৪৮ বছরের অচলায়তন ভাঙবে কি ইসলামাবাদে?

বাধন অধিকারী

আন্তর্জাতিক

যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে রূপ দিতে ইসলামাবাদে গতকাল শনিবার শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। কয়েক সপ্তাহের ভয়াবহ সংঘাত,

2026-04-12T00:52:21+00:00
2026-04-12T01:32:53+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
৪৮ বছরের অচলায়তন ভাঙবে কি ইসলামাবাদে?
বাধন অধিকারী
প্রকাশ: রোববার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৫২ এএম  আপডেট: ১২.০৪.২০২৬ ১:৩২ এএম
সংগৃহীত ছবি
যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে রূপ দিতে ইসলামাবাদে গতকাল শনিবার শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। কয়েক সপ্তাহের ভয়াবহ সংঘাত, পাল্টাপাল্টি হামলা এবং হুমকির পর এই বৈঠককে দুই দেশের দীর্ঘ ৪৮ বছরের বৈরিতার এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে আলোচনার এই সম্ভাবনাময় মুহূর্তকে ছাপিয়ে উঠেছে ইসরাইলের ধারাবাহিক সামরিক পদক্ষেপ। লেবাননে তেল আবিবের হামলা যুদ্ধবিরতিকে কেবল নড়বড়েই করছে না, বরং কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের জট খুলতে যতটা বাধা রয়েছে, তার চেয়েও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসরাইলের সক্রিয় ‘বাধা সৃষ্টিকারী’ ভূমিকা। বিকল্প ধারার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ইন্টারসেপ্টের এক ব্রিফিং অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে ইসরাইলের আরেকটি সমান্তরাল লড়াই চলছে, যার লক্ষ্য কূটনীতিকেই ভেঙে দেওয়া।

১৯৭৯ সালের ইরানে সংঘটিত ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক এক গভীর অচলায়তনে আটকে যায়। শাহ শাসনের পতন এবং তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস জিম্মি সংকট দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাসকে স্থায়ী রূপ দেয়। এরপর থেকে নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক ইস্যু, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার সবকিছু মিলিয়ে সম্পর্ক ক্রমেই কঠিন হয়েছে। 
মাঝেমধ্যে সমঝোতার চেষ্টা হলেও তা টেকেনি। বিশেষ করে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি একসময় বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হয়েছিল, কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ায় সেই আস্থার ভিত্তিও ভেঙে পড়ে। ফলে প্রায় ৪৮ বছর ধরে দুই দেশের সম্পর্ক সংঘাত, সন্দেহ ও চাপের এক বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। বর্তমান ইসলামাবাদ আলোচনা সেই দীর্ঘ অচলায়তন ভাঙার প্রথম বাস্তব সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

ইসলামাবাদের এই আলোচনা এমন এক প্রেক্ষাপটে শুরু হয়েছে, যেখানে মাত্র কয়েক দিন আগেও পরিস্থিতি ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া তার বক্তব্যে পুরো একটি সভ্যতা নিশ্চিহ্ন করার কথাও উঠে আসে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। কিন্তু সেই অবস্থান থেকে দ্রুত সরে এসে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং আলোচনায় বসার নাটকীয় সিদ্ধান্ত এখন প্রশ্ন তৈরি করেছে : এটি কি সত্যিকারের কূটনৈতিক উদ্যোগ, নাকি কৌশলগত চাপের ফল?

এই যুদ্ধবিরতির পেছনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের উদ্যোগে হওয়া এই সমঝোতায় ইরান একটি ১০ দফা প্রস্তাব দেয়, যার মধ্যে ছিল হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ নৌ চলাচলের নিশ্চয়তা। এই প্রণালি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের বড় একটি অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইন্টারসেপ্ট ব্রিফিংয়ে নরগেস বাজঘলি এই বিষয়টিকে আলোচনার কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তি হিসেবে তুলে ধরেন। 

তিনি বলেন, ‘ইরানের প্রকৃত শক্তি পারমাণবিক অস্ত্রে নয়, বরং এই প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণে।’ তার মতে, ইরান কার্যত বিশ্ব অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিরা চেপে ধরার সক্ষমতা রাখে, যা যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় শক্তিগুলোকে দ্রুত আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছে।

