অষ্টম জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের সাবেক এমপি ও মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ বিএনপির অঙ্গসংগঠনে পরিচিত মুখ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে আবারও প্রতিনিধিত্ব করতে চান আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় এই নেত্রী। দলের মনোনয়ন পেতে তিনি গতকাল মনোনয়ন বোর্ডের মুখোমুখি হন। সেখানে অনেক প্রার্থীকে চিনতেই পারেননি এই নেত্রী।
মনোনয়ন বোর্ডের সামনে অনেকে পরিচয় দিয়েছেন সাবেক সচিব বা আমলার স্ত্রী হিসেবে। আবার ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবীও ছিলেন। কমবেশি সবাই নিজেকেনের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। এভাবে প্রায় ৯০০ নারী এবার সংরক্ষিত আসনে সংসদে যেতে চান। অথচ বিএনপির জন্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ৩৬টি আসন। আগ্রহীদের সিংহভাগই প্রভাবশালী নেতা-সমর্থকদের পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের পরিচয়ে নিজেদের উপস্থাপন করেছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে কারা মনোনয়ন পাবেন, সেই বাছাই প্রক্রিয়া শেষ করেছে বিএনপি। আগ্রহীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুক্রবার এই প্রক্রিয়া শুরু হয়। ঢাকার গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সাক্ষাৎকারে প্রথম দিন রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও ফরিদপুর সাংগঠনিক বিভাগের চার শতাধিক প্রার্থীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
শনিবার বেলা ৩টা থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ বিভাগের প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার শুরু হয়। দুদিনে প্রায় ৯০০ জনের সাক্ষাৎকার নেয় মনোনয়ন বোর্ড। হিসাব অনুযায়ী একটি আসনের জন্য প্রায় ২৫ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
গুলশানের কার্যালয়ের সামনে দুদিন ধরেই নারী আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ও তাদের সমর্থকদের ভিড় দেখা যায়। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মনোনয়ন বোর্ড গঠিত হয় এবং এতে স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
খেদ প্রকাশ করে সুলতানা আহমেদ বলেন, আমি মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক, অথচ বেশিরভাগ প্রার্থীকে চিনি না। অনেকে এসে বলেন ‘সুলতানা আপা, আপনার সঙ্গে বিশ বছর পর দেখা হলো’। তারা নিজেদের পরিচয় দেন- কেউ সচিবের স্ত্রী, কেউ কোনো নেতার আত্মীয়।
তিনি বলেন, আমার মনে হচ্ছে ওয়ার্ড পর্যায় থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন সবাই সংসদে যেতে চাইছেন। তারা নিজেদের জুলাই যোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন, অথচ মাঠে তাদের দেখা যায়নি। কয়েকজন প্রার্থী মহিলা দলের পরিচয় দিচ্ছেন, অথচ আমাকে চেনেন না।
সাক্ষাৎকার শেষে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাবেক সদস্য অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা বলেন, নাম ও পরিচয়ের বাইরে কিছু বলার সুযোগ হয়নি। এত মানুষের সাক্ষাৎকার নেওয়া সময়সাপেক্ষ। সবার সিভি বোর্ডের কাছে আছে। আশা করি ত্যাগী ও রাজপথের কর্মীদের মূল্যায়ন করা হবে। অনেকেই এখন মৌসুমি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন আমরা সবাইকে চিনি। আপনাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত আছি। যোগ্যতা অনুযায়ী মূল্যায়ন করা হবে। আমরা সবাইকে মনোনয়ন দিতে পারব না, মাত্র ৩৬টি আসন। যাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, তাকে সবাই মেনে নিতে হবে।
সাবেক কাউন্সিলর ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি বলেন, আমরা এক মিনিট করে রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। বাকি তথ্য সিভিতে রয়েছে। আশা করি ত্যাগী ও নির্যাতিত কর্মীদের মূল্যায়ন করা হবে।
জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় নেতা আসমা আজিজ বলেন, সাক্ষাৎকারে শুধু নাম-পরিচয় দিয়েছি। আমার নিজের জেলার তিনজন মনোনয়নপ্রত্যাশীকেও আমি চিনি না।
কেন্দ্রীয় নেত্রী নিলুফা ইয়াসমিন নিলু বলেন, নাম ও রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে কিছু বলার সুযোগ হয়নি। প্রার্থী বেশি, সময় কম। তবে বোর্ডের একাধিক সিনিয়র নেতা আমাকে রাজপথের ফাইটার হিসেবে উল্লেখ করেছেন, এটাই বড় প্রাপ্তি।
এবার সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন দৌড়ে বেবী নাজনীন, কনকচাঁপা, দিলরুবা খান, রিজিয়া পারভীন, দিঠি আনোয়ার, রিনা খানসহ সংস্কৃতি অঙ্গনের কয়েকজন তারকাও অংশ নিয়েছেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ছোটপর্দার অভিনেত্রী রুকাইয়া জাহান চমক। কুষ্টিয়া থেকে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে সাক্ষাৎকার দেন তিনি।
সাক্ষাৎকার শেষে চমক বলেন, মনোনয়ন বোর্ড তার ব্যক্তিগত নম্বর রেখেছে। তিনি বিএনপি তথা দেশের জন্য কাজ করতে চান।
সাংস্কৃতিক কর্মী ও সমাজসেবী ফারজানা বুবলি বলেন, আমরা এক মিনিট করে নাম ও পরিচয় দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। আমি জানিয়েছি জুলাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে মাঠে ছিলাম এবং জনগণের জন্য কাজ করতে চাই।
নারী আসনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, গত ১৫-১৬ বছরের আন্দোলনে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নারীদের অবদান অবশ্যই মূল্যায়ন করা হবে। পাশাপাশি সংসদে কথা বলা ও আইন প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও শিক্ষাও বিবেচনায় নেওয়া হবে। সবকিছু বিবেচনা করেই মনোনয়ন বোর্ড চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী নারী আসনের মনোনয়ন দাখিল শেষ হবে ২১ এপ্রিল। বাছাই অনুষ্ঠিত হবে ২২ ও ২৩ এপ্রিল। বাছাই নিয়ে আপিল করা যাবে ২৬ এপ্রিল, নিষ্পত্তি হবে ২৭ ও ২৮ এপ্রিল। চূড়ান্ত প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে ৩০ এপ্রিল এবং ভোটগ্রহণ হবে ১২ মে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আসন বণ্টনে বিএনপি জোট পাবে ৩৬টি, জামায়াতে ইসলামী জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্ররা পাবে একটি আসন।
সময়ের আলো/আআ