শেখ হাসিনার বিদায়ের পর সংসদ ভবনে উচ্ছ্বসিত আন্দোলনকারীরা। ছবি : সময়ের আলো
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে বৈষম্য দূর করার দাবিতে। কিন্তু জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী সহিংসতার পর আন্দোলনের দিক দ্রুত বদলে যায়। ২ আগস্ট পর্যন্ত অনেকেই ধারণা করেননি, এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন ঘটাবে। অথচ পরবর্তী মাত্র ৭২ ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহই বদলে দেয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস।
৩ অগাস্ট শনিবার ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একটি সমাবেশের ডাক দেয় এবং সেই সমাবেশ থেকেই মূলত শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়।
ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সমাবেশে আন্দোলনকারীদের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, "এ সরকারের কোনোভাবেই আর এক মিনিট ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করলেই হবে না; বরং খুন, লুটপাট, দুর্নীতি এদেশে হয়েছে তার বিচার হতে হবে। আমরা পদত্যাগ দিয়ে তাকে এক্সিট রুট দিতে চাই না। তাকে পদত্যাগও করতে হবে, বিচারের আওতায়ও আনতে হবে"।
ওইদিন আন্দোলনকারীরা সরকারের পতনের দাবি তুলে 'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচি ঘোষণা করে, প্রথমে যার তারিখ ছিল ৬ অগাস্ট। কিন্তু পরদিনই সেটিকে এগিয়ে ৫ অগাস্ট করার ঘোষণা দেন তারা।
শেষ পর্যন্ত ওই ৫ অগাস্ট কারফিউর মধ্যেই ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমে আসে এবং দুপুর নাগাদ সামরিক বাহিনীর উড়োজাহাজে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা।
৫ আগস্টে জনতার জয়ের মিছিল । ছবি : সময়ের আলো
২ আগস্ট : উত্তপ্ত রাজপথ, নতুন কর্মসূচি
২ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে দেশজুড়ে গণমিছিল শুরু হয়। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমাগম ঘটে। বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
সেদিন আন্দোলনের সমন্বয়করা অভিযোগ করেন, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) কার্যালয়ে চাপ দিয়ে তাদের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি প্রত্যাহারের ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল। একই দিন ৩ আগস্ট বিক্ষোভ মিছিল, ৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশের ঘোষণা দেওয়া হয়।
এদিকে ইউনিসেফ এক বিবৃতিতে জানায়, আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় অন্তত ৩২ শিশু নিহত হয়েছে। অন্যদিকে গণভবনে ১৪ দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে শেখ হাসিনা আন্দোলনের সমন্বয়কদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেন।
৩ আগস্ট : এক দফার ঘোষণা
৩ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিশাল সমাবেশ থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করে। সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, শুধু পদত্যাগ নয়, আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের বিচারও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সরকার গঠনের দাবিও জানানো হয়।
প্রথমে ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও পরে সেটি এক দিন এগিয়ে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়।
সেদিন শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গণভবনের দরজা খোলা। তবে সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘গুলি আর সন্ত্রাসের সঙ্গে কোনো সংলাপ হয় না।’
একই দিনে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে আইএসপিআর জানায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সবসময় জনগণের পাশে রয়েছে এবং থাকবে।
৪ আগস্ট : অসহযোগে রক্তক্ষয়, এগিয়ে আসে ‘মার্চ টু ঢাকা’
৪ আগস্ট শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে শতাধিক মানুষের প্রাণহানির খবর আসে। কেবল সিরাজগঞ্জেই নিহত হন অন্তত ১৮ জন, যাদের মধ্যে ১৩ জন পুলিশ সদস্য ছিলেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার মোবাইলের ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় এবং সন্ধ্যা ৬টা থেকে সারাদেশের বিভাগীয় শহর, জেলা সদর, উপজেলা সদর ও শিল্পাঞ্চলে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে।
একই দিন শাহবাগের সমাবেশ থেকে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়। আন্দোলনের সমন্বয়করা দেশজুড়ে ছাত্র-জনতাকে ঢাকামুখী হওয়ার আহ্বান জানান।
৫ আগস্ট : কারফিউ ভেঙে জনস্রোত, ক্ষমতার পতন
৫ আগস্ট সকাল থেকেই কারফিউ উপেক্ষা করে হাজারো মানুষ ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে রাজধানীতে ঢুকতে শুরু করেন। সারাদেশ থেকে আসা জনতার ঢল শাহবাগ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও আশপাশের এলাকায় জড়ো হয়। বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ হলেও সেনাবাহিনীকে আন্দোলনকারীদের বাধা দিতে দেখা যায়নি।
দুপুরের দিকে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন - এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরে নিশ্চিত হয়, তিনি সামরিক উড়োজাহাজে ভারতে প্রবেশ করেছে।
এরপর আইএসপিআর জানায়, সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন। রাজনৈতিক দল ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বিকেল ৪টার দিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ঘোষণা দেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। এখন একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে।
এই ঘোষণার পরপরই আন্দোলনকারীরা গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংসদ ভবনে প্রবেশ করেন। রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের কার্যালয়, ধানমন্ডি-৩২-এর বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর, থানা ও অন্যান্য সরকারি স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
সেদিন রাতেই জাতির উদ্দেশে ভাষণে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংসদ ভেঙে দিয়ে দ্রুত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ঘোষণা দেন।
রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পরিণতি
কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করে। সরকারি হিসাবে, আন্দোলন চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ৮০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) তদন্ত প্রতিবেদনে জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকায় সেনা সদস্যদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন আন্দোলনকারীরা । ছবি : সময়ের আলো
সতের দিন পর ৬ই অগাস্ট ভোর থেকেই কারফিউ তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেয় আইএসপিআর।
মাত্র ৭২ ঘণ্টার ব্যবধানে এক দফার আন্দোলন থেকে ক্ষমতার পরিবর্তন - বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই সময়টিকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।