হামের টিকা প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর- এমন তথ্যই দীর্ঘদিন ধরে জানা। তবুও সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, দুই ডোজ টিকা পাওয়ার পরও আবার হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে? এই নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। শিশুদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন তারা। সরকারি হিসাবে গত ১৯ দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে (সন্দেহজনক) ৯৪ শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ৫ হাজার ৭৯২ সন্দেহজনক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৭৭১ জনের হাম হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে। আর গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯৪৭ জন। তার মধ্যে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৪২ জন। যদিও হামে প্রকৃত মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া হামের প্রকোপ বাড়ার কারণ অনুসন্ধান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় টিকাদানসংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপ (নাইট্যাগ)। এসব সংক্রমণ দেশের ভেতর থেকে নাকি বাইরে থেকে ছড়িয়েছে, তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (আইইডিসিআর)।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের এক-তৃতীয়াংশের বয়স ৯ মাসের কম। তবে টিকা নিয়েও হাম হতে পারে- এটা অস্বাভাবিক কিছু নয় বরং এর পেছনে নির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে। যেমন দেশে টিকাদান কর্মসূচিতে ৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের দুবার ‘এমআর’ (মিজলস রুবেলা) টিকা দেওয়া হয়। একবার ৯ মাস বয়সে আর দ্বিতীয়টি ১৫ মাস বয়সে। কিন্তু দেখা গেছে, প্রথম ডোজ টিকা নেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ না দেওয়া অথবা অভিভাবকদের গাফিলতি কিংবা ভুলে যাওয়ার কারণে শিশুকে টিকাকেন্দ্রেই নিয়ে যাওয়া হয়নি, আবার হামে আক্রান্তদের অনেকেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন, ঘনবসতি, সীমান্ত অঞ্চলে সংক্রমণ এবং অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, যাদের দীর্ঘদিন পুষ্টির ঘাটতি রয়েছে, কিংবা শরীরে ভিটামিন এ-এর অভাব রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে টিকা নেওয়ার পরও হাম হতে পারে।
আরও পড়ুন
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব শিশু আগে থেকেই কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত বা যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল, তারাও ঝুঁকিতে থাকে। তবে টিকা নেওয়া থাকলে হামের সংক্রমণ হলেও তার তীব্রতা অনেক কম হয় এবং জটিলতা তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। আবার দেখা গেছে অনেক শিশুদের কেউ কেউ একটা করে টিকা নিয়েছে। এর ফলে এসব টিকাবঞ্চিত শিশুর আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি যেমন বেশি, আক্রান্ত হলে অন্যদের মধ্যে ছড়ানোর আশঙ্কাও অনেক বেশি। এ ছাড়া অনেক সময় টিকা প্রাপ্তের শরীরে আশানুরূপ হাম প্রতিরোধক অ্যান্টিবডি তৈরি না হলেও সে পুনরায় হামে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৯ শতাংশের বয়স ২ বছরের নিচে আর ৩৪ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। এ ছাড়া দেশে গত দুই বছরে শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের ক্ষেত্রে যে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাবের সেটাই প্রাথমিক কারণ।
হঠাৎ করেই দেশে হাম বা রোগের প্রকোপ ব্যাপক আকারে ছড়িয়েছে, যা শিশুদের অভিভাবকদের মাঝেও এক ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ছোঁয়াচে রোগ ‘হাম’-এর পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো।
হামের দেশব্যাপী বিস্তারের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় কার্যক্রম জোরদার ও ত্বরান্বিত করতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এর মধ্যে সরকারও বেশি কিছু জরুরি টিকাদান কর্মসূচিসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। এই টিকা কার্যক্রম শুরু হচ্ছে রোববার থেকে। প্রাথমিকভাবে অধিক সংক্রমণপ্রবণ উপজেলাগুলোতে এই বিশেষ কর্মসূচি শুরু হবে। পর্যায়ক্রমে ছয় মাস থেকে ১০ বছর বয়সি সব শিশুকে এই টিকাদানের আওতায় আনা হবে।
আবার শিশুদের টিকাদানের বয়স ৯ মাস থেকে কমিয়ে ছয় মাস করা হয়েছে। আগামী জুন বা জুলাই মাসে এই কর্মসূচির দুই কোটি শিশুকে টিকার আওতায় পরিকল্পনা করছে সরকার। ছয় মাসের শিশুদের এই টিকা দেওয়া হবে কেবল বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে। তবে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে হামের টিকা দেওয়ার বয়স আগের মতোই ৯ মাস থাকছে। এ ছাড়া ঘাটতি মেটাতে টিকা সংগ্রহ এবং বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছে সরকার।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সম্প্রসারিত টিকা কর্মসূচির (ইপিআই) ওয়েবসাইটে নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ না হওয়ায় গত বছরের হামের টিকাদানের তথ্য নিয়ে দেশব্যাপী বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এতে কঠোর সমালোচনায় পড়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। তবে সমালোচনার পর সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) বলছে, টিকাদানের তথ্য হালনাগাদ করতে না পারায় এমন বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
ইপিআই সূত্রে জানা গেছে, দেশে ২০২৫ সালে ৪২ লাখ ২৮ হাজার ৬২৯ শিশুদের হামের টিকার আওতায় আনার সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এর মধ্যে মিজেলসের (হাম) এমআর-১ (প্রথম ডোজ) পেয়েছে ৩৮ লাখ ২৮ হাজার ৬২৪ জন (৯২ দশমিক ৭৩ শতাংশ) এবং এমআর-২ (বুস্টার ডোজ) পেয়েছে ৩৭ লাখ ৪৮ হাজার ৯৯ জন (৯০ দশমিক ৭৮ শতাংশ)। অর্থাৎ গড় কাভারেজের হার ছিল ৯১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। গড়ে যা ৯২ শতাংশের কাছাকাছি আর আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৩ শতাংশ কম। ২০২৪ সালে প্রথম ডোজের হার ছিল ৯৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং বুস্টার ডোজ দেওয়া হয়েছিল ৯৬ দশমিক ১৫ শতাংশ শিশুকে।
এ প্রসঙ্গে ইপিআইয়ের উপপরিচালক ডা. মো. শাহরিয়ার সাজ্জাদ সময়ের আলোকে বলেন, দেশে ২০২৪ সালে টিকাদানে বিশেষ কর্মসূচি চালানোর কথা থাকলেও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে তা পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। আর আমরা দেখেছি বর্তমানে হামে আক্রান্ত শিশুদের এক-তৃতীয়াংশের বয়স ৯ মাসের কম। আবার জন্মের পর পর্যাপ্ত মায়ের দুধ না পেলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে তারা হামে বেশি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
তিনি বলেন, দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করাসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। যেকোনো মূল্যে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আক্রান্ত রোগী যাতে না বাড়ে, মৃত্যু না ঘটে, সে জন্যই টিকাদানে সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে। ব্যবস্থাপনার ত্রুটি কিংবা দুর্বলতার কারণে ভ্যাকসিন আসছিল না। কিন্তু এখন আসা শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে গাভি হামের টিকা দিয়েছে। একই সঙ্গে আইপিভি (পোলিও টিকা) টিকা চলে এসেছে। আমরাও মাঠপর্যায়ে খোঁজখবর নিচ্ছি। যেখানে কোনো উপজেলা না থাকলেও পাশের উপজেলায় দ্বিগুণ টিকার সংগ্রহ রয়েছে। সেটি সমন্বয় করে দেখা যাচ্ছে। আশা করছি দ্রুতই হাম নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
মৃত্যু ও আক্রান্তের তথ্য : শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে হালনাগাদ তথ্য জানানো হয়, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯ দিনে সারা দেশে হাম হামের উপসর্গ (সন্দেহজনক) নিয়ে ৯৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত হামের কারণে ৯ শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে হামের উপসর্গ (সন্দেহজনক) ৫ হাজার ৭৯২ জন শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পরীক্ষায় ৭৭১ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে ঢাকা বিভাগে। এই বিভাগে মোট ৩১৮ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে।
শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে আরও ৯৪৭ শিশু। তাদের মধ্যে ৪২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত করা হয়েছে। মারা গেছে ৩ জন। আর আক্রান্তদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৮ জন ঢাকা বিভাগের। এই ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ বিভাগে নতুন কোনো হাম আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, হামের উপসর্গ (সন্দেহজনক) গত একদিনেই ভর্তি হয়েছে ৩ হাজার ৭৭৬ জন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ২ হাজার ৫২৭ জন। তবে পূর্বে প্রকাশিত তথ্য সংশোধন করে নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা থেকে ৫টি মৃত্যু বাদ দিয়েছে অধিদফতর। তাদের তথ্য বলছে, জেলা পর্যায় থেকে ভুল তথ্য পাঠানোর কারণে এসব মৃত্যু জাতীয় প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট জেলাগুলো হলো- ব্রাহ্মণবাড়িয়া (৩), লক্ষ্মীপুর (১) ও চাঁদপুর (১)।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংক্রমণ ৫৬টি জেলায় ছড়িয়েছে। তবে কিছু এলাকা এখন সংক্রমণের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার ঢাকায় সবচেয়ে বেশি।