নিয়ম রক্ষার সস্তা হেলমেট

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

জাতীয়

দেশে সড়ক দুর্ঘটনার চিত্রে এক ভয়ংকর বাস্তবতা বারবার সামনে আসে— মোটরসাইকেল। আর সেই দুর্ঘটনায় প্রাণহানির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি

2026-04-10T02:13:25+00:00
2026-04-10T02:13:25+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
নিয়ম রক্ষার সস্তা হেলমেট
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ২:১৩ এএম 
প্রতীকী ছবি
দেশে সড়ক দুর্ঘটনার চিত্রে এক ভয়ংকর বাস্তবতা বারবার সামনে আসে— মোটরসাইকেল। আর সেই দুর্ঘটনায় প্রাণহানির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি সাধারণ বিষয়— মানসম্মত হেলমেট না পরা। জীবনরক্ষার এই অপরিহার্য সুরক্ষা উপকরণটি অনেকের কাছেই এখন শুধু আইন এড়ানোর উপায়। ফলে হেলমেট মাথায় থাকলেও নিরাপত্তা থাকছে না, বরং বাড়ছে মৃত্যুঝুঁঁকি।

দেশে আইন করে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীর জন্য হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলেও বাস্তবে মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারের হার খুবই কম। অধিকাংশ চালক ও আরোহী শুধু শাস্তি এড়াতে নিম্নমানের হেলমেট ব্যবহার করেন।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) বাধ্যতামূলক মান তালিকায় হেলমেট অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, তিন স্তরবিশিষ্ট নিরাপদ হেলমেটে যে বিএসটিআইর মানচিহ্ন থাকা উচিত— এ বিষয়ে অনেকেই অবগত নন। ২০২৩ সালের আগস্টে হেলমেটে মানচিহ্ন চালু হলেও এর প্রচার ছিল সীমিত।

সড়ক নিরাপত্তা আইন-২০১৮ অনুযায়ী, হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক হলেও দীর্ঘদিন এর নির্দিষ্ট মান নির্ধারিত ছিল না। সম্প্রতি বিএসটিআই নিরাপদ হেলমেটের মান চূড়ান্ত করে এবং ২০২৪ সালের অক্টোবরে এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়।

এই গেজেট অনুযায়ী, হেলমেট বিক্রি ও ব্যবহারে নির্ধারিত মান অনুসরণ বাধ্যতামূলক এবং আমদানিকৃত হেলমেটের জন্য বিএসটিআইর ছাড়পত্র প্রয়োজন। কিন্তু অধিকাংশ চালকই এই নতুন নিয়ম সম্পর্কে অজ্ঞ। ফলে আইনের প্রয়োগ থাকলেও মান নিয়ন্ত্রণ কার্যত দুর্বল।

সড়ক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, চার চাকার যানবাহনের তুলনায় মোটরসাইকেলের দুর্ঘটনার ঝুঁকি ৩০ গুণ বেশি। বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই) জানিয়েছে, দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৮৮ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয়েছে হেলমেট না পরার কারণে। তবে বর্তমানে নতুন এক ঝুঁকি যুক্ত হয়েছে নিম্নমানের হেলমেট ব্যবহার।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ১৫ দিনে ৩৭৩টি দুর্ঘটনায় ২৯৮ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১১৬ জনই মোটরসাইকেল চালক বা আরোহী।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) জানায়, ২০২৪ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১,৭০৬ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর ৩১.১৩ শতাংশ। আর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩.৪২ শতাংশে।

২০২১ সালে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্র (এআরআই) ঢাকায় মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের হেলমেট ব্যবহার বিষয়ে যৌথ গবেষণা করে। 

ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরে চলাচল করা মোটরসাইকেলের ৯৮ শতাংশের চালক ও আরোহী হেলমেট ব্যবহার করেন। তবে ফুল ফেস ক্লোজড অর্থাৎ, মুখমণ্ডল ও মাথা ঢাকা হেলমেট ব্যবহার করেন ৮ শতাংশ চালক ও আরোহী। ওপেন ফেস বা হ্যাট ধরনের হেলমেট পরেন ২৪ শতাংশ। আর হাফ ফেস হেলমেট পরেন ৬৫ শতাংশ চালক। অর্থাৎ, অনিরাপদ ও পুরোপুরি মানসম্মত নয়, এমন হেলমেট পরেন ৮৯ শতাংশ চালক। তাদের মধ্যে ৩০ শতাংশ চালক শুধু পুলিশের ঝামেলা এবং মামলা এড়াতে হেলমেট পরেন।


রাজধানীতে এই বাস্তবতা বদলাতে প্রতীকী উদ্যোগ নিয়েছে ট্রাফিক পুলিশ। গুলশান-২ এলাকায় নিম্নমানের প্লাস্টিক হেলমেট ভেঙে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হয়েছে। ডিএমপির ট্রাফিক গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মিজানুর রহমান শেলীর নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে সড়কে ব্যবহৃত অনিরাপদ হেলমেট শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, এসব প্লাস্টিক হেলমেট দুর্ঘটনার সময় সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, বরং ভেঙে গিয়ে মাথা ও চোখে আঘাতের ঝুঁকি বাড়ায়।

ডিসি মিজানুর রহমান শেলী বলেন, আইন মানা শুধু জরিমানা এড়ানোর জন্য নয়, নিজের জীবন রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সবাইকে অনুমোদিত ও সার্টিফায়েড হেলমেট ব্যবহারের আহ্বান জানান।

রাজধানীর মিরপুর রোড, আসাদগেট, সায়েন্স ল্যাব, ফার্মগেট ও মালিবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে নিম্নমানের হেলমেট। বিক্রেতাদের ভাষায়, এগুলো ‘মামলা ঠেকানোর হেলমেট’। দাম মাত্র ১০০ থেকে ৫০০ টাকা।

ক্রেতারাও জানেন, এগুলো নিরাপত্তার জন্য নয়, কেবল আইন এড়ানোর জন্যই ব্যবহৃত হয়।’

হেলমেট ব্যবহারের হার বাড়লেও নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না। কারণ সমস্যা হেলমেট না পরায় নয়, বরং সঠিক হেলমেট না পরায়। আইন, গেজেট, অভিযান— সবই আছে,  নেই শুধু সচেতনতা ও মান নিয়ন্ত্রণের কার্যকর প্রয়োগ। ফলে প্রতিদিনই ‘নিয়মরক্ষার হেলমেট’ হয়ে উঠছে মৃত্যুর নীরব কারণ।

জীবন বাঁচাতে হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক— এই উপলব্ধি যতদিন না সাধারণ মানুষের মধ্যে গড়ে উঠবে, ততদিন সড়কে ঝুঁকি কমার সম্ভাবনা ক্ষীণই থেকে যাবে।

এফআর


  বিষয়:   দেশ  সড়ক দুর্ঘটনা  চিত্র  ভয়ংকর  বাস্তবতা  নিয়ম  রক্ষা  সস্তা  হেলমেট 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: