৩৯ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে। এই যুদ্ধে মোট ৫ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ইরানেই প্রাণ হারিয়েছে ৩ হাজার ৩৬৩ জন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৭০১ জন বেসামরিক নাগরিক, অন্তত ২৫৪ শিশু। এই যুদ্ধকালে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
যুদ্ধের সামরিক ব্যয়ও বিশাল; প্রথম ছয় দিনেই যুক্তরাষ্ট্র খরচ করেছে ১১.৩ বিলিয়ন ডলার এবং প্রথম মাসের সম্ভাব্যব্যয় প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। সেই হিসেবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে।
যুদ্ধ চলাকালে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা, ১৫৫টি ইরানি নৌযান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত, শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও হাজার হাজার ড্রোন ব্যবহারের ঘটনা এই সংঘাতকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও বিধ্বংসী সংঘাতে পরিণত করেছে।
একই সঙ্গে তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হওয়ায় এই যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে।
দেশে দেশে বহু মৃত্যু : যুদ্ধবিরতির প্রভাব ইরান ও লেবাননে ভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ইরানে মানুষ রাস্তায় নেমে উদযাপন করেছে এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার আশায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেয়েছে।
৭ এপ্রিল দেওয়া দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ইরানে, যেখানে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ৬৩৬ জন। এর পরেই রয়েছে লেবানন, সে দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত লেবাননে ১ হাজার ৭৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২ শতাধিক মৃত্যু যুদ্ধবিরতি কার্যকরের দিনের।
দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের ৭ এপ্রিলের সবশেষ আপডেট অনুযায়ী, ইরাকে অন্তত ১১৭ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ইসরাইলে নিহতের সংখ্যা ২৩ জন। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে কুয়েত ও কাতারে নিহত হয়েছেন ৭ জন করে আর সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১২ জন। ওমান, বাহরাইন এবং সৌদি আরবে প্রত্যেক দেশে ২ জন করে নিহত হওয়ার তথ্য রয়েছে। অন্যদিকে সিরিয়া ও ওয়েস্ট ব্যাংকে নিহত হয়েছেন ৪ জন করে।
সামরিক ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ জন সেনা নিহত হয়েছেন এবং ফরাসি সামরিক বাহিনীর ১ জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।
হামলা ও সামরিক অভিযান : এই যুদ্ধে সামরিক হামলার পরিমাণ ছিল নজিরবিহীন। প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র ১ হাজারটির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় এবং ইসরাইল আরও ৭৫০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে। যুদ্ধের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে হামলার হার কিছুটা কমলেও সামগ্রিক সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।
২৬ মার্চ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ১০ হাজারটির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার তথ্য জানিয়েছে, যার মধ্যে ছিল ভূগর্ভস্থ স্থাপনা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। ৬ এপ্রিল, যুদ্ধবিরতির আগের দিন পর্যন্ত এই সংখ্যা ১৩ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এই পরিসংখ্যান যুদ্ধের ব্যাপকতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে যে তারা ১৫৫টি ইরানি নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত বা ডুবিয়ে দিয়েছে এবং ইরানের নৌবাহিনীর ৯০ শতাংশ ধ্বংস হয়েছে।
ইসরাইল দাবি করেছে, তারা ২৫০ জনের বেশি ইরানি নেতাকে হত্যা করেছে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন বলে দাবি করা হয়। যুদ্ধবিরতির আগের দিন হামলার মাত্রা আবার বেড়ে যায়, যেখানে এক দিনে ১২৪টি স্থানে হামলা চালানো হয়, যা আগের সপ্তাহের গড়ের তুলনায় ৭০ শতাংশ বেশি।
অস্ত্র, ক্ষয়ক্ষতি ও সামরিক ব্যয় : এই সংঘাতে ব্যবহৃত অস্ত্র এবং তার খরচ বিপুল। যুক্তরাষ্ট্র প্রথম চার সপ্তাহে ৮৫০টির বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, যার প্রতিটির দাম প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন ডলার। শুধু এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের খরচই কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
