কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ দেশব্যাপী সুসংগঠিতভাবে নাশকতা বা হামলার চেষ্টা করতে পারে— এমন আশঙ্কায় বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাজধানীসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠে নেমেছেন পুলিশ, এসআরবি (সাবেক র্যাব), ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ও এপিবিএনের সদস্যরা।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য তৎপরতা, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক ককটেল বিস্ফোরণ এবং বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের ঘোষিত ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারা দেশে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
রাজধানীর প্রবেশপথ, ফ্লাইওভার ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ঘিরে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। সারা দেশে এক হাজার ৬০০-এর বেশি এবং রাজধানীতে দুই শতাধিক চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। পাশাপাশি ফুট ও মোটরসাইকেল প্যাট্রোলের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।
ডিএমপি সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর প্রধান সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ মোড় এবং প্রবেশপথগুলোতে বিশেষ চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক তৎপরতা ঠেকাতে মোটরসাইকেলসহ সন্দেহজনক যানবাহনে নিবিড় তল্লাশি করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে পিকেট ডিউটি জোরদারের পাশাপাশি নগরজুড়ে থানা মোবাইল প্যাট্রোল, ফুট প্যাট্রোল ও হোন্ডা প্যাট্রোল বাড়ানো হয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) নিয়াজ মেহেদী জানান, বড় ধরনের অপরাধ বা নাশকতা প্রতিরোধে মাঠে ডিবি, সিটিটিসি ও এপিবিএনের টিম মোতায়েন রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
গত শুক্রবার সন্ধ্যার পর রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। রাজধানীর সাতটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ১৪টি ককটেল বিস্ফোরণের পাশাপাশি কাফরুল থানার সামনে একটি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, হামলার কয়েকটি ঘটনায় ফ্লাইওভার ব্যবহার করা হয়েছে। শুক্রবারের সাতটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনার মধ্যে ছয়টিতে ফ্লাইওভার থেকে ককটেল ছোড়া হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছে তারা।
এসব ঘটনার পর রাজধানীতে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়। নিয়মিত চেকপোস্টের সংখ্যা বাড়িয়ে দুই শতাধিক করা হয়েছে। রাজধানীর বাইরে সারা দেশে ১ হাজার ৬০০-এর বেশি চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহন ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশি করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এর মধ্যে রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল এবং পরবর্তী কয়েক দিনে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এর সঙ্গে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের আজ রোববার ঘোষিত ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।
গতকাল শনিবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে দেশের বিভিন্ন স্থানে মশাল মিছিলের ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। তবে এসব ভিডিওর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে গোয়েন্দা তৎপরতা ও সাইবার মনিটরিং কার্যক্রমও বাড়ানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে বাসে অগ্নিসংযোগসহ সাম্প্রতিক ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে চালক ও পরিবহন মালিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। একই সঙ্গে সড়কের দুই পাশে কিংবা অনিরাপদ ও নির্জন স্থানে গাড়ি পার্কিং না করার জন্য পরিবহন মালিকদের অনুরোধ করা হয়েছে।
গতকাল শনিবার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকাসহ সারা দেশের চলাচলকারী সব ধরনের যানবাহন ও পণ্য পরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতিসাধন বা ভাঙচুর এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই পরিবহনগুলো রাস্তার দুই পাশে অথবা অনিরাপদ ও নির্জন স্থানে পার্কিং করা যাবে না।
এ ছাড়া যানবাহনের দৈনিক চলাচল শেষে বাধ্যতামূলকভাবে নিজ নিজ ডিপো, নির্ধারিত গ্যারেজ অথবা টার্মিনালে নিরাপদে রাখার জন্য দেশের সব স্তরের মালিক ও শ্রমিকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, যানবাহনের নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন এবং যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) পরিচালক উইং কমান্ডার এ জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, দেশের সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এসআরবি দুই স্তরে কাজ করছে। ইতিপূর্বে সংঘটিত ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সিসি ক্যামেরা ফুটেজ সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণের কাজ চলছে। অন্যদিকে যেসব ঘটনায় মোটরসাইকেল ব্যবহার করা হয়েছে সেসব ক্ষেত্রে সেইসব মোটরসাইকেলের নম্বর সংগ্রহ করে মালিকদের শনাক্তের কাজ চলছে।
দ্বিতীয় স্তরের কাজ হিসেবে মাঠে সাদা পোশাকে এসআরবি সদস্যরা তৎপর রয়েছে বলে জানান তিনি। এসআরবির সাইবার মনিটরিং টিম সার্বক্ষণিক তথ্য সংগ্রহ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যে ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম হয়েছে সেগুলো কো-অর্ডিনেটেড বা সুসংগঠিত। আর এ ধরনের আক্রমণ সরাসরি ফোনের মাধ্যমে কথা বলে করা সম্ভব নয়। এ জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে বেছে নিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। তাই সাইবার মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে।
এসআরবির এ কর্মকর্তা আরও বলেন, শুধু সাম্প্রতিক ঘটনাই নয়, উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধেও সাবেক র্যাব ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়েছে এবং এসআরবিও সেই ধারা অব্যাহত রেখেছে। শিগগিরই এ সংক্রান্ত ভালো ফলাফল দেখা যাবে বলে জানান তিনি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে