অবশেষে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেলের কাঙ্ক্ষিত গেজেট বা প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে গতকাল শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। এ প্রজ্ঞাপনকে চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬ নামে অভিহিত করা হয়েছে।
এই চাকরি আদেশের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে কর্মরতদের মূল বেতন সর্বনিম্ন গ্রেডে ১৪২ শতাংশ বেড়ে হলো ২০ হাজার টাকা, আর সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ বেড়ে হলো ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, যা ৫৩ বছর আগে শুরু হয়েছিল নিচের গ্রেডে ১৩০ টাকায় এবং ওপরের গ্রেডে ২ হাজার টাকায়।
এদিকে গত ৫৩ বছরে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৭৭ সালে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে প্রথমবার বেতন কাঠামো দ্বিগুণ করা হয়। সে বছর নিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২২৫ টাকা করা হয় এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন ২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার টাকা করা হয়।
এরপর ১৯৮৫ সালে এরশাদ সরকার আমলে একবার পে-স্কেল দেওয়া হলেও ১৯৯১ এবং ২০০৫ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে মূলত সরকারি চাকরিজীবীরা সম্মানজনক বেতনের যুগে প্রবেশ করে।
১৯৯১ সালে নিচের গ্রেডের মূল বেতন বাড়িয়ে করা হয় ৯০০ টাকা এবং ওপরের গ্রেডের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয় ১০ হাজার টাকা। ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিচের গ্রেডে ১৫০০ টাকা এবং ওপরের গ্রেডে ১৫ হাজার টাকা করার পর ২০০৫ সালে নিচের গ্রেডের মূল বেতন বাড়িয়ে করা হয় ২ হাজার ৪০০ টাকা এবং ওপরের গ্রেডে মূল বেতন প্রথমবারের মতো ২০ হাজার টাকার কোটা ছাড়িয়ে ২৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ২০০৯ এবং ২০১৫ সালে দুবার নতুন পে-স্কেল দেওয়া হয়। তবে ১১ বছর পর এসে আবারও সেই বিএনপি সরকারের আমলেই সরকারি চাকরিজীবীরা আরও মর্যাদাপূর্ণ জীবনধারণের মতো বেতন কাঠামো পেলেন।
অবশ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের ১৩০ টাকায় শুরু হওয়া বেতন বেড়ে এখন দেড় লাখ টাকা ছাড়াল, কিন্তু সরকারি অফিসগুলোতে সেবার মান কি সেই হারে বেড়েছে। সরকারি চাকরিজীবীরা দেশের জনগণের সেবায় কতটা দায়িত্বশীল হতে পেরেছে— সেদিকটিও দেখার দরকার রয়েছে। একই সঙ্গে ২২ থেকে ২৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীদের বেতন-ভাতা বাড়ল, কিন্তু বেসরকারি খাতের কোটি কোটি কর্মজীবী মানুষের বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে কে ভাববে। তাদেরও তো বেতন-ভাতা বাড়ানোর দরকার।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়বে— এটি চলমান প্রক্রিয়া। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে বেতন কাঠামো বাড়তে হয়, সামনে আরও বাড়াতে হবে। প্রায় এক যুগ পর সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন বেতন কাঠামো পেলেন।
বর্তমান সরকার এমন একটা সময়ে নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করল যখন দেশের অর্থনীতি টালমাটাল, সরকারের কোষাগারেও অর্থের টানাপোড়েন আছে। তরপরও সরকার হয়তো আমলাদের চাপে পড়েই এ বেতন কাঠামো ঘোষণা দিয়েছে এবং বাস্তবায়নের সব ধাপ সম্পন্ন করেছে। সরকার চাইলে এক-দুই বছর পরেও নতুন বেতন কাঠামো দিতে পারত এবং এর পেছনে যৌক্তিক কারণও দেখাতে পারত।
তবে গত এক যুগে যেহেতু মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়ে গেছে, তাই এই নতুন বেতন কাঠামোটা বাস্তবায়ন করাটাও সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু কথা হচ্ছে— সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বেড়ে ১৩০ টাকা থেকে এখন দেড় লাখ টাকা ছাড়িয়েছে কিন্তু সরকারি অফিসে সেবার মান কি আদৌ বেড়েছে। সত্যি বলতে, সে অর্থে সেবার মান বাড়েনি।
আবার বেতন বাড়লেও সরকারি অফিসে কিন্তু ঘুষ বাণিজ্য তো কমেইনি, উল্টো নতুন পে-স্কেলের পর ঘুষের রেট বেড়ে যায় বলেও শোনা যায় বিভিন্ন সময়। তাই আমি মনে করি সরকারি চাকরিজীবীরা এখন একটা মর্যাদার বেতন কাঠামো পেয়েছে, সুতরাং সরকারি অফিসগুলোতে সেবার মানও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি অফিসে ঘুষ বাণিজ্যও কমাতে হবে। সরকারকে এই দিকটিতেও কড়া নজরদারি বাড়াতে হবে।’
আরেক অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এ বিষয়ে সময়ের আলোকে বলেন, ‘সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে বাজারে সব ধরনের জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়, বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত ভাড়াসহ আনুষঙ্গিক অনেক ব্যয় বেড়ে যায়।
অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ বেড়ে যায়। তাই ২৪ লাখের মতো সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশন ভোগীর বেতন-ভাতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি খাতের কর্মজীবীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর বিষয়টির দিকেও নজর দিতে হবে।