কারণ যুদ্ধের সময় দেখা গেছে, যখনই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়েছে, তখনই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি চাপে পড়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই পথ খোলা রাখা শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক প্রয়োজন।

তবে এই আলোচনার আরেকটি বড় দিক হলো অবিশ্বাস। ইরান বারবার বলছে, তারা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন থেকে সুরক্ষা চায়। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতার কারণে তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিকে সহজে বিশ্বাস করতে রাজি নয়। ইন্টারসেপ্ট ব্রিফিংয়ে বাজঘলি বলেন, ‘ইরান একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা প্রতারিত হয়েছে, তাই তারা শুধু কথার ওপর নির্ভর করতে চায় না।’

এই অবিশ্বাসের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক বারবার উত্তেজনা, নিষেধাজ্ঞা এবং সংঘাতের মধ্য দিয়ে গেছে। ফলে বর্তমান আলোচনায় শুধু সাম্প্রতিক যুদ্ধ নয়, বরং কয়েক দশকের অভিজ্ঞতাও প্রভাব ফেলছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। 

ইন্টারসেপ্টের প্রতিবেদনে আলি গারিব উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এই যুদ্ধ ও আলোচনাকে নিয়ে স্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। কেউ কেউ কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিতে চান, আবার অন্য অংশ সামরিক চাপ বজায় রাখার পক্ষে। এই বিভাজন আলোচনার ফলাফলকে অনিশ্চিত করে তুলছে। কারণ একদিকে আলোচনার টেবিলে সমঝোতার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে একই সময়ে সামরিক প্রস্তুতি অব্যাহত রয়েছে। সব মিলিয়ে ইসলামাবাদের এই আলোচনা একদিকে যেমন একটি সম্ভাবনার জানালা খুলেছে, অন্যদিকে তেমনি তা নানা প্রশ্ন ও সংশয়ে ঘেরা। এটি কি সত্যিই ৪৮ বছরের অচলাবস্থা ভাঙার শুরু, নাকি আবারও একটি সাময়িক বিরতি তার উত্তর এখনও অনিশ্চিত।

ইসলামাবাদে আলোচনা শুরু হওয়ার আগে যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল, সেটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই চাপের মুখে পড়ে। বিশেষ করে লেবাননে ইসরাইলের ব্যাপক বিমান হামলা এই যুদ্ধবিরতির বিশ্বাসযোগ্যতাকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে। 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সবশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত লেবাননে কমপক্ষে ৩৫০ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এই বাস্তবতা কেবল মানবিক বিপর্যয়ই তৈরি করেনি, বরং কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকেও দুর্বল করে দিয়েছে।

ইন্টারসেপ্ট ব্রিফিংয়ে এই প্রসঙ্গে ওই সংবাদমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ বার্তা সম্পাদক আলি গারিব বলেন, এই যুদ্ধবিরতি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হলেও ইসরাইল তা নিজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য মনে করেনি। 

তার ভাষায়, ‘লেবাননকে যুদ্ধবিরতির বাইরে রেখে ইসরাইল কার্যত দেখিয়ে দিয়েছে, তারা এই সমঝোতার অংশ নয়।’ এই অবস্থান শুধু বাস্তবতাকে জটিল করেনি, বরং একটি বড় প্রশ্ন তুলেছে যে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধকে কি আংশিকভাবে থামানো সম্ভব? এই হামলার আরেকটি দিক হলো এর সময় নির্বাচন। যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছিল, তখনই এই ধরনের সামরিক তৎপরতা কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এটি কেবল সামরিক অভিযান নয়, বরং আলোচনার গতিপথ প্রভাবিত করার একটি কৌশল।

ইন্টারসেপ্টের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই হামলার ফলে ইরানের পক্ষ থেকেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তারা এটিকে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। ফলে একটি দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। একদিকে কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি, অন্যদিকে বাস্তবে যুদ্ধ চলমান।

ইসরাইলের এই ভূমিকা নতুন নয়। বহু বছর ধরেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সন্দেহের চোখে দেখে এসেছে দেশটি। বিশেষ করে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে এই অবস্থান আরও দৃঢ় হয়েছে। ইন্টারসেপ্টে প্রকাশিত 