যুদ্ধের প্রথম তিন সপ্তাহে ক্ষয়ক্ষতি এবং পুনরুদ্ধারের খরচ ১.৪ থেকে ২.৯ বিলিয়ন ডলার বলে অনুমান করা হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র তিনটি যুদ্ধবিমান হারায়, যা ভুলবশত ভূপাতিত হয়েছিল এবং আরেকটি বিমান হারানোর পর একটি বড় উদ্ধার অভিযান চালাতে হয়। এই অভিযানে বহু বিমান এবং শত শত সেনা অংশ নেয়। উদ্ধার অভিযানের সময় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের দুটি এমসি-১৩০ বিমান ধ্বংস করতে বাধ্য হয়, যার প্রতিটির মূল্য ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি।
অন্যদিকে ইরান দাবি করেছে যে তারা দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার ধ্বংস করেছে, যার প্রতিটির দাম প্রায় ২১ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া ১৩ বিলিয়ন ডলারের একটি বিমানবাহী রণতরীতে আগুন লাগার ঘটনা এই যুদ্ধের ব্যয়বহুল চরিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
সেনা মোতায়েন ও আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা : যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। মোট সেনা সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায়, যেখানে অতিরিক্ত ২ হাজার ৫০০ মেরিন এবং ২ হাজার ৫০০ নৌসেনা মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের প্রায় ২ হাজার সৈন্য পাঠানো হয়। এই মোতায়েন যুদ্ধের তীব্রতা এবং সম্ভাব্য বিস্তার সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগকে প্রতিফলিত করে।
অন্যদিকে ইরানও পাল্টা আক্রমণে ব্যাপকভাবে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করে। যুদ্ধের প্রথম ১০০ ঘণ্টায় তারা ৫০০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২ হাজারের বেশি ড্রোন ছোড়ে। বিভিন্ন দেশ মিলে এসব হামলার একটি বড় অংশ প্রতিহত করে। প্রথম দিনে ২৩২টি ড্রোন এবং ১৯৪টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়। মোট ১৬টি দেশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, যা এটিকে একটি আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত করে।
মানবিক বিপর্যয় : যুদ্ধের প্রথম দিনেই একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৭৫ জন নিহত হয়, যাদের বেশিরভাগই স্কুলছাত্রী। এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের ভুল হিসেবে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানে প্রায় ৩ শতাংশ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
গ্রেফতার, দমন-পীড়ন ও শরণার্থী সংকট : যুদ্ধের সময় ইরানে দমন-পীড়নও বেড়ে যায়। অন্তত ১ হাজার ৭০০ মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে জানা যায়। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে ১৬০ জন বন্দিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। অনেক মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছে এবং তাদের জীবিকা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। ত্রাণ সংস্থাগুলো ব্যাপকভাবে সহায়তা প্রদান করেছে কিন্তু পরিস্থিতির ব্যাপকতার কারণে তা পর্যাপ্ত নয়। পাঁচ সপ্তাহে চারজন স্বেচ্ছাসেবক নিহত হওয়ার ঘটনা এই সংকটের ঝুঁকিপূর্ণ দিক তুলে ধরে।
তেল, গ্যাস ও বৈশ্বিক অর্থনীতি : হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধ চলাকালে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছায়, যা পরে কমে ৯২ ডলারে নেমে আসে। কিছু ক্ষেত্রে তেলের দাম ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল।
এই মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন দেশে জ্বালানির খরচ বাড়িয়ে দেয়। যুক্তরাজ্যে অতিরিক্ত ৩০৭ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৮.৪ বিলিয়ন ডলার বাড়তি ব্যয় হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও যুদ্ধের লাভ : যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব ছিল বহুমুখী। প্রথম ছয় দিনে যুক্তরাষ্ট্র ১১.৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে এবং প্রথম মাসে এই খরচ ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে। প্রতিদিন প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। একই সময়ে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভ্রমণ খাতে প্রতিদিন ৪৫০ মিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতি হয়েছে। তেলের দাম বাড়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার চাকরি কমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে এই পরিস্থিতিতে কিছু দেশ লাভবানও হয়েছে। রাশিয়া প্রতিদিন অতিরিক্ত ১৫০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। নরওয়ে ও কানাডাও তেলের দামের কারণে লাভ পেয়েছে। অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বড় অর্ডার পেয়েছে এবং উৎপাদন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে।
যুদ্ধের পরিবেশগত মূল্য : মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি শুধু প্রাণহানি বা অর্থনৈতিক ধাক্কায় সীমাবদ্ধ নয়; এর আরেকটি বড় এবং অনেকাংশে অদৃশ্য দিক হলো পরিবেশগত বিপর্যয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযান ইরানের ভেতরে ও পারস্য উপসাগর অঞ্চলে এমন এক পরিবেশ সংকট তৈরি করেছে, যার প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়িয়ে বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তেল শোধনাগারে আগুন, জ্বালানি ডিপোতে বিস্ফোরণ, তেলবাহী জাহাজে হামলা এবং বিপুল পরিমাণ দূষিত গ্যাস নিঃসরণ; সব মিলিয়ে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা শুধু বর্তমান নয়, আগামী কয়েক দশক পর্যন্ত পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর প্রথম কয়েক সপ্তাহেই শিল্প স্থাপনায় আগুন ও বিস্ফোরণের ফলে প্রায় ৫০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই পরিমাণ নির্গমন অনেক ছোট দেশের বার্ষিক নির্গমনের চেয়েও বেশি। কারণ তেল শোধনাগার, গ্যাস প্লান্ট ও জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস হলে হাইড্রোকার্বন বিপুল পরিমাণে পুড়ে গিয়ে গ্রিনহাউস গ্যাস তৈরি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সূক্ষ্ম কণিকা, কালো কার্বন এবং বিভিন্ন বিষাক্ত যৌগ, যা তাৎক্ষণিকভাবে বায়ুদূষণ বাড়িয়ে দেয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের গতি ত্বরান্বিত করে।
এই দূষণের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব দেখা গেছে তেহরানে। রাজধানীর আশপাশে তেল স্থাপনায় হামলার পর ঘন কালো ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে যায়। কোটি মানুষের বসবাসের এই শহরে বায়ুর মান দ্রুত খারাপ হয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ধোঁয়ার মধ্যে কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড এবং উদ্বায়ী জৈব যৌগের মতো উপাদান রয়েছে, যা সাধারণত বড় শিল্প দুর্ঘটনায় দেখা যায় কিন্তু এত বড় আকারে খুব কমই ঘটে।
গবেষকদের মতে, এটি একসঙ্গে একাধিক শিল্প-কারখানা বিস্ফোরণের সমতুল্য রাসায়নিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
তেহরানের বাসিন্দারা যে ঘটনাটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, সেটি হলো তথাকথিত কালো বৃষ্টি। বায়ুমণ্ডলে ভাসমান ধোঁয়া ও বিষাক্ত কণিকা বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে যখন মাটিতে পড়ে, তখন পানি কালচে হয়ে যায়। এই বৃষ্টি একদিকে বায়ু পরিষ্কার করতে সাহায্য করলেও অন্যদিকে মাটি, ফসল, পানির উৎস এবং বসতবাড়িতে বিষাক্ত পদার্থ জমা করে। ফলে এই দূষণ ভূগর্ভস্থ পানিতে ঢুকে খাদ্যচক্রে প্রবেশ করার ঝুঁকি তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও বিপজ্জনক।
বায়ুদূষণের বাইরে যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে মাটি ও স্থলভাগে। বিস্ফোরণ, ধ্বংসস্তূপ এবং সামরিক সরঞ্জাম থেকে সিসা, পারদ, অ্যাসবেস্টসসহ নানা ক্ষতিকর পদার্থ ছড়িয়ে পড়ছে। এসব পদার্থ মাটির উর্বরতা কমিয়ে দেয় এবং দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশে থেকে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে এই দূষণ দশকের পর দশক স্থায়ী হয়, যা পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত কঠিন করে তোলে।
মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাবও তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক সতর্ক করে বলেছেন, জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ায় খাদ্য, পানি ও বায়ু দূষণের ঝুঁকি বেড়েছে। সূক্ষ্ম কণিকা ও বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশু, বৃদ্ধ এবং দুর্বল জনগোষ্ঠী।
এই পরিবেশগত বিপর্যয় শুধু স্থলভাগেই সীমাবদ্ধ নয়, সমুদ্রেও এর প্রভাব পড়েছে। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে হামলার ফলে তেল ছড়িয়ে পড়ছে পানিতে। এই তেল পানির ওপর স্তর তৈরি করে, যা অক্সিজেন প্রবাহ কমিয়ে দেয় এবং মাছ, সামুদ্রিক পাখি ও প্রবাল প্রাচীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগে থেকেই দুর্বল এই বাস্তুতন্ত্রগুলো আরও বিপদের মুখে পড়েছে।
একই সঙ্গে সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধ করে পানীয় জল তৈরির যে স্থাপনাগুলো রয়েছে, সেগুলো দূষিত হলে পুরো অঞ্চলে পানি সংকট দেখা দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেই পানীয় জলের জন্য এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়, ফলে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এটি বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি করতে পারে।
এফআর