বেসরকারি খাতের লোকদেরও যাতে বেতন বাড়ে তার জন্য সরকারের তরফ থেকে উদ্যোগ থাকতে হবে। যেসব শিল্প খাতের শ্রমজীবী মানুষের ন্যূনতম বেতন স্কেল অনেক বছর ধরে বাড়েনি তাদের জন্য দ্রুত নতুন ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করতে হবে। এ রকমভাবে গণমাধ্যমে কর্মরতদেরও জন্যও নতুন ওয়েজবোর্ডও ঘোষণা করা দরকার। অর্থাৎ সব পেশার মানুষের বেতন বাড়ানো দরকার। তা না হলে বেসরকারি খাতের কর্মজীবীদের জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়বে।’
যা বলা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে : নতুন প্রজ্ঞাপন অনুসারে নতুন বেতন কাঠামোতে ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন বেতন কাঠামোতে বাড়তি মূল বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ১০-২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ হারে পাবেন। গত ৩০ জুনের প্রাপ্য বেতনের সঙ্গে তা যুক্ত হবে।
এ ছাড়া ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন বেতন কাঠামোতে বাড়তি মূল বেতনের ৭০ শতাংশ এবং ১০-২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৭৫ শতাংশ হারে পাবেন। আর ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বেতন বৃদ্ধির শতভাগ কার্যকর হবে। গত ১ জুলাই থেকে যেহেতু নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছে, তাই বকেয়া বেতনও পাবেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি নতুন বেতন কাঠামোর অন্য সব ভাতা পাওয়া শুরু করবেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একইভাবে পেনশন সুবিধাভোগীরাও নতুন বেতন কাঠামোর যাবতীয় সব সুবিধা পাবেন।
নতুন বেতন কাঠামোতে ১ম থেকে ১০ম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মূল বেতন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। আর ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন বাড়বে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। আনুপাতিক হারে বিভিন্ন ধরনের ভাতাও বাড়বে।
গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে শনিবার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করতে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি সুপারিশ চূড়ান্ত করে।
অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। কমিশন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে এ বছরের ২১ জানুয়ারি। কমিশনের প্রধান ছিলেন সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান।
কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়ল : নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। সর্বোচ্চ মূল বেতন নির্ধারিত হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। সর্বনিম্ন মূল বেতন হবে ২০ হাজার টাকা। গত বৃহস্পতিবার বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন হলেও গতকাল শনিবার তা প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ছিল ৭৮ হাজার টাকা। সেই বেতন বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। এই গ্রেডে বেতন বেড়েছে ১০০ শতাংশ।
দ্বিতীয় গ্রেডের মূল বেতন ৬৬ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা হয়েছে। বেড়েছে ১০০ শতাংশ। তৃতীয় গ্রেডে ৫৬ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা। বেড়েছে ১০০ শতাংশ। চতুর্থ গ্রেডের মূল বেতন ৫০ হাজার থেকে বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। পঞ্চম গ্রেডে ৪৩ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ৮৬ হাজার টাকা।
ষষ্ঠ গ্রেডের মূল বেতন ৩৫ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে ৭১ হাজার টাকা হয়েছে। সপ্তম গ্রেডের মূল বেতন ২৯ হাজার থেকে দ্বিগুণ হয়ে ৫৮ হাজার টাকা হয়েছে। অষ্টম গ্রেডে ২৩ হাজার থেকে বেতন বেড়ে হয়েছে ৪৬ হাজার টাকা। নবম গ্রেডে ২২ হাজার থেকে বেড়ে ৪৪ হাজার টাকা হয়েছে।
দশম গ্রেডের মূল বেতন ১৬ হাজার থেকে বেড়ে ৩২ হাজার টাকা হয়েছে। ১১তম গ্রেডে ১২ হাজার ৫০০ থেকে দ্বিগুণ হয়ে ২৫ হাজার টাকা হয়েছে। ১২তম গ্রেডের মূল বেতন ১১ হাজার ৩০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার ৩০০ টাকা। ১৩তম গ্রেডে ১১ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার টাকা।
১৪তম গ্রেডের মূল বেতন ১০ হাজার ২০০ থেকে বেড়ে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে। ১৫তম গ্রেডের মূল বেতন ৯ হাজার ৭০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২২ হাজার ৮০০ টাকা।
