মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতিষ্ঠিত মদিনা রাষ্ট্রটি মাত্র দশ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে বিবর্তনের বিভিন্ন স্তর পার করে একটি সুসংহত ও আদর্শ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। এটি ছিল আরবদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন এক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা। গোত্রীয় শাসন ও যাযাবর মানসিকতার পরিবর্তে সেখানে একটি কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে বংশ বা রক্তের বদলে ‘দ্বীন’ বা ‘আদর্শ’ ছিল সমাজের মূল ভিত্তি।
নগর পরিকল্পনা ও আধুনিক আবাসন নীতি
হিজরতের পর মদিনায় যখন মুহাজিরদের সংখ্যা স্থানীয়দের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়ে যায়, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) এক যুগান্তকারী নগর পরিকল্পনা ও আবাসন নীতি গ্রহণ করেন। আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে তিনি যে পদ্ধতিতে নতুন জনবসতি গড়ে তুলেছিলেন, তা আধুনিক ‘টাউন প্ল্যানিং’ বা নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এক বিস্ময়কর মডেল। রাসুল (সা.)-এর এই পরিকল্পনার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল-
আবাসন ও কর্মসংস্থান : মুহাজিরদের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। নবাগতদের জন্য অস্থায়ী ক্যাম্প থেকে শুরু করে পরবর্তীতে স্থায়ী ঘরের ব্যবস্থা করা ইসলামি সরকারের অন্যতম দায়িত্ব ছিল।
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও বিকেন্দ্রীকরণ : তিনি মদিনা শহরকে একটি নির্দিষ্ট সীমার বাইরে জনাকীর্ণ হতে দেননি। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, শহরের জনসংখ্যা নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে যেন নতুন জনপদ বা শহর গড়ে তোলা হয়। এই বিকেন্দ্রীকরণ নীতি আজকের আধুনিক পরিকল্পিত শহরগুলোর অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
মানবিক পরিবেশ : রাসুল (সা.) শিখিয়েছেন যে, কেবল ইট-পাথরের দালান তৈরিই নগর পরিকল্পনা নয়; বরং এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন যা মানুষের শারীরিক প্রশান্তি ও আত্মিক প্রশান্তি নিশ্চিত করে।
পৌর প্রশাসন ও নাগরিক সেবা : বর্তমান যুগে একটি আধুনিক নগর কর্তৃপক্ষ বা সিটি করপোরেশন যে ধরনের নাগরিক সেবা প্রদান করে, তার পূর্ণাঙ্গ রূপ আমরা নবী যুগে দেখতে পাই।
রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ : নবীজি (সা.) রাস্তার ন্যূনতম প্রস্থ সাত হাত (প্রায় সাড়ে ১০ ফুট) নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। তিনি রাস্তা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন এবং পথচারীর চলার পথ নির্বিঘ্ন রাখা ও রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানোকে ‘সদকা’ বা পুণ্য হিসেবে ঘোষণা করেন।
বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ : নাগরিক সুস্বাস্থ্যের জন্য সুপেয় পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাকে তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। তাঁরই অনুপ্রেরণায় হজরত উসমান (রা.) ‘বীরে রুমা’ বা রুমার কূপ ক্রয় করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন।
স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতা : ইসলামে পরিচ্ছন্নতাকে ‘ঈমানের অর্ধেক’ বলা হয়েছে। প্রতিটি জনবসতি ও মসজিদের সঙ্গে শৌচাগার ও পবিত্রতা অর্জনের সুব্যবস্থা রাখা ছিল তাঁর আমলের আবশ্যিক নাগরিক শৃঙ্খলা।
বাজার তদারকি ও মুক্তবাণিজ্য : অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় রাসুল (সা.) নিজে বাজারের মাপজোখ ও পণ্যের গুণগত মান পরীক্ষা করতেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, মদিনার বাজারে কোনো অবৈধ খাজনা থাকবে না। এই ‘ট্যাক্স ফ্রি’ বা শুল্কমুক্ত বাণিজ্যিক ব্যবস্থা তৎকালীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা : নবী যুগের নাগরিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল শিক্ষা। মসজিদে নববীর বারান্দা বা ‘সুফফা’ ছিল পৃথিবীর প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের জন্য শিক্ষা ও শিল্পকলার বিকাশে সমান সুযোগ নিশ্চিত করেছিল। এ ছাড়া প্রতিবেশী ও অসহায় মানুষের হক বা অধিকার রক্ষার বিষয়ে যে কঠোর নির্দেশনা তিনি দিয়েছিলেন, তা একটি অপরাধমুক্ত ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ নাগরিক সমাজ গঠনে মূল ভূমিকা পালন করেছিল।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নাগরিক ব্যবস্থার এই শাশ্বত নীতিগুলো আজও আধুনিক বিশ্বের নগরবিশারদদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। এটি প্রমাণ করে যে, একটি সুন্দর ও বাসযোগ্য শহর কেবল আধুনিক প্রযুক্তিতে নয়; বরং ইনসাফ, শৃঙ্খলা এবং মানবিক মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
সময়ের আলো/কেএইচও