সরকারকে ফের বৃদ্ধাঙ্গুলি ভোজ্য তেল সিন্ডিকেটের

আদিল সরকার

জাতীয়

একদিকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমঝোতা করে বাজার নিয়ন্ত্রণে মন্ত্রীর বক্তব্য অন্যদিকে র‌্যাব দিয়ে মনিটরিং করে তেলের অবৈধ মজুদ উদ্ধার— সবকিছু করেও

2026-04-17T04:42:02+00:00
2026-04-17T04:42:02+00:00
 
  সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬,
১ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
জাতীয়
সরকারকে ফের বৃদ্ধাঙ্গুলি ভোজ্য তেল সিন্ডিকেটের
আদিল সরকার
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:৪২ এএম   (ভিজিট : ৬০)
ছবি : সময়ের আলো
একদিকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমঝোতা করে বাজার নিয়ন্ত্রণে মন্ত্রীর বক্তব্য অন্যদিকে র‌্যাব দিয়ে মনিটরিং করে তেলের অবৈধ মজুদ উদ্ধার— সবকিছু করেও যেন ফলের খাতা এখনও শূন্য। বাজারে এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক হয়নি সয়াবিন তেলের সরবরাহ। কোথাও আছে, কোথাও নেই, কোথাও বা তেলের কথা জিগ্যেস করলে পাল্টা প্রশ্ন— সঙ্গে কি নেবেন? 

তবে বাজারের এমন অবস্থায় ক্রেতার সঙ্গে জিম্মি যেন খুচরা বিক্রেতারাও। তাদেরও কোম্পানিকে দেওয়া তেলের অর্ডারে মেনে নিতে হচ্ছে নানা শর্ত। তারপরেও অনেক দোকানিই বিক্রির জন্য পাচ্ছেন না ভোজ্য তেল। যা ভোগান্তিতে চরম মাত্রা যোগ করেছে নাগরিকদের।

অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যে প্রতি লিটার তেলে ১০ টাকারও বেশি বাড়িয়েছেন, তবে বাজারে এখনও সে তেল ছাড়া হয়নি। চাপ তৈরি করে কিংবা কোনোভাবে গ্রিন সিগনাল পেলেই বাজারে সে তেল ছাড়া হবে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। সব মিলিয়ে ব্যবসায়ী-কোম্পানিসহ ওপর মহলের শক্ত সিন্ডিকেট যেন বৃদ্ধাঙ্গলি দেখাচ্ছে খোদ সরকারকেই।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মিরপুর ৬ নম্বর কাঁচাবাজার, হাতিরপুল ও ধানমন্ডির বাজারের কোনো দোকানে জিগ্যেস করলেই দোকানি অন্য দিকে তাকিয়ে বলে দিচ্ছেন তেল নেই। 

তবে কেউ কেউ জানতে চান কত লিটার? প্রশ্নের কারণে জানা গেছে তার কাছে হয়তো ৫ লিটারের দুয়েকটি বোতল রয়েছে, কিন্তু এক-দুই লিটারের বোতল নেই, কারও কাছে আছে এক-দুই লিটারের কয়েকটি বোতল কিন্তু নেই পাঁচ লিটারের কোনো বোতল। 

কেউ কেউ তেলের কথা জিগ্যেস করলে পাল্টা প্রশ্ন করছেন আর কী নেবেন? মানে তেলের সঙ্গে অন্য পণ্য যেমন— চাল, আটা ও সরিষার তেলসহ অন্য কিছু নিলে তবেই দোকানি ভেতর থেকে বের করে দেবেন তেল। ঠিক এরকম চিত্রই দেখা যাচ্ছে কয়েক সপ্তাহ ধরে। যার এখনও কোনো সুরাহা মেলেনি।

তবে দামের বিষয়ে খুব একটা হেরফের দেখা যায়নি বোতলজাত তেলে। যেসব দোকানে তেল মিলছে সেখানে বোতলে থাকা খুচরা মূল্যে বা আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। কিংবা বোতলপ্রতি ৫-১০ টাকা সর্বোচ্চ বেশি বিক্রি হচ্ছে। যেখানে বোতলজাত এক লিটার তেল ১৯৫-২০০ টাকা, দুই লিটার ৩৯০-৪০০ আর পাঁচ লিটার ৯৫০ থেকে ৯৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে দামের কিছুটা পার্থক্য তৈরি হয়েছে খোলা তেলে। 

বোতলজাত তেলের সংকটে বেশ বিক্রি বেড়েছে এই খোলা তেল ও পামওয়েল তেলের। বর্তমানে খোলা তেল ২১০ টাকা পর্যন্ত কেজি বিক্রি হচ্ছে, যা আগে বিক্রি হতো ১৯০ টাকায়। তবে কিছু কিছু জায়গায় ২০৫ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া পামওয়েল ১৮০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে, যা লিটারপ্রতি আগের মতোই ১৬৩ টাকা করে পড়ছে। তবে এই পামওয়েল তেলও কোথাও কোথাও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

অন্যদিকে বর্তমান তেলের দামের এই চিত্রের অন্য অংশে রয়েছে ভিন্ন চিত্র। ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যে প্রতি লিটার তেলে ১০-১৩ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে বাজারে এখনও সে তেল ছাড়া হয়নি। ফলে সরবরাহ সংকট এখনও বিদ্যমান। তবে সরকারকে বৈশ্বিক পরিস্থিতির গল্পে চাপ প্রয়োগ করে ম্যানেজ করতে পারলেই সেসব তেল একযোগে দেশের বাজারে ছাড়া হবে বলে জানিয়েছে সূত্র।