১৬তম গ্রেডের মূল বেতন ৯ হাজার ৩০০ থেকে বেড়ে ২১ হাজার ৯০০ টাকা হয়েছে। ১৭তম গ্রেডের মূল বেতন ৯ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার ৪০০ টাকা। ১৮তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ৮০০ থেকে বেড়ে ২১ হাজার টাকা হয়েছে। ১৯তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার ৫০০ টাকা। সর্বনিম্ন বা ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকেই কার্যকর। তবে কর্মচারীরা শুরুতেই বর্ধিত বেতনের পুরো অংশ পাবেন না। গত জুলাই থেকে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম থেকে ওপরের গ্রেডধারীরা পাবেন মূল বেতনের ৪০ শতাংশ। এ সময়ের মধ্যে ২০তম থেকে দশম গ্রেড পর্যন্ত গ্রেডধারীরা পাবেন মূল বেতনের ৫০ শতাংশ।
কোন এলাকায় কত শতাংশ বাড়ি ভাড়া পাবেন : প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় চাকরি করা গ্রেড-২০-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১৬-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ৬০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া পাবেন। গ্রেড-১৫-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১০-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা পাবেন ৫০ শতাংশ। গ্রেড-৯-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-৫-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা পাবেন ৪৫ শতাংশ। আর গ্রেড-৪-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের চাকরিজীবীরা ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় মূল বেতনের ৪০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া পাবেন।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, খুলনা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও বগুড়া সিটি করপোরেশন এবং সাভার ও কক্সবাজার পৌর এলাকার জন্য বাড়ি ভাড়ার হার কিছুটা কম। এসব এলাকায় গ্রেড-২০-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১৬-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া পাবেন।
একই এলাকায় গ্রেড-১৫-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১০-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা পাবেন ৪০ শতাংশ, গ্রেড-৯-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-৫-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা পাবেন ৩৫ শতাংশ এবং গ্রেড-৪-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের চাকরিজীবীরা পাবেন মূল বেতনের ৩০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া।
অন্যান্য এলাকায় কত হবে : অন্যান্য এলাকার জন্য গ্রেড-২০-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১৬-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ৪৫ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া পাবেন। গ্রেড-১৫-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১০-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা পাবেন ৩৫ শতাংশ হারে।
এ ছাড়া গ্রেড-৯-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-৫-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা ৩০ শতাংশ এবং গ্রেড-৪-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ২৫ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া পাবেন বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে।
বর্তমানে কত বাড়ি ভাড়া পান : বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় মূল বেতন ৯ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত হলে ৬৫ শতাংশ হারে, তবে ন্যূনতম ৫ হাজার ৬০০ টাকা বাড়ি ভাড়া পান চাকরিজীবীরা। ৯ হাজার ৭০১ টাকা থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল বেতন হলে ৬০ শতাংশ হারে, তবে ন্যূনতম ৬ হাজার ৪০০ টাকা বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়।
মূল বেতন ১৬ হাজার ১ থেকে ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হলে ৫৫ শতাংশ হারে, তবে ন্যূনতম ৯ হাজার ৬০০ টাকা বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়। আর মূল বেতন ৩৫ হাজার ৫০১ টাকার বেশি হলে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় ৫০ শতাংশ হারে, তবে ন্যূনতম ১৯ হাজার ৫০০ টাকা বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়। অন্যান্য এলাকার ক্ষেত্রে বর্তমানে বাড়ি ভাড়ার হার ও ন্যূনতম অঙ্কে ভিন্নতা রয়েছে।
বেতন পাবেন কবে থেকে : প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামো চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। তবে নির্ধারিত বেতন বৃদ্ধির পুরো সুবিধা একসঙ্গে কার্যকর হবে না। ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন কাঠামোয় বাড়তি মূল বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ হারে পাবেন। এই অর্থ গত ৩০ জুন আহরিত বা প্রাপ্য বেতনের সঙ্গে যুক্ত হবে।
এরপর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বাড়তি মূল বেতনের ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৭৫ শতাংশ হারে পাবেন।
সবশেষে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামোয় নির্ধারিত বেতন বৃদ্ধির শতভাগ কার্যকর হবে। যেহেতু নতুন বেতন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য হয়েছে, তাই এ সময়ের বকেয়া বেতনও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পাবেন।
ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সাল থেকে : প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নতুন বেতন কাঠামোর অন্যান্য ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। একই সময় থেকে পেনশন সুবিধাভোগীরাও নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী প্রাপ্য সুবিধা পাবেন। নতুন কাঠামোয় বর্ধিত মূল বেতন অনুযায়ী আনুপাতিক হারে বিভিন্ন ধরনের ভাতাও বাড়বে।
নতুন পে-স্কেলে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট হবে যেভাবে : জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্টের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি অর্থবছরের প্রথম দিন ১ জুলাই। নতুন নিয়োগ পাওয়া কোনো কর্মচারীর কোয়ালিফাইং চাকরির মেয়াদ কমপক্ষে ছয় মাস হলে তিনি বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের সুবিধা পাবেন। প্রকাশিত জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর গেজেটে বেতন নির্ধারণ, প্রথম নিয়োগ এবং অগ্রিম ইনক্রিমেন্টের বিভিন্ন বিধান তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথম নিয়োগে যেভাবে বেতন নির্ধারণ : ২০২৬ সালের ১ জুলাই ২০২৬ বা তার পরে নিয়োগ পাওয়া কোনো কর্মচারীকে বদলি বা পদোন্নতি ছাড়া নিয়োগকৃত পদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন স্কেলে নির্ধারিত স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে গেজেটে বেতন নির্ধারণের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসরণ করতে হবে।
তবে প্রথম নিয়োগের পদটি জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর ৪৪ হাজার থেকে ১ লাখ ৫ হাজার ৯০০ টাকা (৯ম গ্রেড) বা এর ওপরে হলে নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্টের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে এমবিবিএস, ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচার, ইঞ্জিনিয়ারিং বা সরকার স্বীকৃত সমপর্যায়ের ডিগ্রিধারীকে একটি অগ্রিম ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হবে। তবে সংশ্লিষ্ট ডিগ্রিটি ওই পদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে নির্ধারিত থাকতে হবে।
এ ছাড়া ইঞ্জিনিয়ারিং বা স্থাপত্যবিদ্যায় ডিগ্রি, মাস্টার্স ডিগ্রিসহ সরকার স্বীকৃত কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ফিজিক্যাল প্ল্যানিংয়ে ডিগ্রি অথবা আইন বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকলে দুটি অগ্রিম ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হবে। কোনো কর্মচারী চিকিৎসা অনুষদের লাইসেন্সধারী হলে এবং ওই লাইসেন্স সংশ্লিষ্ট পদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে নির্ধারিত থাকলে নিয়োগের সময় তিনি একটি অগ্রিম ইনক্রিমেন্ট পাবেন।
পুরোনো বিধানও বহাল : গেজেটে বলা হয়েছে, উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে অগ্রিম বর্ধিত বেতন মঞ্জুরির সঙ্গে সম্পর্কিত ১৯৭০ সালের তৎকালীন শিক্ষা বিভাগের কয়েকটি স্মারক এবং অর্থ বিভাগের ১৯৭৮ ও ১৯৮১ সালের সংশ্লিষ্ট আদেশে আরোপিত শর্তগুলো বহাল থাকবে।
একই সঙ্গে বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের প্রবেশ পদে উচ্চতর প্রারম্ভিক বেতন দেওয়ার বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ২২ জানুয়ারি ১৯৯৪ সালের স্মারক এবং উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে বেতন-সংক্রান্ত অর্থ বিভাগের ১১ অক্টোবর ২০২১ সালের এসআরওর বিধানও কার্যকর থাকবে।
বিসিএস ক্যাডারে অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট : জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এ বিসিএস ক্যাডারভুক্ত হিসেবে ৯ম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। তাদের বেতন ৯ম গ্রেডের নির্ধারিত স্কেলে একটি অতিরিক্ত অগ্রিম ইনক্রিমেন্টসহ নির্ধারণ করা হবে।
অন্যদিকে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ক্যাডার পদে নিয়োগ না পেলেও বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (বিপিএসসি) সুপারিশে ৯ম গ্রেডের নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের বেতন ৯ম গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপেই নির্ধারণ করা হবে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত নিয়োগে বিশেষ বিধান : গেজেটে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ সময়ের মধ্যে প্রথম নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের জন্যও একটি বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মচারী যদি ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যোগদান করতেন, তা হলে বর্তমান বেতন হিসেবে যে অর্থ পেতেন, তার সঙ্গে জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী নির্ধারিত বেতন ও বর্তমান বেতনের পার্থক্যের প্রযোজ্য শতাংশ যোগ করে তার প্রাপ্য বেতন নির্ধারণ করা হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে