সারা দেশে সামাজিক উন্নয়ন করতে সংসদ সদস্যদের বেশ বড়সড়ো বরাদ্দ দিতে যাচ্ছে সরকার। আগের অনুমোদন করা অর্থ থেকে ৩৬৮ কোটি বাড়িয়ে ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ যেন নতুন এমপিদের জন্য নতুন উপহার।
তবে প্রকল্পটি শুরু থেকেই এমপিদের অপব্যবহারের কারণে নানা বিতর্কের জন্ম দেয়। মূলত পতিত আওয়ামী লীগ সরকার সংসদ সদস্যদের নিজ এলাকার ধর্মীয় স্থাপনা ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প অনুমোদন করেছিল। আলোচনা-সমালোচনাকে এক পাশে রেখে শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্প যেন হয়ে উঠেছিল এমপিদের ইচ্ছা পূরণের প্রকল্প।
সংসদ সদস্যদের নিজ এলাকায় উন্নয়নের জন্য ‘সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন-২’ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল পতিত আওয়ামী লীগের আমলে। প্রকল্পের আওতায় সার্বজনীন অবকাঠামো যেমন কবরস্থান, শ্মশান, মসজিদ, মন্দির, চার্চ, প্যাগোডা, গুরুদুয়ারা এবং ঈদগাহ ইত্যাদির অবকাঠামোগত উন্নয়ন-সংস্কার-মেরামত-প্রাচীর নির্মাণ প্রভৃতি ছিল। এই প্রকল্প তখন থেকেই ‘এমপি প্রকল্প’ নামেই পরিচিত পায়।
তবে সংসদ সদস্য না থাকায় অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ প্রকল্পটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যার কারণে প্রকল্পের আগের বকেয়াগুলোও গত অর্থবছরে আগাম দিয়ে দেওয়া হয়। অথচ সমাপ্ত হতে যাওয়া এই এমপি প্রকল্পে নতুন করে ব্যয় ৩৯ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)।
সংশোধনী প্রস্তাবে নানা খাতের বিতর্কিত ব্যয় ও পরিকল্পনা নিয়ে কমিশন আপত্তি জানায়। এই বিতর্ক এবং প্রকল্পের নানা জটিলতা নিয়েই নতুন সরকারের প্রথম একনেক সভায় এটি উঠছে বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে আগামীকাল সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের এনইসি সম্মেলন কক্ষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা অনুষ্ঠিত হবে।
সূত্র জানায়, প্রকল্পটির মূল ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮২ কোটি টাকা, প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পের প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় ৩৬৮ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হচ্ছে এবং মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। তবে আইন অনুযায়ী ৫০ কোটি টাকার বেশি যেকোনো প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা বাধ্যতামূলক। তবে এই প্রকল্পে তা অনুসরণ করা হয়নি। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কাজ শুরুর আগে সম্ভাব্যতা যাচাই না হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে কিছু কাজের প্রাক্কলন সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়নি।
আইএমইডি বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও সামাজিক বিরোধ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ভবিষ্যতে সমজাতীয় প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ করে প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ এবং পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পটির চলমান কাজ করে শেষ করার সিদ্ধান্ত ছিল। তা হলে প্রকল্পটি ৭০০ কোটিতেই শেষ হয়ে যেত। অথচ হঠাৎ করেই প্রকল্পটিতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির ব্যয় বাড়ছে ৮০০ কোটি টাকা। বন্ধ হতে যাওয়া একটি প্রকল্পে কেন হঠাৎ এত ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে সেটি এখন বড় প্রশ্ন? প্রকল্পটি শেষ করার কথা থাকলেও ফের ৩৯ শতাংশ ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী সরকার চেয়েছে তাই প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে এলজিইডি বলছে, চলমান প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপি এলজিইডির ২০২০-২১ অর্থবছরের দর তালিকা অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছিল। এরপর নির্মাণসামগ্রীর বাজারদর ও শ্রমিকের মজুরি বহু ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ জন্য ২০২২ সালের জুনে এলজিইডির বিভাগীয় দর তালিকা একবার সংশোধন করা হয়। পরবর্তী সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সেটি আরও হালনাগাদ করা হয়েছে। ফলে বছরভিত্তিক প্রকৃত খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন বিশেষ সুবিধা ভাতা ঘোষণার কারণে নতুন ইকোনমিক সাবকোড অন্তর্ভুক্ত করাও সংশোধনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পের মাধ্যমে এমপিরা নিজেদের মতো করে মসজিদ, মন্দির, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে নেতাদের নিজস্ব কবরস্থানের উন্নয়নও করেছেন। তবে অনেক জায়গায় কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলনের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি কাজের মান নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে প্রকল্পটির এলাকাভিত্তিক ব্যয় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নতুন সংশোধনী প্রস্তাবে সবচেয়ে বেশি ৫১ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায়, আর সবচেয়ে কম মেহেরপুরে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৫ কোটি টাকা। কমিশন এত পার্থক্যের বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
সময়ের আলো/আআ