ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ ও সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। এ ছাড়া নন-লিস্টেড কোম্পানির করহার লিস্টেড কোম্পানির মতো ২৫ শতাংশ ও পূর্ণাঙ্গ অটোমেটেড করপোরেট কর রিটার্ন পদ্ধতি চালু করাও প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। সোমবার ডিসিসিআই আয়োজিত রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘প্রাক-বাজেট আলোচনা ২০২৬-২৭ : বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এ কথা জানায় সংগঠনটি।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির বলেন, আসন্ন অর্থবছরের বাজেটে দেশের ব্যবসায়ীদের ওপর কোনো খড়গ নামবে না। তিনি বলেন, রাজস্ব শৃঙ্খলা আনতে আমাদের করের আওতা বাড়ানো দরকার। এই করের আওতা বাড়াতে আমরা ব্যক্তিশ্রেণির কর বাড়াচ্ছি না বরং করদাতার সংখ্যা বাড়াচ্ছি। আমার বিশ্বাস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও অর্থ মন্ত্রণালয় এই নিয়ে যে পরিকল্পনা ও কাজ করছে, তার ইতিবাচক প্রতিফলন আগামী বাজেট ও পরবর্তী বছরে সবাই দেখতে পাবে।
একই সঙ্গে আগামী বাজেটে ব্যবসায়ীদের ওপর করের বোঝা বৃদ্ধি করা হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগামীতে বেসরকারি খাতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সরকারের কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়াতে বিশেষ করে ব্যবসা পরিচলনা ব্যয় হ্রাস ও সরকারি সেবা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজীকরণের কোনো বিকল্প নেই। তিনি আরও বলেন, বিগত সরকারের আমলে গৃহীত অযৌক্তিক কিছু উচ্চাবিলাসী প্রকল্পের কারণে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ রয়েছে, যা কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, আমাদের জিডিপির আকার প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ হলেও দেশের প্রায় ৭ কোটি মানুষ এখনও দারিদ্র্য সীমায় বসবাস করছে। বাকি থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যেও করদাতার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। মন্ত্রী বলেন, দেশে জ্বালানি সংরক্ষণের সক্ষমতার অভাবে সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে চড়া মূল্যে বর্তমানের সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি কিনতে বাধ্য হচ্ছে।
এদিকে প্রয়োজনে শাস্তি দিয়ে হলেও অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা দেশে রাখতে এবং তা বিনিয়োগে আনার ওপর জোর দিয়েছেন ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হোসেন খালেদ। তিনি বলেন, কিছুটা অস্বস্তিকর শোনাতে পারে, তবে বাস্তবতা হলো- বাজারে বিপুল পরিমাণ অপ্রদর্শিত আয় রয়েছে। এ অর্থকে কোনো না কোনোভাবে মূল অর্থনীতির ধারায় ফেরানো না গেলে বা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নিলে তা দেশের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বিভিন্ন প্রণোদনা কিংবা প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে হলেও এ অর্থ দেশে ধরে রাখা জরুরি। পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা গেলে অর্থনীতির জন্য তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এমন বাজেট প্রণয়ন করা ঠিক হবে না যাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায় এবং সাধারণ মানুষ কষ্টে পড়ে বলে জানিয়েছেন আলোচকরা।
ইন্টারন্যাশন্যাল চেম্বার অব কমার্স-বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, বর্তমান সরকারকে বেসরকারি খাতের প্রতিবন্ধকতাগুলো বিবেচনায় নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে আগামী বাজেট প্রণয়ন করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে জিডিপিতে করের অবদান বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও সত্যিকার অর্থে সেটি বাস্তবায়নের সরকারের তেমন কার্যকর উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। সেই সঙ্গে ঋণের উচ্চ সুদহার, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ হ্রাস এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে স্থাণীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে তিনি জরুরিভাবে বিকল্প উৎস খোঁজা ও মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরতা হ্রাসের আহ্বান জানান এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য একটি স্থিতিশীল ও অনুমেয় নীতি পরিবেশ নিশ্চিতের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মনজুর হোসেন বলেন, বর্তমানের বৈশ্বিক সংকটের কারণে স্থিমিত হওয়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সচল করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এ ছাড়া বিনিয়োগকে ত্বরান্বিত করতে এমএসএমই খাতকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের ওপর তিনি জোরারোপ করেন।
স্বাগত বক্তব্যে তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিধারা অব্যাহত রাখতে রাজস্ব আহরণ পদ্ধতির অটোমেশন, সহজীকরণ, করজাল সম্প্রসারণ একান্ত অপরিহার্য। সেই সঙ্গে টেকসই ও স্থিতিশীল আর্থিক খাতের জন্য সংশ্লিষ্ট নীতির আধুনিকায়ন, খেলাপি ঋণ হ্রাস ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করা, উৎপাদনশীল খাতে লক্ষ্যভিত্তিক পুনঃঅর্থায়ন ও স্থানীয় বিনিয়োগ সম্প্রসারণে নীতি সুদহার যৌক্তিকীকরণের ওপর জোরারোপ করেন। সভায় ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন দৈনিক সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী।
সময়ের আলো/আআ