সংগৃহীত ছবিদেশের ব্যাংক খাত ২০২৬ সালের শুরুতেই এক জটিল ও বৈপরীত্যপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। ব্যাংকগুলোর হাতে রেকর্ড পরিমাণ অতিরিক্ত তারল্য থাকলেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। বুধবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘ব্যাংকিং খাতের সমন্বয় : ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২১ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা। লিকুইডিটি কভারেজ রেশিও ১৮৫.৩১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তার প্রায় দ্বিগুণ। তবে এই তারল্য বাস্তব অর্থনীতিতে প্রবাহিত না হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। তাসকীন আহমেদ বলেন, অতিরিক্ত তারল্য থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬.০৩ শতাংশে নেমেছে, যা আগের বছরের তুলনায় কম। ব্যাংকগুলো ঝুঁকি এড়াতে ব্যবসায়িক ঋণের বদলে নিরাপদ ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগে ঝুঁকছে, যেখানে তুলনামূলকভাবে নিশ্চিত মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি জানান, সরকারের ব্যাংক ঋণ গ্রহণ ৬৭৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাত ঋণবঞ্চিত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা একে ‘ক্রেডিট ক্রাউডিং আউট’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ খেলাপি ঋণ। সামগ্রিকভাবে খেলাপি ঋণের হার ৩১.২ শতাংশে পৌঁছেছে। বড় করপোরেট ঋণের ক্ষেত্রে এ হার এক বছরে ৩০.৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪১.৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে ব্যাংকগুলোর মূলধন সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্যাপিটাল টু রিস্ক ওয়েটেড অ্যাসেট রেশিও (ঈজঅজ) কমে ৪.৭৩ শতাংশে নেমেছে, যেখানে ন্যূনতম প্রয়োজন ১২.৫ শতাংশ। প্রায় ২০টি ব্যাংক বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে।
তিনি বলেন, ঋণ সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে শিল্প ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তা খাতে। শিল্প খাতে ঋণ পুনরুদ্ধার প্রায় ৫০.৫ শতাংশ কমে গেছে। ফলে উদ্যোক্তারা আগের ঋণ শোধ করতে পারছেন না এবং নতুন বিনিয়োগেও পিছিয়ে যাচ্ছেন। শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৭.৬৭ শতাংশ থেকে কমে ২.১৭ শতাংশে নেমেছে। ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৫.৪৩ শতাংশ- অর্থাৎ প্রতি তিনজন উদ্যোক্তার মধ্যে একজন ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ‘সিক্স-প্যাক সুপারভিশন’ চালু করেছে। পাশাপাশি জুন ২০২৬-এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশ এবং বেসরকারি ব্যাংকের ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করার আহ্বান করেন তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সিএমএসএমই খাতের উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন, তাই এ খাতের সামগ্রিক অগ্রগতির জন্য ঢাকা চেম্বার এবং সরকার একযোগে কাজ করতে পারে। তিনি একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কাঠমো তৈরির ওপর জোরারোপ করেন। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ব্যাংক কোম্পানি আইনসহ আর্থিক খাতের অন্যান্য আইনের সংস্কার কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, শ্রমঘন শিল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব, সেগুলোর উন্নয়নে বর্তমান সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এ ছাড়া ইতিমধ্যে বন্ধ হওয়া শিল্প-কারখানাগুলো চালুর পাশাপাশি অন্যান্য শিল্প খাতে উৎপাদন বাড়ানো এবং নারী উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে সরকারের পক্ষে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলে তিনি অভিহত করেন।
এই অর্থনীতিবিদ জানান, বর্তমান সরকার যেহেতু বিপুল জনরায় নিয়ে সরকার পরিচালনায় এসেছে, তাই বৈশ্বিক সংকটের অভিঘাতের কারণে দেশে মানুষের জীবনযাত্রায় যেন কষ্ট লাঘব হয়, সেই বিষয়টিকে বেশি হারে প্রাধান্য দিচ্ছে, যার কারণে জ্বালানি তেলের মূল্য এখনও বৃদ্ধি করা হয়নি।
তিনি বলেন, দেশের আর্থিক খাতের দুরাবস্থার বিষয়ে আমরা সবাই অবগত রয়েছি, তবে এ অবস্থা উত্তরণে সরকার প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়ন ও সংস্কারসহ অন্যান্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ঋণ ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট ও পুঁজিবাজারের কোনো বিকল্প নেই।
এতে আরও বক্তব্য রাখনে ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্ট) নওশাদ মোস্তফা, এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামসুল আরেফিন, ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর জাহিদুল ইসলাম প্রমুখ।
সময়ের আলো/আআ