অন্যদিকে গত ১২ এপ্রিল ভোজ্য তেল সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ওই বৈঠকে তিনি জানান, জনগণের কথা ভেবে আপাতত ভোজ্য তেলের দাম বাড়ছে না। ভোজ্য তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং বাজারে কোনো ধরনের সংকট বা অস্থিরতা যাতে সৃষ্টি না হয় সে জন্য সরকার দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। 

এ ছাড়া তিনি জানান, সরকার ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ধরনের পণ্য আমদানির জন্য বড় আর্থিক সক্ষমতা প্রয়োজন। কোনো ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বাজার থেকে সরে গেলে, সেটি দেশের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দাম না বাড়িয়ে ব্যবসায়ীদের শুল্কছাড় দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। 


এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে আলোচনা করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে সেই আলোচনা আর বক্তব্যের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি বাজারে। আগের মতোই তেল খুঁজতে ছুটাছুটি করতে হচ্ছে তার পরদিন থেকেই। ফলে সরকারের প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন নাগরিকরা।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কথা বলে বেশ কিছু দিন আগেই একাধিকবার ভোজ্য  তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশন। এ ছাড়া মূল্যবৃদ্ধির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সর্বশেষ লিখিত প্রস্তাব দেয় তারা। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) এ প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে দাম না বাড়ানোর পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়। দাম না বাড়িয়ে কারখানার মালিকদের অন্যভাবে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও একটি সূত্রে জানা যায়।

দোকানিরা জানিয়েছেন, কয়েক দিন ধরেই তারা ডিলারদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না। ফলে শুধু খোলা তেল বিক্রি করতে হচ্ছে। তারা বলছেন, অনেক কোম্পানি নিয়মিত তেল সরবরাহ না করায় বাজারে এই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ডিলারদের কাছে চাহিদা দিয়েও বোতলের তেল পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কোথাও কোথাও সীমিত পরিমাণে সরবরাহ করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। এ ছাড়া অনেক কোম্পানিই তাদের অন্য পণ্য না কিনলে তেল দিচ্ছেন না। 

হাতিরপুল এলাকার মাশাআল্লাহ ডিপার্টমেন্ট স্টোরের খুচরা বিক্রেতা পাভেল হাসান প্রতিবেদককে বলেন, ‘৮-১০ দিন ধরে আমার দোকানে তেল নেই। তেল কিনতে গেলে বা অর্ডার দিতে গেলেই কোম্পানি শর্ত জুড়ে দেয়। তাদের অন্য পণ্য আটা ও চালসহ সঙ্গে কিছু কিনলে তবেই তেল দিতে চায়, তাও আবার সব টাকা নগদ দিতে হবে। তাই সম্ভব না হওয়ায় দোকানেই তেল রাখতে পারছি না। এ ছাড়া অনেক কোম্পানি তেলের অর্ডারও নেয় না। জিগ্যেস করলে মুখের ওপর বলে দেয় তেল নেই। দিনশেষে কাস্টমাররা এসে দোকান থেকে তেল ছাড়াই ঘুরে যায়।’  

মিরপুর ৬ নম্বর কাঁচাবাজারের জনতা স্টোরের দোকানি জানান, ওপর মহল তেল সব ধরে রেখেছে। ইতিমধ্যে প্রতি লিটার তেলে ১৩ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে। শুধু গ্রিন সিগনাল পেলেই তারা সে মজুদ করা তেল বাজারে ছাড়বেন। এ জন্যই এখন বাজারে এই সংকট তৈরি হয়ে আছে। আমরা আর কি করব? তেল না পেলে বিক্রিও করব না। আমরা আর কয় টাকা লাভ করি বোতলে! 


অন্যদিকে বাজারটিতে এসে তেল না পেয়ে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আওয়াল হোসেন নামে এক ক্রেতা জানান, একদিকে মন্ত্রী বলেছে তেলের দাম বাড়বে না এবং বাজারে তেল পাওয়া যাবে, কিন্তু বাস্তবে তেল না পাওয়ার এই চিত্র কি সরকার দেখে না? এই বিষয়ে কি তাদের বাস্তব জ্ঞান নেই? তেলের এই সিন্ডিকেট কি সরকারের চেয়েও বেশি শক্তিশালী কি না আমার বুঝে আসে না। বাজারে এক দোকানে তেল পেলে আবার অন্য দুই দোকানে তেল পাই না। এমন চিত্রের পরিবর্তন চায় সবাই।’ 

তবে কারওয়ান বাজারে বেশ কিছু দোকানেই স্বল্প পরিসরে পাওয়া যাচ্ছে তেল।

অন্যদিকে তেল বিক্রি না করে দেশের অনেক জায়গায় এই ভোজ্য তেল মজুদ করে রাখার ঘটনায় বাজার মনিটরিংয়ের আওতায় ইতিমধ্যে দেশের প্রায় অনেক জায়গায় অভিযান চালিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। 

অভিযানে কয়েক লাখ লিটার তেল জব্দও করা হয়। পরবর্তী সময়ে নিয়ম অনুযায়ী জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। এত কিছুর পরেও বাজার নিয়ন্ত্রণে না আসায় ক্ষোভের সঙ্গে হতাশারও যেন কমতি নেই ক্রেতাদের।

এফআর


  বিষয়:   সরকার  ফের  বৃদ্ধাঙ্গুলি  ভোজ্য তেল  সিন্ডিকেট 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: