দশ মাসের শিশু আবরার মাহির। সারা শরীরে ছোপ ছোপ দাগ ও ফুসকুড়ি। নাকে নল লাগানো। একটু পরপর টান দিয়ে নাকের নল খুলে ফেলার চেষ্টা করছে। পাশেই বসা মা মুন্নি বেগম সন্তানের যন্ত্রণাকাতর মুখচ্ছবি দেখে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে নীরবে চোখের পানি ফেলছেন আর ছেলের শরীরে একটু পরপর হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। বারবার সান্ত্বনা দেওয়ার পরও কিছুতেই কান্না থামছে না ছেলের।
রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের (শিশু হাসপাতাল) বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে গত চার দিন আগে ভর্তি হয়েছেন বলে জানান হাজারীবাগের বাসিন্দা মুন্নি বেগম।
তিনি জানান, ১০-১২ দিন আগে প্রথমে ঠান্ডা, জ্বর, কাশি হয়, পরে হাম শনাক্ত হয়। পরে এই হাসপাতালে ভর্তি করি। তিন দিন চিকিৎসার নেওয়ার পর কিছুটা সুস্থ হলে ডাক্তাররা রিলিজ দিয়ে দেয়। আমরা বাসায় চলে যাই। এর কয়েক দিন পর আবারও সারা শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দেয়। তার সঙ্গে তীব্র জ্বর, পাতলা পায়খানা ও বমি। পরে আবার হাসপাতালে নিয়ে এসে ভর্তি করাইছি। দুদিন ধরে এখানে আছি কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হচ্ছে বরং আরও অবনতি ঘটছে। শুধু এই শিশু নয়, এমন আরও অনেক শিশুই দ্বিতীয়বার হামের উপসর্গে আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
এ ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, দুই ডোজ টিকা পাওয়ার পরও আবার হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। এই নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় এখন শয্যার চেয়ে রোগী বেশি। ভর্তি রোগীদের বড় অংশই শিশু; জায়গা না থাকায় অনেকে করিডোর ও বারান্দায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশেষ করে ছয় মাস থেকে তিন বছর বয়সী শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ হাম হাঁচি-কাশি, কথা বলা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর জটিলতায় ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, চোখ ও মস্তিষ্কে প্রদাহ হতে পারে। এসব রোগীকে আলাদা ব্যবস্থাপনায় রেখে চিকিৎসা দিতে হয়। এ ছাড়াও পূর্ণ সুস্থ হওয়ার আগেই হাসপাতাল ত্যাগ এবং পরবর্তীতে সঠিক যত্নের অভাবেই নিউমোনিয়া ও পুষ্টিহীনতার মতো জটিলতা বাড়ছে। তাই শিশুদের সর্বোচ্চ সুরক্ষার পাশাপাশি দুই ডোজ টিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।
আরও পড়ুন
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে হাম শনাক্তের হার এ পর্যন্ত ঊর্ধ্বমুখী। চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ডের কারণে ধাপে ধাপে নতুন রোগী সামনে আসে। সাধারণত হামের প্রাদুর্ভাব ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল এবং কখনো মে পর্যন্ত বেশি দেখা যায়। তবে এবারের প্রাদুর্ভাব তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় মার্চ ও এপ্রিলজুড়ে সংক্রমণ অব্যাহত থাকতে পারে। এ ছাড়া টিকাদান শুরু হলেও শিশুর শরীরে পূর্ণমাত্রায় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে দুই থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগে। ফলে সংক্রমণের এ ধারা আরও কিছু সময় চলতে পারে। পরে আস্তে আস্তে নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ১৭৭ জন এবং নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছেন ১৬৮ জন। সব মিলিয়ে হাম উপসর্গে রোগী পাওয়া গেছে ১ হাজার ৩৪৫ জন। একই সময়ে হাম সন্দেহে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আর গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত অর্থাৎ ২৭ দিনে হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৭ জনে। এর মধ্যে সন্দেহজনক হামে ১৪৪ শিশুর এবং নিশ্চিত হামে ২৩ শিশুর মৃত্যু হয়।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ১৫ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১৩ হাজার ৪৯৭ জন। আর এই সময়ে সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮ হাজার ৯১০ জন। আর এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামের রোগী পাওয়া গেছে ২ হাজার ৪০৯ জনের শরীরে। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত হাম থেকে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৬ হাজার ৬০৯ জন।
বিভাগওয়ারি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক আক্রান্তের মধ্যে সর্বোচ্চ ঢাকা বিভাগে রোগী পাওয়া গেছে ৪৬২ জন। এর মধ্যে ১৪০ জন রোগীকে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত করা হয়েছে। এর পরেই রাজশাহী বিভাগে ২৩০ জন। আর এই বিভাগে নিশ্চিত হামের রোগী পাওয়া গেছে ১৬ জন। আর খুলনা বিভাগের ৬০ জনের মধ্যে ১০ জন, বরিশালে ৯৬ জনের মধ্যে একজন এবং সিলেট বিভাগে ৬০ জন রোগীর মধ্যে একজন নিশ্চিত হামের রোগী পাওয়া গেছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ১৮৬ জন, ময়মনসিংহে ২৭ জন এবং রংপুর ২৬ জন সন্দেহজনক হামের রোগী পাওয়া গেলেও এসব বিভাগে নিশ্চিত কোনো হামের রোগী শনাক্ত হয়। এ ছাড়া ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৫ হাজার ৬৩৩ জন হামের রোগী পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সন্দেহজনক ৩ হাজার ৭৭৯ জন এবং নিশ্চিত হামের রোগী রয়েছে ১ হাজার ২৮১। এর পরেই রাজশাহীতে মোট ২ হাজার ৪৭৮ জন রোগীর মধ্যে সন্দেহজনক ১ হাজার ৭৩০ জন এবং নিশ্চিত হামের রোগী পাওয়া গেছে ৭৫৭ জন।
সরকারিভাবে হামের প্রকোপ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু হয় মূলত ১৫ মার্চ থেকে। বিভাগওয়ারি মৃত্যুর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সন্দেহজনক হামে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে রাজশাহী বিভাগে ৬২ জন। এরপরই আছে ঢাকা বিভাগে ৫৯ জন, চট্টগ্রামে ১০ জন, খুলনাতে ৯ জন, বরিশালে ২ জন এবং সিলেট ২ জন। তবে ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগে কারও মৃত্যু হয়নি।
হামের প্রাদুর্ভাব প্রসঙ্গে রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শ্রীবাস পাল সময়ের আলোকে বলেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, সাধারণত জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হওয়ার পর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। শিশুদের মধ্যে এ রোগের ঝুঁকি বেশি এবং জটিলতা হলে নিউমোনিয়াসহ অন্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে শুধু হামের কারণে শিশুদের মৃত্যু হয়েছে বিষয়টা তা নয়। দেখা গেছে অনেক শিশুদের নিউমোনিয়াসহ শরীরে অনেক ধরনের জটিলতা ছিল। পরে হাম হয়ে মারা গেছে। তিনি বলেন, যদি কোনো শিশু হামে আক্রান্ত হয়, তা হলে পরবর্তী কয়েক দিন তার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকতে পারে। ফলে ফুসফুসসহ অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। তাই জ্বর কমলেই রোগীকে বাড়ি পাঠানো ঠিক নয়। শিশু পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাকে ছাড়পত্র দেওয়া উচিত নয়। হামে আক্রান্ত শিশুদের পুষ্টিকর খাবার ও ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট দেওয়ার পাশাপাশি বিশেষ যত্নে রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পালমনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. কামরুজ্জামান কামরুল সময়ের আলোকে বলেন, টিকা না নেওয়া এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়ছে। বিশেষ করে ছয় মাস থেকে তিন বছর বয়সী শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এর মূলে সময়মতো টিকা না নেওয়া, অপুষ্টি, ঘনবসতি, সীমান্ত অঞ্চলে সংক্রমণ। তিনি বলেন, আমরা দেখেছি বিভিন্ন কারণে শিশুদের প্রথম ডোজের টিকা দেওয়া হলে দ্বিতীয় ডোজ নেয়নি। ফলে শিশুরা পুষ্টিহীনতাসহ নানা ধরনের জটিলতায় ভুগছে। তাই হামে আক্রান্ত রোগীদের সম্পূর্ণ আলাদা আইসোলেশন (বিচ্ছিন্নকরণ) নিশ্চিত করতে হবে এবং বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত টিকাদান সম্পূর্ণ করা। এ ছাড়াও শিশুদের পুষ্টির ঘাটতি দূর করতে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন এই চিকিৎসক।
বরিশালে আরও দুই শিশুর মৃত্যু : বরিশাল ব্যুরো জানিয়েছে, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাম উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে বরিশাল বিভাগে হাম উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪ জনে। মৃত সাদিয়া (২) বরিশালের মুলাদী উপজেলার কাজিরচর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের রাজীবের মেয়ে এবং রাকিব (৯ মাস) বানারীপাড়া উপজেলার চাখার ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হাবিবুর রহমানের ছেলে।
শুক্রবার বিষয়টি নিশ্চিত করে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মুশিউল মুনির জানান, এই দুই শিশু ৮ এপ্রিল দুপুর ২টার দিকে হাসপাতালে ভর্তি হয় হাম উপসর্গ নিয়ে এবং শুক্রবার ভোরে দুজনেই মৃত্যু হয় এক ঘণ্টার ব্যবধানে। সাদিয়ার মৃত্যু হয় ভোর পৌনে ৪টায় ও রাকিবের মৃত্যু হয় ভোর পৌনে ৫টায়। এ নিয়ে হাসপাতালে হাম উপসর্গে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
পরিচালক জানিয়েছেন, হাসপাতালে বর্তমানে ৯২ জন হাম উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যার মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ৩১ জন ভর্তি হয়েছেন। একই সঙ্গে গত ২৪ ঘণ্টায় ২৮ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি গেছেন। এই পর্যন্ত এই হাসপাতালে মোট ৩৪১ জন হাম উপসর্গ থাকা রোগী ভর্তি হয়েছেন।
এএডি/