বড় ভাষা মডেলগুলো (এলএলএম) যখন ক্রমশ আমাদের চিন্তাগত কাজগুলো নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে, তখন গবেষকরা সতর্ক করছেন এই মানসিক ‘আউটসোর্সিং’-এর একটা মূল্য আছে। গবেষক ও বিজ্ঞানী নাটালিয়া কোসমিনা যখন ইন্টার্ন খুঁজছিলেন, তিনি লক্ষ করলেন আবেদনকারীদের কভার লেটারগুলো অদ্ভুতভাবে একরকম। লেখাগুলো ছিল দীর্ঘ, পরিপাটি আর পরিচয়ের পর হঠাৎই তার কাজের সঙ্গে এক ধরনের বিমূর্ত ও কৃত্রিম সংযোগ টেনে আনা হয়েছে।
তার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, আবেদনকারীরা চ্যাটজিপিটি, জেমিনি কিংবা ক্লডির মতো এআইচালিত চ্যাটবট ব্যবহার করে এসব লিখছে। একই সময় ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) ক্যাম্পাসে ক্লাস নিতে গিয়ে মানুষ ও কম্পিউটারের পারস্পরিক ক্রিয়া নিয়ে কাজ করা গবেষক কোসমিনা দেখলেন, অনেক শিক্ষার্থী আগের তুলনায় সহজেই কনটেন্ট ভুলে যাচ্ছে। বিবিসি।
এলএলএমের ওপর বাড়তি নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তিকে প্রভাবিত করছে এই ধারণা থেকে তিনি বিষয়টি গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করলেন। কোসমিনার মতো গবেষকদের উদ্বেগ হলো, আমরা যদি এআইর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ি, তা হলে তা আমাদের ভাষা ব্যবহারের ধরন, এমনকি মৌলিক চিন্তার কাজগুলো করার ক্ষমতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। ইতিমধ্যেই একের পর এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এআইতে এই ‘কগনিটিভ অফলোডিং’ তথা চিন্তার কাজ এআইর হাতে তুলে দেওয়া হলে তা আমাদের মানসিক সক্ষমতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এর পরিণতি উদ্বেগজনক, এমনকি জ্ঞানীয় পতন (কগনিটিভ ডিক্লাইন) পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে।
কমে যাচ্ছে মস্তিষ্কের সক্রিয়তা : আমরা যে সরঞ্জাম ব্যবহার করি, তা আমাদের চিন্তার ধরন বদলে দেয় এটা নতুন কিছু নয়। যেমন ইন্টারনেট আসার পর আগে যেসব কাজে গভীর গবেষণা দরকার হতো, এখন সেগুলো সার্চ বক্সে একটি প্রশ্ন লিখেই পাওয়া যায়। এর ফলে আমরা তথ্য মনে রাখার প্রবণতা কমিয়ে ফেলেছি যাকে বলা হয় ‘গুগল ইফেক্ট’। যদিও কেউ কেউ বলেন, ইন্টারনেট বাহ্যিক স্মৃতিশক্তি হিসেবে কাজ করে, যাতে মস্তিষ্ক অন্য কাজের জন্য সচল থাকে। কিন্তু এখন আশঙ্কা আরও বড়। কারণ আমরা শুধু তথ্য খোঁজা নয়, চিন্তাভাবনার বড় অংশই এআইর হাতে তুলে দিচ্ছি। এআই এখন কবিতা লিখতে পারে, আর্থিক পরামর্শ দিতে পারে, এমনকি সঙ্গও দিতে পারে। শিক্ষার্থীরাও ক্রমেই নিজেদের কাজ এআই দিয়ে করিয়ে নিচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণরা এআই ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাবের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে সমালোচনামূলক চিন্তার মতো দক্ষতার ওপর। তাই কোসমিনা আরও গভীরে যেতে চাইলেন। তাই এমআইটি মিডিয়া ল্যাবে তিনি ও তার সহকর্মীরা ৫৪ জন শিক্ষার্থীকে ছোট ছোট রচনা লিখতে বলেন। তাদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়। একটি দল চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করতে পারে। দ্বিতীয় দল গুগল সার্চ ব্যবহার করতে পারে; কিন্তু এআই-উৎপন্ন সারাংশ বন্ধ রাখা হয়। তৃতীয় দল কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে না। কাজ করার সময় প্রতিটি শিক্ষার্থীর মস্তিষ্কের তরঙ্গ পরিমাপ করা হয়।
রচনার বিষয় ছিল ইচ্ছাকৃতভাবে উন্মুক্ত, অর্থাৎ খুব বেশি গবেষণার প্রয়োজন ছিল না। যেমনÑ আনুগত্য, সুখ বা দৈনন্দিন জীবনের পছন্দ নিয়ে প্রশ্ন। ফলাফল এখনও কোনো বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত হয়নি, তবে কোসমিনার মতে তা ছিল ‘চোখ খুলে দেওয়ার মতো’। যারা নিজের মস্তিষ্ক ব্যবহার করেছিল, তাদের মস্তিষ্ক ছিল ব্যাপক সক্রিয় যেন জ¦লন্ত কোনো চুল্লি। বিভিন্ন অংশে ব্যাপক সক্রিয়তা দেখা গেছে। যারা কেবল সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করেছিল, তাদের মস্তিষ্কের ভিজুয়াল অংশে শক্তিশালী সক্রিয়তা ছিল। কিন্তু চ্যাটজিপিটি গ্রুপে মস্তিষ্কের সক্রিয়তা লক্ষণীয়ভাবে কম ছিল; প্রায় ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছিল। কোসমিনা বলেন, মস্তিষ্ক ঘুমিয়ে পড়েনি, কিন্তু সৃজনশীলতা ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণের অংশগুলোতে সক্রিয়তা অনেক কমে গিয়েছিল।
চ্যাটজিপিটি মানুষের স্মৃতিশক্তিতেও প্রভাব ফেলেছিল। রচনা জমা দেওয়ার পর এআই গ্রুপের লোকেরা নিজেদের রচনার অংশ উদ্ধৃত করতে পারেনি। অনেকে মনে করেছিল, কাজটি তাদের নিজস্ব নয়। অন্যান্য গবেষণায়ও দেখা গেছে, চ্যাটজিপিটির মতো এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করলে তথ্য ধরে রাখার ও স্মরণ করার ক্ষমতা কমে যায়।
যদিও ফলাফলগুলো এখন পিয়ার রিভিউর অধীনে, তবে এগুলো আগের অন্যান্য গবেষণার সঙ্গে মিলে যায়।
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জেনারেটিভ এআই চ্যাটবট ব্যবহার করলে কিছু মানুষ ‘কগনিটিভ স্যারেন্ডার’ (চিন্তার আত্মসমর্পণ) অবস্থায় চলে যায়। অর্থাৎ তারা এআই যা বলে, খুব কম যাচাই করে তা মেনে নেয়, এমনকি নিজের স্বভাববোধকেও এআইর ওপর চাপিয়ে দেয়।
একই ধরনের প্রভাব এআই চ্যাটবটের বাইরেও দেখা যায়। এমনকি জীবনমৃত্যুর পরিস্থিতিতেও। একটি বহুজাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসকরা তিন মাস ধরে কোলন ক্যানসার শনাক্ত করতে একটি এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করার পর, সরঞ্জামটি ছাড়াই তারা টিউমার শনাক্ত করতে আগের চেয়ে বেশি অক্ষম হয়ে পড়েন। কোসমিনা সতর্ক করে বলেন, এধাইতে কাজ আউটসোর্স করলে মূল কাজ তৈরির সৃজনশীলতা হারানোর ঝুঁকিও থাকে।
তার গবেষণায় শিক্ষার্থীরা চ্যাটজিপিটি দিয়ে যেসব রচনা লিখেছিল, সেগুলো দেখতে অনেকটা একই রকম ছিল। শিক্ষকরা সেগুলোকে ‘আত্মাহীন’, মৌলিকত্ব ও গভীরতাহীন বলে বর্ণনা করেছেন। কোসমিনা বলেন, একজন শিক্ষক জিজ্ঞাসা করেছিলেন, শিক্ষার্থীরা কি পাশাপাশি বসে লিখেছে? কারণ রচনাগুলোতে এতই মিল ছিল।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বা জ্ঞানীয় পতন : এই ধরনের গবেষণাগুলো এলএলএমের স্বল্পমেয়াদি প্রভাব দেখালেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অনেকটাই অস্পষ্ট। কোসমিনা ও তার সহকর্মীদের গবেষণা একটি আভাস দেয়। প্রথম গবেষণার চার মাস পর তারা শিক্ষার্থীদের আরেকটি রচনা লিখতে বলেন। কিন্তু এবার যারা আগে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেছিল, তাদের এলএলএম ছাড়াই লিখতে বলা হয়। তাদের মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগ কম ছিল যা ইঙ্গিত দেয় যে তারা প্রথমবার বিষয়গুলো ঠিকমতো আত্মস্থ করেনি।
কম্পিউটেশনাল নিউরোসায়েন্টিস্ট ও ‘রোবট প্রুফ’ বইয়ের লেখক ভিভিয়েন মিং বলেন, এলএলএম চিন্তায় সাহায্যকারী ইতিবাচক সরঞ্জাম হতে পারে, তবে শর্ত একটাই। তা হলো আমরা যদি মানসিক কাজ আউটসোর্স করে তাদের ওপর নির্ভরশীল না হই তবেই তা ইতিবাচক। কিন্তু তিনি উদ্বিগ্ন, অধিকাংশ মানুষ এই প্রযুক্তির সঙ্গে ঠিক এভাবে মিথস্ক্রিয়া করে না। তার যুক্তি এসেছে বইটির জন্য করা গবেষণা থেকে। সেখানে তিনি বার্কলি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল শিক্ষার্থীকে বাস্তব জগতের ফলাফল ভবিষ্যদ্বাণী করতে বলেন; যেমন তেলের দাম। তিনি দেখেন, বেশিরভাগ অংশগ্রহণকারী কেবল এআইকে জিজ্ঞাসা করে উত্তর কপি করেছে।
তিনি তাদের মস্তিষ্কের গামা ওয়েভ অ্যাক্টিভিটি পরিমাপ করেন, যা মানসিক পরিশ্রমের সূচক। দেখা গেছে, সক্রিয়তা খুব কম। তার গবেষণাও এখনও প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু মিং উদ্বিগ্ন, যদি তার ফলাফল পরবর্তী গবেষণায় নিশ্চিত হয়, তবে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব গুরুতর হতে পারে। যেমন অন্য একটি গবেষণায় দুর্বল গামা ওয়েভ অ্যাক্টিভিটির সঙ্গে পরবর্তী জীবনে জ্ঞানীয় পতনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
মিং বলেন, এটি সত্যিই উদ্বেগজনক। যদি মানুষের জন্য এই সিস্টেমের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার স্বাভাবিক পদ্ধতি হয় এমন যে, এরা স্মার্ট শিশু; তা হলে এটা খুবই খারাপ। তিনি বলেন, গভীর চিন্তাই হলো আমাদের মহাশক্তি। আমরা যদি এটি ব্যবহার না করি, তা হলে জ্ঞানীয় স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব খুব শক্তিশালী।
কারণ এলএলএমের ওপর নির্ভর করতে খুব কম জ্ঞানীয় প্রচেষ্টা লাগে; অথচ সুস্থ মস্তিষ্কের জন্য ঠিক এই প্রচেষ্টাটাই প্রয়োজন। তবে ছোট একটা অংশ যা ১০ শতাংশেরও কম, তারা অন্যরকম কাজ করেছিল। তারা এআইকে কেবল তথ্য সংগ্রহের সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার করে, পরে তা নিজেরা বিশ্লেষণ করে। এই ব্যক্তিরা অন্যদের চেয়ে বেশি সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করতে পেরেছিল এবং তাদের মস্তিষ্কের সক্রিয়তাও বেশি ছিল।
জিপিএসের উদাহরণ আর ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি : প্রায় দুই দশক আগে মিং ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, ২০-৩০ বছরের মধ্যে আমরা গুগল ম্যাপের অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে ডিমেনশিয়ার হারে একটি পরিসংখ্যানগতভাবে অর্থপূর্ণ বৃদ্ধি দেখব। মিং বলেন, যদি নেভিগেট করার জন্য না ভাবতে হয়, তা হলে কিছু শনাক্তযোগ্য প্রভাব থাকবেই। এটা স্পষ্ট যে, আমাদের মস্তিষ্ক যতবেশি সক্রিয় থাকে, জ্ঞানীয় পতন থেকে এটি ততবেশি সুরক্ষিত থাকে। মিং বলেন, এলএলএম কেবল সৃজনশীলতাই কমায় না, এটি জ্ঞানীয় ক্ষতি করতে পারে এবং ডিমেনশিয়ার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
ক্ষতিকর প্রভাব ছাড়াই এআই ব্যবহার : এআই সরঞ্জামের ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই আমাদের এমনভাবে কাজ করতে হবে যাতে এটি উপকার করে, ক্ষতি না করে। আমাদের সবাইকে জ্ঞানীয় শর্টকাট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোসমিনা বলেন, দীর্ঘমেয়াদি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য আমাদের নিজেদের চ্যালেঞ্জ করা চালিয়ে যেতে হবে। আমাদের মন, সৃজনশীলতা ও জ্ঞানীয় স্বাস্থ্য সবই এ প্রক্রিয়ায় উপকৃত হবে। মিং বলেন, গভীরভাবে চিন্তা করা আমাদের সুপারপাওয়ার। আমরা যদি তা ব্যবহার না করি, তা হলে দীর্ঘমেয়াদে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব পড়বে।
কীভাবে ভারসাম্য রাখা যায় : সবকিছুর পরও এআই পুরোপুরি ক্ষতিকর নয়। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি উপকারী হতে পারে। এ জন্য মিং ‘হাইব্রিড ইন্টেলিজেন্স’-এর কথা বলেন যেখানে মানুষ ও যন্ত্র একসঙ্গে কঠিন কাজ করে। কোসমিনা ‘নেমেসিস প্রম্পট’ নামে একটি কৌশলের পরামর্শ দেন। তার পরামর্শ হলো, আগে নিজে বিষয়টি শেখা, তারপর এআই ব্যবহার করা। এআইকে ‘চ্যালেঞ্জার’ হিসেবে ব্যবহার করা (যেমন আপনার যুক্তি ভুল প্রমাণ করতে বলা)।
এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে এআই সরাসরি উত্তর না দিয়ে প্রশ্ন করে আপনাকে ভাবতে বাধ্য করে। প্রম্পটি এআইকে ‘আজীবন শত্রু’ হিসেবে কাজ করতে বলে, তারপর আপনার ধারণাগুলো কেন ভুল এবং কীভাবে সেগুলো ঠিক করা যায়, তা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতে বলে। যাতে আপনি এআইর দেওয়া উত্তর সহজে মেনে না নিয়ে নিজের যুক্তি রক্ষা ও পরিমার্জন করতে বাধ্য হন। তিনি আরও বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে মানসিক শর্টকাট আমাদের মস্তিষ্ক খুব পছন্দ করে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ মস্তিষ্কের জন্য নিজেকে চ্যালেঞ্জ জানানো জরুরি। কারণ যতবেশি আমরা নিজেরা চিন্তা করি, ততবেশি আমাদের সৃজনশীলতা, স্মৃতি এবং সামগ্রিক মানসিক সক্ষমতা শক্তিশালী হয়।