দীর্ঘদিন ধরেই দেশের আকাশসীমায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ ছিল না বাংলাদেশের। নিজেদের আকাশসীমায় কোনো আকাশযান চলাচল করলেও নজরদারি করতে না পারায় রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছিল সরকার। এ ছাড়া ছিল নিরাপত্তা ঝুঁকিও। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অত্যাধুনিক রাডার ও নেভিগেশন ব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে দেশের আকাশসীমাসহ বঙ্গোপসাগরেও এখন নজরদারি করতে পারবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক); এতে বাড়বে রাজস্বও।
অত্যাধুনিক এই রাডার দিয়ে পাশের দেশগুলোর বিমান সংস্থাকেও সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালুর ফলে দেশের আকাশসীমা আরও নিরাপদ, দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হবে বলে মনে করছে বেবিচক।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম গত সোমবার নতুন এই এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সেন্টারের উদ্বোধন করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিমান চলাচলের নিয়ম অনুযায়ী অন্য কোনো দেশের উড়োজাহাজ বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করলে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিতে হয়। শাহজালালে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আগে যে রাডার ও নেভিগেশন ব্যবস্থা ছিল, সেটি অনেক পুরোনো। এটি নজরদারি দেশের পুরো আকাশসীমায়, কিন্তু বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের অংশ করতে পারে না। সে কারণে পুরোপুরি আদায় করা যায়নি সেই ‘ফ্লাইং ওভার চার্জ’। এতে আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল বাংলাদেশ। এসব এলাকায় রাডার কভারেজ দিয়ে আয় করেছে ভারত ও মিয়ানমার।
বেবিচক জানিয়েছে, প্রায় ৯৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ও অত্যাধুনিক এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা নির্মাণ করে চালু করা হয়েছে। নবনির্মিত এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সেন্টার চালুর ফলে এখন ঢাকা থেকে নজরদারি করা যাবে চারপাশের ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত। শনাক্তের আওতায় আসবে সব ফ্লাইট। আর চট্টগ্রামের রাডার এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় দেখা যাবে বঙ্গোপসাগরেও ৩৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত। একই সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে ৪৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত চলাচলকারী ফ্লাইটের সঙ্গে।
এই সিস্টেমে রয়েছে, অটোমেটিক ডিপেন্ডেন্ট সার্ভেইল্যান্স ব্রডকাস্ট (অউঝ-ই), মাল্টিল্যাটারেশন (গখঅঞ) এবং ভেহিকল ট্র্যাকিং সিস্টেম, ভাস্ট এবং রিমোট কমিউনিকেশন এয়ার গ্রাউন্ড সিস্টেম, ভিসিসিএসসহ এটিসি ভয়েস কমিউনিকেশন সিস্টেম, এটিসি টাওয়ার ও স্বয়ংক্রিয় সার্ভিলেন্স সিস্টেমসহ এটিএম কন্ট্রোল সেন্টার ও অন্যান্য সিএনএস সুবিধাগুলো।
বেবিচক বলছে, এই প্রকল্প বঙ্গোপসাগর অঞ্চলসহ সমগ্র বাংলাদেশের আকাশসীমাজুড়ে নজরদারি ও যোগাযোগ ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। এটি কলকাতা ও ইয়াঙ্গুনের সঙ্গে এয়ার ট্রাফিক সার্ভিসেস ইন্টার-ফ্যাসিলিটি ডেটা কমিউনিকেশন (অওউঈ) বাস্তবায়নের পথও খুলে দিয়েছে। এই অঞ্চলে একটি নিরবচ্ছিন্ন আকাশ (ঝবধসষবংং ঝশু) প্রতিষ্ঠার জন্য এই এআইডিএস ছিল অত্যন্ত প্রয়োজন।
এই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের জন্য রিয়েল-টাইম তথ্যপ্রাপ্তি, উন্নত মনিটরিং, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট আরও সহজ ও কার্যকর হবে। এর ফলে বিমান চলাচলের নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, ফ্লাইট পরিচালনা আরও সুশৃঙ্খল হবে এবং আকাশসীমার ব্যবহার আরও দক্ষতার সঙ্গে করা সম্ভব হবে।
এই আধুনিক এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা চালু হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ এমন একটি প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে, যা আমাদের আকাশসীমাকে আরও নিরাপদ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্মত ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (ওঈঅঙ) মান ও সুপারিশের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে এগিয়ে যেতে পারবে। এটি শুধু আমাদের দেশের জন্যই নয়, বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বেবিচক বলছে, ফরাসি প্রতিষ্ঠান থ্যালেসের কারিগরি সহায়তায় এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের বিমান চলাচল খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। ২০১৮ সালে ফ্রান্সের প্রস্তাবের পর ২০১৯ সালে এটি অনুমোদিত হয়। ২০২০ সালের ৩ নভেম্বর দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (গড়ট) স্বাক্ষরিত হয়। ২০২১ সালের শেষে কাজ শুরু হয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এটি সমাপ্ত হয়। সরকারি অর্থের পরিবর্তে বেবিচকের (ঈঅঅই) নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় ৭৩০ কোটি টাকা ধরা হলেও কাজ শেষে চূড়ান্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪২ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের ফলে বাংলাদেশের আকাশসীমায় চলাচলকারী প্রতিটি ফ্লাইটের ওপর এখন নিখুঁত নজরদারি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দেশের অ্যাভিয়েশন খাতের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর আগেও একবার রাডার প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল বেবিচক। ২০১২ সালে সরকারি-বেসরকারি মালিকানার ভিত্তিতে রাডার প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমতি দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। অনুমোদনের পর ২০১৫ সালে দরপত্রও চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় বাতিল হয়ে যায় সে উদ্যোগ। তবে দেরিতে হলেও অত্যাধুনিক এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু হওয়ায় দেশের আকাশসীমায় নজরদারির পাশাপাশি রাজস্বও বাড়বে সরকারের।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম সময়ের আলোকে বলেন, পুরোনো রাডার অনেক আগেই কার্যকারিতা হারিয়েছে। নতুন রাডারসহ অত্যাধুনিক এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু হওয়ায় দেশের আকাশ নির্বিঘ্ন হয়েছে। পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ও বাড়বে সরকারের।
বেবিচক সদস্য (এটিএম) এয়ার কমোডর মো. নূর-ই-আলম বলেছেন, এটি আমাদের জন্য গভীর সমুদ্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি উন্মুক্ত করেছে আরও বেশি রাজস্ব আয়ের সুযোগ।
নতুন ব্যবস্থার যৌক্তিকতা তুলে ধরে বেবিচক চেয়ারম্যান মোস্তফা মাহমুদ সময়ের আলোকে বলেন, আগের এয়ার কন্ট্রোল ব্যবস্থা প্রায় চার দশক এবং রাডার প্রায় ৩৫ বছরের পুরোনো হওয়ায় আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর এটিম (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) সিস্টেম, উন্নত রাডার এবং স্বয়ংক্রিয় সার্ভিলেন্স সিস্টেম স্থাপন হয়ে ওঠে অপরিহার্য। ফ্রান্স সরকারের সহায়তায় জিটুজি ভিত্তিতে বাস্তবায়িত এ প্রকল্প বিমান চলাচল ব্যবস্থাপনায় এনেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন।
প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকে মামলা : গত বছরের ২৭ জানুয়ারি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাডার স্থাপন প্রকল্পে ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা এক মামলায় ১০ জনকে আসামি করে দুর্নীতি দমন কমিশন। এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, সাবেক সিনিয়র সচিব মুহিবুল হক, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সাবেক যুগ্ম সচিব জনেন্দ্রনাথ সরকার, বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এম মফিদুর রহমান, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল মালেক, সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার মো. হাবিবুর রহমান, সিএনএস মেইনটেন্যান্স বিভাগের পরিচালক আফরোজা নাসরিন সুলতানা, পরিচালক (পরিকল্পনা) এ কে এম মনজুর আহমেদ, অ্যারোনেস ইন্টারন্যাশনালের মালিক লুৎফুল্লাহ মাজেদ ও এমডি মাহবুব আনামকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাডার স্থাপনের কাজে অ্যারোনেস ইন্টারন্যাশনালকে সম্পৃক্ত করা হয়। প্রকল্পের কাজে সবশেষ হিসাব অনুসারে ব্যয় করা হয়েছে ৭৩০ কোটি টাকা, যা বেবিচকের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হয়। যার মধ্যে পছন্দের ঠিকাদারকে কার্যাদেশ প্রদান করে বেআইনিভাবে স্থানীয় এজেন্ট অ্যারোনেস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডকে ব্যবহার করে ওই প্রকল্প থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন আসামিরা।