জুলাই আন্দোলন, তার একটা বড় বিষয়ই হচ্ছে আমরা বাংলাদেশকে একটা 'ক্লায়েন্ট স্টেট' হিসেবে দেখতে চাই না। সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সবচাইতে বড় দিক হচ্ছে - বাংলাদেশ ফার্স্ট, বাংলাদেশ প্রথম। আমরা সেই 'ক্লায়েন্ট স্টেট' পর্যায়ে কখনো ফিরে যাব না, নেভার এগেইন।
বুধবার (৫ আগস্ট) ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’-এর অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এমন কথা বলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, আজ ৫ আগস্ট। আমি বলতে ভালোবাসি ৩৬ শে-জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস। গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি সেই সব শহীদকে, যারা ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা লক্ষ্যে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
লিখিত বক্তব্যের বাইরে গিয়ে তিনি বলেন, আমাকে একটা লিখিত বক্তৃতা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে, আমি তার বাইরে কিছু বলছি। আমাদের সবারই নিশ্চই স্মরণ আছে, দু'বছর আগে ঠিক এই সময়ে আমরা কি অবস্থায় ছিলাম। আপনারা অনেকে দেশে ছিলেন, আমরা অনেকে বাইরে ছিলাম। বাইরে থেকে যখন আমরা ঘটনাপ্রবাহ দেখেছি - আমাদের ছোট ছোট বাচ্চারা যেই নির্মূল নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, প্রাণ দিচ্ছেন, আহত হচ্ছেন; বাইরে থেকে দেখে তো আমাদের সুস্থ থাকার কথা না।
একসময় ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেল। একবারে ব্ল্যাকআউট! এরকম ঘটনা তো আমি কখনো দেখি নাই! এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তো এই ঘটনা ঘটে নাই। তখন ইন্টারনেট ছিল না, কিন্তু তথ্যপ্রবাহ এভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় নাই। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা ছিল সবচাইতে নৃশংস সময় - নৃশংসতম সময়।
কঠিন মসৃণতার পথ পেরিয়ে এক চমৎকার ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে গণমানুষের সরকার গঠন হয় উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই-আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী সময়টাও কিন্তু খুব মসৃণ ছিল না। তখনকার যিনি রাষ্ট্র সরকারের দায়িত্বে ছিলেন, প্রধান উপদেষ্টা মহোদয় আমাকে ডেকে পাঠালেন সরকারের কাজ করবার জন্য। একপর্যায়ে তিনি আমাকে ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার হিসেবে ডেজিগনেট করলেন।
আমাদের সামনে তিনটে বড় বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রথমত চীফ অ্যাডভাইজারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তার কিছু হলে এই পুরো বিষয়টি অন্যদিকে চলে যেতে পারত। দ্বিতীয় হচ্ছে সরকারের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা, এবং তিন নম্বর বিষয়টি ছিল এই পুরো ট্রানজিশনটা যাতে একটা ভালো নির্বাচনের মাধ্যমে সমাপ্ত হতে পারে।
তিনটি বিষয়ই আমরা করতে পেরেছি। নির্বাচনটি ছিল একটা চমৎকার নির্বাচন, উৎসবমুখর একটা নির্বাচন। এটা আমার কথা নয়, এটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষকরাই বলেছেন। মোটামুটি বেশ মসৃণভাবে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কিছুক্ষণ আগে আমাকে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, "বাংলাদেশ একসময় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে হারিয়ে যাচ্ছিল, সেই বাংলাদেশ ফিরে আসছে দেখে আমরা খুব আনন্দিত।" যখনই এই কথাগুলো আমরা শুনি, তখন আসলেই বুঝতে পারি আমরা বাংলাদেশকে একটা 'ক্লায়েন্ট স্টেট' হিসেবে দেখতে চাই না।
তুরস্কের ফরেন মিনিস্টার যে কথাটি বললেন, সেটা সেই একই কথার প্রতিধ্বনি। শুরু থেকেই আমাদের সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সবচাইতে বড় দিক হচ্ছে - বাংলাদেশ ফার্স্ট, বাংলাদেশ প্রথম। আমরা সেই 'ক্লায়েন্ট স্টেট' সে পর্যায়ে কখনো ফিরে যাব না, নেভার এগেইন। এবং এই কাজটার একটা বড় দায়িত্ব আমাদের। জুলাই সংগ্রামের যে সাফল্য, সে সাফল্যের একটা ভার কিন্তু আমাদের ওপরে আছে। এবং সেটা আমাদেরকে বহন করতে হবে, বিকজ ফরেন মিনিস্ট্রি ইজ অ্যাট দ্যা ফ্রন্টলাইন অব অ্যাকশনস - টু এনসিওর দ্যাট উই নেভার গো ব্যাক টু দ্যা স্টেট অব ক্লায়েন্ট স্টেট।
বৈশ্বিক উত্তেজনা নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নিয়মভিত্তিক (রুল-বেসড) যে অর্ডারটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেটার ভাঙন আমরা সব জায়গাতেই দেখতে পাচ্ছি। সভ্যতার অগ্রযাত্রায় এটা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এই পুরো একটা কমপ্লেক্স আঞ্চলিক এবং বিশ্ব রিয়েলিটি বা বাস্তবতা, এর ভেতরে আমাদেরকে নেভিগেট করতে হবে। শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী আমাদের একটা বড় পরীক্ষার মধ্যে ফেলে দিলেন। উনি বললেন - আমি যখন তাকে বললাম যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্টের যে ক্যান্ডিডেচার, সেখানে সাইপ্রাস এবং ফিলিস্তিন তারা দে ওয়ার ইন দ্যা ফিল্ড এবং আমরা ক্যান্ডিডেট হওয়া সত্ত্বেও ফিলিস্তিনের গাজার কারণে আমরা আমাদের ক্যান্ডিডেচার স্থগিত রেখেছিলাম।
আমাদের নির্বাচন হওয়ার পর পরই ওই রকম একটা সময়ে ফিলিস্তিন উইথড্র করে নিয়েছে, অ্যান্ড ফিল্ড ওয়াজ সাইপ্রাস ওয়াজ ওনলি ক্যান্ডিডেট ইন দ্যা ফিল্ড। প্রধানমন্ত্রীকে সেটা জানালাম, উনি বললেন, "না, আমাদের এখানে প্রার্থীতা আমরা চালু করব এবং আপনাকে না দিক থেকে হতে হবে।" আমি বললাম, "দিস ইজ ইউ আর গিভিং আস অ্যান্ড ইমপসিবল মিশন।" উনি বললেন, "ইমপসিবল মিশনের জন্যই তো ফরেন অফিস।" এটা বিশাল চ্যালেঞ্জ।
আমি তাকে বললাম, হ্যাঁ, এরকম একটা কাজ আপনার আব্বাও করেছিলেন, সে সত্তরের দশকে। জাপান সিকিউরিটি কাউন্সিলের অস্থায়ী মেম্বারশিপের জন্য তারা কনটেস্ট করছিল, তখন তিনি আমাদের সে সময়ের জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধি, বিখ্যাত একজন কূটনীতিক কে এম কায়সার, হি ওয়াজ এ পার্সোনাল ফ্রেন্ড অব মাই ফাদার ইন লাই - তাকে বললেন, "আমরা বাংলাদেশ দাঁড়াচ্ছি এবং আপনাকে জিততে হবে।" আমার এখনও মনে আছে, যেদিন ফলাফলটা আমরা পেলাম, আমরা অবাক হয়ে গেছি এত অল্প সময়ে, বাংলাদেশের মাত্র চার বছর বয়স ইউনাইটেড নেশনসে, চার-পাঁচ বছর হয়েছে, জাপানের মত একটা শক্তি তাকে হারিয়ে দিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সিটটি জিতে গেল।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, জুলাইয়ের শহীদবৃন্দ, জুলাইয়ে যারা আহত হয়েছেন, তারা আমাদেরকে যে ঐতিহাসিক দায়িত্বটা দিয়ে গেছেন, সেটা পালন করার মতন সক্ষমতা আমাদের আছে। শুধু সক্ষমতা না, আমাদের স্পৃহা এবং ইচ্ছাটাও আছে, সেটা আমরা এই ইউএনজিএ-র ইলেকশনে দেখেছি। এই জিনিসটা আমাদেরকে আগামীতে জারি রাখতে হবে। আমরা যেন মনে রাখি, প্রাইম মিনিস্টার যেটা আজকে বললেন, ওই যে 'ক্লায়েন্ট স্টেট' - ঐ অবস্থাতে যেন আমরা কখনো ফিরে না যাই এবং এর জন্য ফ্রন্টলাইনে আমরা। জুলাইয়ের যে কজ, সেটা আগামী দিনগুলোতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এই আমাদের দায়িত্ব, সেটা আপনারা কেউ ভুলবেন না। প্রতিনিয়ত মনে রাখবেন।
সময়ের আলো/টিকে/জেডআই