মুসলমান হিসেবে আমরা কুরআন মাজিদকে আল্লাহ তায়ালার বাণী হিসেবে বিশ্বাস করি এবং যথাযথ মর্যাদা প্রদান করি। কুরআনের ফজিলত অর্জন এবং এর মর্মার্থ অনুধাবনের জন্য আমরা নিয়মিত তেলাওয়াত করে থাকি। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, অধিকাংশ মুসলমান কুরআন তেলাওয়াতের মৌলিক নীতিমালা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত নন।
ফলে কখনো কখনো সওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরআন পাঠ করলেও ভুল পদ্ধতির কারণে প্রত্যাশিত ফল থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। কুরআন তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি স্মরণে রাখা জরুরি তা হলো, এটি পুরো জগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহ তায়ালার বাণী। তাই কুরআনের মাহাত্ম্য অন্তরে ধারণ করে হৃদয়কে এর ভক্তিতে সিক্ত করতে হবে। কুরআন পাঠের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং তাঁর আনুগত্য করা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা সেসব ব্যক্তি, যখন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয় তখন তাদের অন্তর ভীত হয়ে পড়ে, আর যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াতগুলো তেলাওয়াত করা হয় তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা তাদের প্রতিপালকের ওপর ভরসা করে।’ (সুরা আনফাল : ২)
এরপর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শুদ্ধ ও সহিহভাবে কুরআন তেলাওয়াত করা। কারণ ভুল তেলাওয়াত অনেক সময় আয়াতের অর্থ পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ, ‘তুমি কুরআন ধীরে ধীরে, স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে তেলাওয়াত করো’ (সুরা মুজ্জাম্মিল : ৪)। কুরআন তেলাওয়াতের আগে পবিত্রতা অর্জন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্রতা ব্যতীত কুরআন স্পর্শ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে অনুমোদিত নয়।
এ বিষয়ে ইসলামে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে, যা প্রতিটি মুসলমানের জন্য মান্য করা আবশ্যক। অর্থসহ কুরআন পাঠ করা এবং এর মর্মার্থ বোঝার চেষ্টা করা নিঃসন্দেহে একটি উত্তম আমল। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। কুরআনের কিছু আয়াতের অর্থ সহজে বোধগম্য নয়, আবার কিছু আয়াত আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী মনে হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী, সাহাবায়ে কেরামের ব্যাখ্যা, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের মতামত এবং পরবর্তী ইমামগণের তাফসিরের আলোকে বিষয়টি অনুধাবন করা। এটি শুধু উল্লিখিত ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, বরং পুরো কুরআনের মর্মার্থ বোঝার মাপকাঠি।
কিন্তু জ্ঞানের এই শাখায় জনসাধারণের বিচরণ না থাকায় তাদের কর্তব্য কোনো বিজ্ঞ আলেম হতে এ বিষয়গুলোর সমাধান জেনে নেওয়া। অন্যথায় এই ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি পদস্খলনের আশঙ্কা হতে মুক্ত নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তিনি এর দ্বারা অনেককে পথভ্রষ্ট করেন এবং অনেককে সৎপথে পরিচালিত করেন’ (সুরা বাকারা : ২৬)। কুরআন পাঠের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নিজেকে কুরআনের আলোকে গড়ে তোলা, অর্থাৎ এর শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা।
এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন আমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। অতএব যথাযথ আদব ও নিয়ম মেনে নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করলে একদিকে যেমন সীমাহীন সওয়াব অর্জিত হয়, অন্যদিকে কেয়ামতের দিন কুরআনের সুপারিশ লাভের সৌভাগ্যও অর্জিত হতে পারে।
শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সময়ের আলো/আআ