গ্রেফতার দেখানোর ৫ দিনের মাথায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর জামিন এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। গুঞ্জন উঠেছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দলটিকে রাজনীতির মাঠে আসতে পারে তার হাত ধরে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারির মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল; সম্প্রতি বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার পার্লামেন্টে অধ্যাদেশটি পাস করায় এটি আইনে পরিণত হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে, বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার সহসাই মূল আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফেরাতে আগ্রহী নয়।
সেকারণেই দলটি যদি আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরতে চায়, তা পুরোনো কাঠামো বা পরিচয়ে নয়; বরং নতুন নামে, নতুন নেতৃত্বে এবং ভিন্ন রাজনৈতিক বিন্যাসে ফিরে আসার সম্ভাবনাই বেশি আলোচিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে ঘিরে নতুন নেতৃত্বের গুঞ্জন ছড়ালেও এর পক্ষে দৃশ্যমান কোনো প্রমাণ মেলেনি। দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের অবস্থান, সাংগঠনিক কাঠামোর ধারাবাহিকতা এবং আইনি বাস্তবতা- সব মিলিয়ে এমন পরিবর্তন আপাতত অসম্ভব বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে গুঞ্জন যতটা জোরালো, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন।
দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা কেউ বিদেশে, কেউবা আত্মগোপণে রয়েছেন। এর বাইরের দলটির শীর্ষ নেতাদের একটি বৃহৎ অংশ কারাগারে রয়েছেন। দলের দায়িত্বশীলদের একাংশের ভাষ্য, এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। সংগত কারণে নেতৃত্বের কোনো পরিবর্তন আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি দেশের বাইরে থাকলেও এখনও তিনিই সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া দলের সাংগঠনিক কাঠামো আগে যা ছিল, সেটি রয়েছে।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের ১১ মে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’ সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। অবশ্য, এর আগেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দলীয় সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। আর দলটির শীর্ষ নেতাদের একটি বড় অংশ বিদেশে আছেন। আর এর বাইরে কেউ কারাগারে কেউ আত্মগোপনে রয়েছেন। ফলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই দলটির সাংগঠনিক কার্যকমে স্থবিরতা দেখা দেয়। তবে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেফতারের ৫ দিনের মাথায় জামিনকে ঘিরে গুঞ্জন তীব্র হচ্ছে।
দলীয় নেতাদের একাংশ মনে করছেন, যেহেতু দেশে গণতান্ত্রিক একটি সরকার রয়েছে, সে ক্ষেত্রে হয়তো কোনো না কোনো সময় আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যক্রম চালানোর অনুমতি পাবে। ফলে দলটিতে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে চিন্তা-ভাবনা অস্বাভাবিক নয়। যেহেতু শিরীন শারমিন চৌধুরী একজন উচ্চশিক্ষিত, সৎ, নির্ভীক মানুষ হিসেবে জনপ্রিয়তা রয়েছে, তাই তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এলে ভঙ্গুর আওয়ামী লীগ আবার ঘুরে দাঁড়াবে এটি বলা যেতে পারে।
সবাই অবশ্য একইভাবে ভাবছেন না। অনেক নেতাকর্মীর মতে, তাদের দলের মূল শক্তি তার ঐক্য ও সুসংগঠিত কাঠামো। নানা প্রতিকূলতা ও সংকটের মধ্যেও দলটি তার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে এগিয়ে চলেছে। তাদের প্রশ্ন : যেহেতু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, ফলে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে কথা উঠবেই বা কেন? আর দল থেকে কেউ পদত্যাগ যেহেতু করেনি, সেহেতু কেন নতুন নেতৃত্বের কথা আসছে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তারা। তাদের মতে, শিরীন শারমিন চৌধুরী একজন স্বচ্ছ
রাজনীতিবিদ, তাই তাকে আদালত জামিন দিয়েছেন। আমাদের অন্য যেসব নেতার বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে, তার একটি মামলাও ঠিকবে না। কারণ কোনো মামলারই সত্যতা নেই। এগুলো ড. ইউনূসের প্রতিহিংসার মামলা।
গত ১২ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান শিরীন শারমিন। এর আগে জুলাই আন্দোলনের সময় আশরাফুল হত্যাচেষ্টা মামলায় শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গত ৭ এপ্রিল কারাগারে পাঠানো হয়। গ্রেফতারের ৫ দিনের মাথায় তিনি জামিনে মুক্তি পান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দৃশ্যপটে ছিলেন না শিরীন শারমিন। গত ৭ এপ্রিল ভোরে ধানমন্ডির ৮/এ রোডের বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। ওইদিন পুলিশের পক্ষ থেকে তার ২ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। শিরীন শারমিনের পক্ষে জামিনের আবেদন করেছিলেন তার আইনজীবী। আদালত আবেদন দুটি নাকচ করে আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পরদিনই সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ ভেঙে দেওয়া হলেও স্পিকারের পদ তাৎক্ষণিক শূন্য হয় না। পরবর্তী স্পিকারের শপথ পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে থেকে যান। তবে সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা না করে ২৭ দিনের মাথায় ওই বছরের ২ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেন শিরীন শারমিন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি। তবে ওই নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পর অনেকটা আশার আলো দেখছে দলটি। নির্বাচনি ফল ঘোষণার পর থেকে দেশের অনেক জেলা ও উপজেলায় দলীয় কার্যালয় খুলে জয় বাংলা সেøাগান দেন নেতাকর্মীরা। কিন্তু রাজপথে কোনো ঝটিকা মিছিল করা বা কোনো কর্মসূচি দেয়নি দলটি। দলীয় সূত্র বলছে, তাদের আশা সময়ানুযায়ী, আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যক্রমের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা তুলে নেবে সরকার। নেতাকর্মীদের একাংশ বলছেন, সমঝোতার ভিত্তিতে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আসতে পারে আওয়ামী লীগ। ওই নেতৃত্বে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী এলে দলটি নতুনভাবে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাবের আহমেদ চৌধুরী বলেন, শিরীন শারমিন চৌধুরীর জামিন এটি সম্পূর্ণ আইনগত বিষয়। তিনি একজন ক্লিন ইমেজের মানুষ। তার রাজনৈতিক জীবনটার পুরোটাই ক্লিন ইমেজের। তার পারিবারিক একটা ঐতিহ্য রয়েছে। তিনি নিজ বাসা থেকেই গ্রেফতার হয়েছিলেন। হয়তো আদালত চুলচেরা বিশ্লেষণ করেই তাকে জামিন দিয়েছেন। যেহেতু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, তাই এ মুহূর্তে তিনি দলটির দায়িত্ব নেবেন কি নেবেন না, সেটি সময় বলে দেবে। এমনকি তাকে প্রকাশ্যেও দেখা যায়নি। আবার অনেক সময় আদালত জামিন দিলেও কিছু শর্ত দেন। ফলে সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
আওয়ামী লীগের এক সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর জামিন হবে, এটাই স্বাভাবিক। তার বিরুদ্ধে যে মামলা দেওয়া হয়েছে, এটি কোনো মামলা নয়। এটি ছিল হয়রানির একটি অংশ। তার পুরো রাজনৈতিক জীবনটা ক্লিন ইমেজের। আর তাকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে নিয়ে আসবে, এমন কোনো আলোচনা আমাদের দলীয় ফোরামে নেই। আর তাকে কেনই বা এ মুহূর্তে নেতৃত্বে আনা হবে। আমাদের দলের সভাপতি শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সবাই যার যার অবস্থানে রয়েছেন। তারা তো কেউ পদত্যাগ করেননি।