বিশ্লেষণে বলা হয়, নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা বিপজ্জনক। তার যুক্তি হলো, ইরান কৌশলগতভাবে সময় কিনতে চায় এবং আলোচনাকে ব্যবহার করে নিজেদের শক্তি বাড়ায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ইসরাইল প্রায়ই সামরিক পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দেয়। 

এই প্রসঙ্গে ইন্টারসেপ্ট ব্রিফিংয়ে আলি গারিব উল্লেখ করেন, ‘নেতানিয়াহুর জন্য কূটনৈতিক সমাধান মানে হচ্ছে তার দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করা।” ফলে যখনই আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তখনই কোনো না কোনোভাবে উত্তেজনা তৈরি করা হয় যা আলোচনার গতি কমিয়ে দেয় বা ভেঙে দেয়। এই অবস্থান শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিকও। 

ইসরাইল মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য বদলে যাবে। এতে ইসরাইলের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হতে পারে। ফলে তাদের জন্য আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করা একটি যৌক্তিক নীতি হিসেবে দেখা হয়।

ইন্টারসেপ্ট ব্রিফিংয়ে আলোচনায় উঠে আসে, ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক পর্যায়ে ইরানের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছে। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তারা লেবানন, সিরিয়া এবং অন্যান্য জায়গায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যা কোনো একক চুক্তির মাধ্যমে সহজে থামানো সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষাপটে যুদ্ধবিরতি কার্যত আংশিক হয়ে পড়ে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যদি সরাসরি সংঘাত কমিয়েও ফেলে, তবুও প্রক্সি যুদ্ধ চলতেই থাকে। এতে করে কূটনৈতিক সমাধানের কার্যকারিতা কমে যায়।

এই পুরো পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও একটি বড় প্রশ্ন। একদিকে তারা ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছে, অন্যদিকে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন দিচ্ছে। ইন্টারসেপ্ট ব্রিফিংয়ে এই দ্বৈত অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করা হয়েছে। 

আলি গারিব বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে দুই বিপরীত ভূমিকা পালন করছে। একদিকে শান্তির মধ্যস্থতাকারী, অন্যদিকে সংঘাতের অংশীদার। এই দ্বৈততা আলোচনার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইসরাইলের লেবানন হামলা বন্ধে চাপ সৃষ্টি করছে না। ফলে ইরানের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিরপেক্ষ বলে মনে হয় না।

কূটনীতি নাকি সামরিক কৌশল? ইন্টারসেপ্ট ব্রিফিংয়ে নরগেস বাজঘলি বলেন, এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে সামরিক শক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক কৌশলও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যদি সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকে, তা হলে কোনো কূটনৈতিক প্রক্রিয়াই স্থায়ী ফল দিতে পারবে না। 

তার মতে, ইসরাইলের এই পদক্ষেপগুলো কেবল বর্তমান আলোচনাকে নয়, ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কারণ প্রতিটি ব্যর্থ আলোচনার পর অবিশ্বাস আরও গভীর হয়, যা পরবর্তী সমঝোতাকে আরও কঠিন করে তোলে।

অবিশ্বাসের দীর্ঘ ইতিহাস : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের মূল সংকটটি শুধু বর্তমান যুদ্ধ বা সাম্প্রতিক উত্তেজনায় সীমাবদ্ধ নয়; এর শিকড় প্রায় পাঁচ দশক পুরোনো। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে যে বৈরিতা তৈরি হয়েছে, তা সময়ের সঙ্গে আরও জটিল হয়েছে। 

নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হুমকি, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সব মিলিয়ে এই সম্পর্ক একটি স্থায়ী অচলায়তনে আটকে গেছে। ইন্টারসেপ্ট ব্রিফিংয়ে নার্গিস বাজোগলি উল্লেখ করেন, ইরান বারবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। ফলে তারা এখন কোনো মৌখিক নিশ্চয়তায় বিশ্বাস করে না। 

তার মতে, ভবিষ্যৎ চুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে এই গভীর অবিশ্বাস। মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণেও একই বিষয় উঠে এসেছে। 

সৈয়দ হোসেইন মৌসাভিয়ানের সেই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান মনে করে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা যেকোনো চুক্তি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে যেতে পারে। ফলে তারা এখন এমন কাঠামো চায়, যা সহজে বাতিল করা যাবে না। এই বাস্তবতায় ইসলামাবাদের আলোচনা শুধু একটি চুক্তি তৈরির চেষ্টা নয়; বরং এটি একটি আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টা।

দীর্ঘদিন ধরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার কেন্দ্র ছিল পারমাণবিক কর্মসূচি। তবে সাম্প্রতিক সংঘাত এই সমীকরণে পরিবর্তন এনেছে। এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালি এবং জ্বালানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। নার্গিস বাজোগলি ইন্টারসেপ্ট ব্রিফিংয়ে বলেন, এই যুদ্ধ দেখিয়েছে যে ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি পারমাণবিক অস্ত্র নয়, বরং তেল পরিবহন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। তার মতে, এই সক্ষমতা আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে দ্রুত আলোচনায় ফিরতে বাধ্য করেছে। 

মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ইরান এখন বুঝতে পারছে যে তাদের কৌশলগত শক্তি অর্থনৈতিক চাপ তৈরিতে, যা সরাসরি বৈশ্বিক বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে। এই পরিবর্তন আলোচনার চরিত্রও বদলে দিয়েছে। আগে যেখানে পারমাণবিক কর্মসূচি ছিল মূল ইস্যু, এখন সেখানে এসেছে অর্থনীতি, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা।

চুক্তি হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে নিষেধাজ্ঞা। ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধ শেষে যদি তারা আগের মতোই অর্থনৈতিক চাপে থাকে, তা হলে কোনো চুক্তির অর্থ নেই। 

ইন্টারসেপ্ট ব্রিফিংয়ে বাজোগলি বলেন, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া বা উল্লেখযোগ্যভাবে শিথিল করা ছাড়া এই আলোচনা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। আর মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এটি একটি কঠিন সিদ্ধান্ত। কারণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে, আবার না তুললে আলোচনাই ভেঙে যেতে পরে।

এই আলোচনার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে যেতে পারে। ইন্টারসেপ্ট ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, এই যুদ্ধ ইতিমধ্যেই উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে তেল রফতানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো এখন নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। 

মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, যদি ইরান অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তা হলে আঞ্চলিক রাজনীতিতে তাদের প্রভাব আরও বাড়বে। এই কারণে অনেক দেশই এই আলোচনার ফলাফলের দিকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

যদি এই আলোচনা সফল হয়, তা হলে এর প্রভাব বহুমাত্রিক হবে। প্রথমত, এটি দীর্ঘদিনের বৈরিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তন করতে পারে। দ্বিতীয়ত মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত কমানোর একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে। 

ইন্টারসেপ্ট ব্রিফিংয়ের আলোচনায় বলা হয়েছে, এই যুদ্ধ দেখিয়েছে যে সরাসরি সংঘাতের খরচ অত্যন্ত বেশি, যা উভয় পক্ষকেই নতুন সমাধানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মিডল ইস্ট আইয়ের মতে, একটি সফল চুক্তি শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এটি আঞ্চলিক জোট ও সম্পর্কগুলোকেও পুনর্গঠন করতে পারে।

অন্যদিকে যদি এই আলোচনা ব্যর্থ হয়, তা হলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হতে পারে। যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তখন ইরান যুক্তরাষ্ট্র দুই পক্ষই আরও আক্রমণাত্মক কৌশল নিতে পারে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি নিয়ে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকিও থাকবে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

সবশেষে প্রশ্ন একটাই এই আলোচনা কি সত্যিই ৪৮ বছরের অচলায়তন ভাঙতে পারবে? বর্তমান পরিস্থিতি একদিকে যেমন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে, অন্যদিকে তেমনি ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। ইসরাইলের বাধা, পারস্পরিক অবিশ্বাস, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপÍসব মিলিয়ে এটি একটি কঠিন পথ। 

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার এই যুদ্ধ দেখিয়েছে যে পুরোনো কৌশল আর কার্যকর নয়। ফলে উভয় পক্ষই এখন নতুন সমাধানের সন্ধানে। এই কারণেই ইসলামাবাদের আলোচনা শুধু একটি বৈঠক নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এখন দেখার বিষয়, এই মুহূর্তটি ইতিহাস বদলাতে পারে কি না, নাকি আবারও হারিয়ে যাবে অচলায়তনের অন্ধকারে।


  বিষয়:   যুদ্ধবিরতি  শান্তিচুক্তি  ইসলামাবাদ  যুক্তরাষ্ট্র  ইরান 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: