবেন। তবে এ বিষয়ের মূল বৈঠকগুলো করে সিদ্ধান্ত নেবেন দুই দেশের পানি সম্পদমন্ত্রীরা। আগামী মে অথবা জুনে দুই দেশের পানি সম্পদমন্ত্রীর বৈঠক হতে পারে। তার আগে এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক ও পানি সচিবের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
আরও পড়ুন
প্রসঙ্গত ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ৫ বছরমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এটি ছিল ৫ বছরমেয়াদি একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি (১৯৭৭-১৯৮২)। স্থায়ী সমাধানের বদলে তখনকার পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য এটি করা হয়েছিল। চুক্তিটি মূলত ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজ থেকে গঙ্গার পানি কীভাবে ভাগ হবে তা নির্ধারণ করে।
এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল- ‘গ্যারান্টি ক্লজ’। অর্থাৎ যদি পানির প্রবাহ খুব কমে যায়, তবু বাংলাদেশ যেন নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি পায়, তার জন্য একটি গ্যারান্টি ধারা রাখা হয়েছিল। এটি বাংলাদেশের জন্য বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
যৌথ নদী কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৬ মার্চ ফারাক্কায় গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি সম্পর্কিত যৌথ কমিটির ৮৬-তম সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং গত ৭ মার্চ কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক হয়, যা দুই দেশের মধ্যকার নিয়মিত বৈঠক। ওই বৈঠকে গঙ্গার পানি বণ্টনের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিগত ১৯৯৬ সালে গঙ্গা চুক্তি বাস্তবায়নের পর থেকেই প্রতি বছর জানুয়ারি-মে পর্যন্ত বাংলাদেশের চার সদস্যের দল এবং ভারতের চার সদস্যের দলের উপস্থিতিতে প্রতিদিন চারবার গঙ্গার পানি মাপা হয় এবং চুক্তি অনুযায়ী যার যতটুকু পানি পাওয়ার, তা ভাগ করে নেয়।
কারিগরি দলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত বছর পানির ভাগাভাগি গাইডলাইন অনুযায়ী ঠিকভাবেই হয়েছে; কিন্তু গত বছর গঙ্গার পানিপ্রবাহ কম থাকায় সে বিষয়ে বাংলাদেশ উদ্বেগ এবং ভারতকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছিল। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে, চুক্তি-সম্পর্কিত কারিগরি মূল্যায়নের অংশ হিসেবে ভারতের কেন্দ্রীয় পানি কমিশনের একটি দল চার সদস্যের একটি বাংলাদেশি দলকে সঙ্গে নিয়ে ফারাক্কা এলাকা পরিদর্শন করে।
যৌথ নদী কমিশনের সদস্য মো. আনোয়ার কাদির দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, গঙ্গা চুক্তি অনুসারে প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশের চার সদস্যের দল এবং ভারতের চার সদস্যের দলের উপস্থিতিতে প্রতিদিন চারবার গঙ্গার পানি মাপা হয়, এবারও এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। এ চুক্তির মেয়াদ চলতি বছর শেষ হচ্ছে। চুক্তি নবায়ন ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এখনও শুরু হয়নি।
গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিগত ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লিতে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়া ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে ৩০ বছরমেয়াদি এ চুক্তি সই হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ফারাক্কা ব্যারেজ থেকে গঙ্গা নদীর শুষ্ক মৌসুমের (জানুয়ারি থেকে মে মাস) পানি ভাগাভাগি নিয়ন্ত্রণ করা। পানি ভাগাভাগির শেয়ারিং ফর্মুলা ছিল, প্রতি ১০ দিন অন্তর পানির প্রবাহের ভিত্তিতে ভাগাভাগি হবে। যদি ফারাক্কায় পানির পরিমাণ ৭০ হাজার কিউসেকের বেশি হয়, তা হলে সমান ভাগ হবে। কম হলে নির্দিষ্ট অনুপাতে ভাগ হবে (চুক্তিতে বাংলাদেশকে ন্যূনতম কিছু পরিমাণ নিশ্চিত করা হয়)। চুক্তিতে প্রতি ৫ বছর অন্তর চুক্তি পর্যালোচনা করার বিধান আছে। তবে এ চুক্তিতে সরাসরি গ্যারান্টি ক্লজ অন্তর্ভুক্ত নেই। এ চুক্তির আগে ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারেজ চালু হওয়ার পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে যাওয়া, নদী শুকিয়ে যাওয়া, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ইত্যাদি সমস্যা নিয়ে বিরোধ চলছিল। ১৯৯৬ সালের চুক্তি সেই বিরোধ অনেকাংশে কমিয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে চুক্তি পুরোপুরি মেনে চলা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগও ছিল।
নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম এবং কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম মনিরুল কাদের মির্জা যৌথভাবে ‘আন্তর্জাতিক পানি চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাংলাদেশের বাধা কোথায়’ শীর্ষক এক বিশ্লেষণধর্মী লেখায় বলেন, ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে একটি ৩০ বছর (১৯৯৬-২০২৬) মেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। তবে ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো এটিতে কোনো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ছিল না।
৩০ বছরমেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের সময়ে কারিগরি পর্যায়ে ভূমিকা রেখেছিলেন পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত। তিনি দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, এ চুক্তি নবায়নের আগে ভারতের সঙ্গে কথা বলতে হবে। একা সিদ্ধান্ত নিলে হবে না। তবে ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি নবায়ন হওয়া প্রয়োজন।
পানি বিশেষজ্ঞদের বরাতে এ চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ না থাকার বিষয়ে ড. আইনুন নিশাতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, চুক্তিতে গ্যারান্টি শব্দটা নেই; তবে কাছাকাছি শব্দ আছে। কিন্তু ওই চুক্তিতে আমাদের অধিকার বাস্তবায়নে যা যা করার কথা ছিল আমরা তো সেগুলো করিনি। অনেকে বলেন, এই চুক্তিতে আরব্রিটেশন ক্লজ নেই, যা ঠিক নয়। বাংলাদেশের যা যা দরকার ওই চুক্তিতে সবই আছে; কিন্তু আমরা তার বাস্তবায়ন করিনি।
আন্তর্জাতিক পানি বিশেষজ্ঞ মালিক ফিদা এ খান যৌথ নদী কমিশনের সাবেক সদস্য। তিনি দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, চুক্তিটির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। তার আগেই নবায়নের জন্য দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করা প্রয়োজন। নবায়নের সময় ৩০ বছরমেয়াদি চুক্তিটি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কেননা ৩০ বছর আগের প্রেক্ষাপট আর বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপট এক নয়। নবায়নে ইকো সিস্টেমের ফ্লোতে জোর দেওয়া প্রয়োজন। এতে এনভায়রনমেন্ট ক্লজ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এর জন্য যৌথ নদী কমিশনের কাছে সমীক্ষা করা আছে। আর একটি বিষয়, পানি ধরে রাখার জন্য গঙ্গা ব্যারাজ করা প্রযোজন।
পানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. এম মনোয়ার হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ৩০ বছরমেয়াদি চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ ছিল না, যা নবায়নের সময় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। ওই চুক্তিটার সময়ে ড. আইনুন নিশাত কারিগরি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। পানি শুধু ভাগাভাগি করলে হয় না, পানির সঙ্গে পলিও আসে, যা ওই চুক্তিতে ছিল না। ভারত ও পাকিস্তান পানিবিষয়ক চুক্তিতে সমস্যা সমাধানের জন্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিশ্বব্যাংককে রেখেছে। নবায়ন করা চুক্তিতে এমন মধ্যস্থতাকারী রাখা প্রয়োজন, যা আগের চুক্তিতে নেই।
পানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ম ইনামুল হক সময়ের আলোকে বলেন, বাংলাদেশ ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তির ৩০ বছর মেয়াদ শেষ হওয়ার দিকে যাচ্ছে, যা ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হবে। পরবর্তী চুক্তির কোনো আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক জলপথ কনভেনশন ১৯৯৭ অনুমোদন করা এখনই সময়। এই ইউএন ওয়াটারকোর্স কনভেনশন ১৯৯৭ নিশ্চিত করে যে, উজানের রাষ্ট্রের পানি ব্যবহার নিম্নাঞ্চলের রাষ্ট্রের পানির অধিকারের ক্ষতি করতে পারবে না। মেকং নদীর অববাহিকায় ভিয়েতনাম এ কনভেনশনটি অনুমোদন করেছে।
তবে বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরা এ কনভেনশনকে ভয় পেতেন। কারণ এতে ভূগর্ভস্থ পানিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, অর্থাৎ নদীর অববাহিকা এলাকাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। গঙ্গার পানি ভাগাভাগির চুক্তি সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু তা মেনে চলার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না, তাই চুক্তি লঙ্ঘন বা অভিযোগ প্রায়ই দেখা যেত। গঙ্গা নদীর পানি ভাগাভাগি সম্ভব তাদের প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল এলাকা বা জনসংখ্যার ভিত্তিতে। দুই নদীর ঐতিহাসিক প্রবাহ রেকর্ড করা আছে; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে উজানে ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে প্রবাহের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। দুই নদীর নিম্ন অববাহিকার মানচিত্র থেকে স্পষ্ট যে, ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে নির্ভরশীল এলাকা দ্বিগুণেরও বেশি। কিন্তু যেহেতু উভয় নিম্ন অববাহিকা একই বাংলার সমভূমির অংশ, এটি উভয় বাংলার মানুষের সাধারণ স্বার্থের বিষয় হওয়া উচিত। আমি পরামর্শ দিচ্ছি, উজান থেকে আসা প্রবাহের ২০-৩০ শতাংশ সবসময় ডাইভার্ট করার অনুমতি দেওয়ার চুক্তি হওয়া উচিত- পরিমাণের ভিত্তিতে নয়। এমন চুক্তির মাধ্যমে উভয় বাংলার মানুষ যৌথভাবে ঐতিহাসিক প্রবাহ সবসময় নিশ্চিত করার দাবি জানাতে পারবে, অথবা প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণ খুঁজে বের করতে পারবে।
যদি কারণ প্রাকৃতিক হয়, অথবা প্রতিকার সম্ভব না হয়, তা হলে সেই কম প্রবাহ উভয়পক্ষকে যথাযথভাবে ভাগ করে নিতে হবে- কাউকে বঞ্চিত না করে। বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশের দিকে পানি ছাড়ার বিরোধী। এটা এমন নয় যে, তিনি বাংলাদেশিদের ঘৃণা করেন, বরং তিনি বলেন ‘নদীতে পানি নেই’। প্রশ্ন হলো- পানি কোথায় গেল বা কোথায় আটকে রাখা হয়েছে? পানি উজানে আটকে রাখা হয়েছে, যা নিম্নাঞ্চলের মানুষের ঐতিহাসিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। তাই বাংলাদেশের পানি কূটনীতির উচিত হবে এ ইস্যুকে সীমান্তের ওপারেও উভয়পক্ষের সাধারণ স্বার্থের বিষয় হিসেবে তুলে ধরা।
এএডি/