ফারজানা বুবলী একজন সাংস্কৃতিক কর্মী, মডেল এবং সমাজসেবী। তিনি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে তিনি বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। এবার তিনি সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী। জানা গেছে, সংরক্ষিত আসনে বিএনপির শর্টলিস্টেও তিনি এগিয়ে রয়েছেন।
তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাকির উসমান
সংরক্ষিত নারী আসন—এটা কি নারীর ক্ষমতায়ন, নাকি ‘সেফ জোন’ রাজনীতি? আপনি কোনভাবে দেখেন?
আমার মতে রাজনীতিতে আসা কোনোভাবেই ‘সেফ জোন’ হতে পারে না। সেটা সংরক্ষিত আসন হোক বা না হোক। রাজনীতি মানেই হচ্ছে নিজেকে এমন একটি জায়গা দাঁড়িয়ে দেশের জন্য এবং দেশের মানুষের জন্য চিন্তা করা যেখানে নানাভাবে কোনো না কোনো বিপদের সম্মুখীন হবেন।
আমি দেখিয়ে দিতে চাই, সংরক্ষিত নারী আসন শোকেসে রাখার মতো কোনো ট্রফি না। আমি এটা প্রমাণ করতে চাই এবং এখান থেকে নির্বাচিত হয়ে দেশের মানুষের জন্য কাজ করে নিজের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে চাই।
আপনার সমালোচকরা যদি বলেন, ‘সংরক্ষিত আসন মানেই শর্টকাট’—আপনার জবাব কী হবে?
সমালোচকরা সমালোচনা করবে এটাই তাদের কাজ। তাদের সমালোচনা থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। আমি সবসময় শতভাগ সঠিক নই, সুতরাং যেখানে আমার ভুল থাকবে, আমি সেখান থেকেই শিখব।
এটা কোনো শর্টকাট প্রসেস নয়। বিগত দিনগুলোতে আমরা যেভাবে দেখেছি নারী আসনের এমপিদেরকে বাছাই করা হয়েছে, এবার কিন্তু প্রক্রিয়াটা পুরোপুরি ভিন্ন হয়েছে। এবার কিন্তু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রথমে সবার জন্য উন্মুক্ত করেছে এবং তারা যাচাই-বাছাই করেছে কারো লোন আছে কি না। যাচাই বাছাই করে ইন্টারভিউ নিয়েছে। তাই আমার কাছে মনে হয় না এটা কোনো শর্টকাট প্রসেস।
রাজনীতিতে আসার আগে আপনি ছিলেন সংস্কৃতিকর্মী ও মডেল—এই পরিচয়গুলো আপনাকে শক্তিশালী করেছে, নাকি কখনো আপনার জন্য বাধা হয়েছে?
আমি একজন সংস্কৃতিকর্মী ও মডেল ছিলাম, এ কারণেই আমার চেনা জানার পরিধি অনেক বেশি এবং সেখান থেকেই আমি অনেক কিছু শিখেছি। আমি চাই রাজনীতিতে এই জায়গাটা আরও বড় হোক, সর্বস্তরের মানুষ যাতে এখানে এসে যুক্ত হতে পারে। দেশের জন্য জনগণের জন্য কাজ করতে পারে। আমারও এ প্রচেষ্টা থাকবে।
আবার অন্যদিকে রাজনীতিতে বলেন বা সামাজিকভাবেই বলেন, মিডিয়া থেকে আসা মানুষদেরকে অন্য চোখে বা অবহেলার চোখে দেখা হয়। সেটা একটা বাধার জায়গা। কিন্তু আমি এই জায়গায় উদাহরণ হয়ে থাকতে চাই। কোনো বাধাই বাধা নয়, আপনার যদি দৃঢ় চেষ্টা থাকে এবং আপনার লক্ষ্য যদি ঠিক থাকে, তাহলে আপনি আপনার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন।
২০২৪ সালের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা—সংসদে গেলে সেই ‘রাস্তায় শেখা রাজনীতি’ কতটা কাজে লাগবে?
২০২৪ সালের অভিজ্ঞতা আমার সবদিক থেকেই আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। কারণ আমি রাস্তায় নেমেছি, আমরা জানি এক একটা কাজের একেক রকমের চরিত্র থাকে। রাজনীতি করতে গেলে আপনাকে এভাবে সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে মিশতে হবে। সারাদেশের মানুষ সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে।
আমার সব সময় অবস্থান ন্যায়ের পথেই ছিল। ২০২৪ সালের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা আমাকে আরও শক্তিশালী করেছে। আমি সেখান থেকেই আত্মবিশ্বাস এবং বিশ্বাস পেয়েছি। এর কারণেই আমি সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য প্রস্তুত হয়েছি এবং আমি মনে করি, এটাকে আমি কাজে লাগাতে পারব।
সংরক্ষিত আসনে গেলে আপনার ‘signature issue’ কী হবে?
আমি নারী এবং শিশুদের নিয়ে কাজ করতে চাই। স্পেশালি আমি নারীদের সাইবার বুলিং নিয়ে কাজ করতে চাই। আমার সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য থাকবে নারী এবং শিশুদের মেন্টাল হেলথ নিয়ে কাজ করা, কারণ আমি দীর্ঘদিন ডিপ্রেশনে ভুগেছি। ফলে আমি জানি নারীদের মেন্টালি সুস্থ থাকাটা কত জরুরি।
আমার কাছে মনে হয় একজন নারী সুস্থ মানে একটা জাতি সুস্থ। একজন নারী যদি শারীরিকভাবে সুস্থ না থাকে, মানসিকভাবে সুস্থ না থাকে, তাহলে সে কোনো সুস্থ জাতি উপহার দিতে পারবে না। তাই নারী এবং শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য আমি সর্বক্ষেত্রে কাজ করতে চাই। এটা হোক দেশে এবং দেশের বাইরে।
নারী আসনে অনেক সময় ‘নীরব ভূমিকা’ দেখা যায়—আপনি কি ‘লাউড’ এমপি হবেন নাকি কৌশলী?
আমি দুটোই আসলে করতে চাই। যেখানে কৌশল অবলম্বন করতে হবে সেখানে আমি কৌশল অবলম্বন করব। যেখানে আমার ভোকালি স্ট্যান্ড নিতে হবে আমি সেখানে ভোকালি স্ট্যান্ড নেব।
দলের ভিতরে প্রতিযোগিতা তো আছেই—মনোনয়ন পাওয়ার লড়াইয়ে আপনার সবচেয়ে বড় অ্যাডভান্টেজ কী?
অবশ্যই দলের ভিতরে প্রতিযোগিতা আছে। সেখানে তো বছর পর বছর ধরে বিএনপির জন্য রাজপথে ভূমিকা রেখেছেন যারা, তারাও আছেন। আমাদের মতো আছেন, যারা জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। তো আমি কারও অবদানই অস্বীকার করছি না এবং কাউকে ছোট করে দেখছি না।
আমার কাছে মনে হয় আমার অবদান অনেক, কারণ ২৪-এ যখন এত বড় একটা গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, তখন আমি আমার ছোট ছোট দুটো বাচ্চাকে রেখে রাস্তায় নেমেছি, পুলিশের ভয় করিনি। মিছিলের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছি। এ জায়গা থেকে আমার অবদানটা আমার কাছে অনেক বড় কিন্তু অন্যরাও নেতৃত্ব দিয়েছে, অবদান রেখেছে। তাই দলে প্রতিযোগিতা আছে।
যদি মনোনয়ন না পান, তাহলে কি রাজনীতি চালিয়ে যাবেন, নাকি এটা শুধু একটি সুযোগের চেষ্টা ছিল?
এখানে মনোনয়ন পাওয়া বা না পাওয়ার কিছু নেই। আমি রাজনীতিতে এসেছি মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য। ছোটবেলা থেকেই আমার পুলিশ অফিসার হওয়ার অনেক ইচ্ছা ছিল। আমার ভেতরে একটাই ইচ্ছা, মানুষের জন্য কিছু করার। আমি মানুষের জন্য কাজ করতে ভালোবাসি। আগে থেকেই আমার মধ্যে মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছাটা ছিল। কিন্তু রাজনীতিতে যে আসব এটা কখনোই ছিল না, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে আমার এখানে আসা।
যেহেতু আমি রাজনীতিতে এসেছি এবং এখান থেকে যদি আমি মনোনয়ন না পাই, তার মানে এই না যে আমি প্রচেষ্টা বন্ধ করে দেব। একটা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম পেলে, কাজের চিন্তাধারা বাড়বে এবং সর্বস্তরে কাজ করার সুযোগ পাব।
আমি সবসময় আমার জায়গা থেকে কাজ চালিয়ে যাব; মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য ইনশাআল্লাহ।