জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) চিকিৎসা কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম নির্ভরযোগ্য স্থান হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই চিকিৎসা কেন্দ্রটি বহিরাগত রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে কার্যত তার মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে যাচ্ছে-এমন অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব মেডিকেল সুবিধা থাকা সত্ত্বেও তারা এখন সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছেন না, বরং বহিরাগতদের ভিড়ে তাদের প্রাপ্য সেবা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
চিকিৎসা কেন্দ্রে প্রতিদিন সকাল থেকেই দীর্ঘ লাইনের চিত্র এখন নিয়মিত দৃশ্য। শিক্ষার্থীরা জানান, সামান্য অসুস্থতা নিয়েও চিকিৎসা নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। অনেক সময় পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোর আগেই তারা ফিরে যেতে বাধ্য হন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি ঠান্ডাজনিত সমস্যায় মেডিকেলে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি বিশাল লাইন। দুইটি কক্ষ থাকলেও একটিতে ডাক্তার ছিল। লাইনে দাঁড়িয়ে বুঝলাম বেশিরভাগই বহিরাগত। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা না নিয়েই ফিরে আসতে হয়েছে।
এমন অভিজ্ঞতা একক নয়; বরং অনেক শিক্ষার্থীরই একই অভিযোগ। ফলে ক্যাম্পাসে চিকিৎসা সেবা নিয়ে হতাশা ও অসন্তোষ বাড়ছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ইসলামনগর, গেরুয়া, অরুনাপল্লী ও আমবাগান এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষ নিয়ম বহির্ভূতভাবে চিকিৎসা কেন্দ্রে সেবা নিচ্ছেন। তাদের অনেকেই বিভিন্ন শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীর রেফারেন্স ব্যবহার করে প্রবেশ করছেন। ফলে যে চিকিৎসা কেন্দ্রটি মূলত শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত, সেটি এখন একপ্রকার উন্মুক্ত সেবাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এতে করে চিকিৎসক ও সেবাকর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা তাদের প্রাপ্য অগ্রাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
চিকিৎসা কেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও দেখা যাচ্ছে মতপার্থক্য। উপ-প্রধান মেডিকেল অফিসার ডা. রিজুয়ানুর রহমান বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা বারবার বলেছি গেইটের বাইরে নোটিশ লাগানো হোক-যাতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে যে এখানে বহিরাগতদের চিকিৎসা দেওয়া হয় না। প্রশাসনের সহায়তায় বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেছি। কিন্তু সিএমও আমার কথা গুরুত্ব দেন না। বরং অনেক অব্যবস্থাপনার দায় আমার ওপরই চাপানো হয়।
অন্যদিকে, প্রধান মেডিকেল অফিসার (সিএমও) ডা. শামছুর রহমান ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, আমরা অনেকবার ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বাস্তবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আশপাশের এলাকার মানুষজন বিভিন্ন রেফারেন্স ব্যবহার করে প্রবেশ করছে, যা প্রতিরোধ করা সহজ নয়।
এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সমস্যার সমাধানে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে এবং প্রশাসনিক উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক সম্পাদক হুসনে মোবারকও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, আমরা বহুবার সিএমওকে বলেছি গেইটের বাইরে স্পষ্ট নোটিশ লাগানোর জন্য, যাতে বহিরাগতদের প্রবেশ বন্ধ করা যায়। শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত সেবা নিশ্চিত করতে এটি অত্যন্ত জরুরি।
জাকসুর পক্ষ থেকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে শিক্ষার্থীরা মনে করছেন।
শুধুই বহিরাগত নয়, রয়েছে বহুমুখী সমস্যা চিকিৎসা কেন্দ্রের সমস্যাগুলো কেবল বহিরাগত রোগীর চাপেই সীমাবদ্ধ নয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ অনুযায়ী, এখানে আরও নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্বলতা বিদ্যমান।
এর মধ্যে রয়েছে, চিকিৎসা কেন্দ্রের সামগ্রিক কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব,আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ঘাটতি,পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স সেবা না থাকা,চিকিৎসা সরঞ্জামের যথাযথ ব্যবহার না হওয়া,ওষুধ ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগ,প্যাথলজি বিভাগের সীমাবদ্ধতা, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগে অনিয়ম ও ঘাটতি এই সমস্যাগুলো একত্রে চিকিৎসা সেবার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং শিক্ষার্থীদের আস্থাকে ক্ষুণ্ণ করছে।
প্রশাসনিক শিথিলতা নাকি কাঠামোগত দুর্বলতা?
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের পেছনে দুটি বড় কারণ থাকতে পারে-প্রশাসনিক শিথিলতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতা। একদিকে যেমন নিয়ম থাকা সত্ত্বেও তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না, অন্যদিকে চিকিৎসা কেন্দ্রের সক্ষমতা বর্তমান চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
যদি বহিরাগতদের প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করাও সম্ভব না হয়, তবে অন্তত আলাদা সময়সূচি বা আলাদা কাউন্টার চালু করে শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা যেতে পারে-এমন মত দিয়েছেন অনেকেই।
সমস্যা সমাধানে কয়েকটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।
প্রথমত, চিকিৎসা কেন্দ্রের প্রবেশপথে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পরিচয়পত্র যাচাই ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে না দেওয়া হলে বহিরাগতদের চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও তা দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন করতে হবে, যাতে সবাই জানে কারা সেবা পাওয়ার অধিকারী।
তৃতীয়ত, চিকিৎসকের সংখ্যা ও সেবা কক্ষ বাড়ানো জরুরি, যাতে অতিরিক্ত চাপ সামাল দেওয়া যায়।
চতুর্থত, প্রশাসন, চিকিৎসক এবং ছাত্র প্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে হবে, যাতে সমস্যা দ্রুত শনাক্ত ও সমাধান করা যায়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্র মূলত শিক্ষার্থীদের কল্যাণের জন্য প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। বহিরাগত রোগীর অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং ব্যবস্থাপনার ঘাটতি মিলিয়ে একটি জটিল সংকট তৈরি হয়েছে।
এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু শিক্ষার্থীদের শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরই নয়, মানসিক স্বস্তি ও শিক্ষাজীবনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই দ্রুত, কার্যকর এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। শিক্ষার্থীদের একটাই প্রত্যাশা-নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত নূন্যতম চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত হোক, যেখানে তারা অগ্রাধিকার পাবে এবং হয়রানির শিকার হবে না।
সময়ের আলো/জোই