অবৈধ জ্বালানি মজুদে মৃত্যুঝুঁকি

এম মামুন হোসেন (ঢাকা) ও সাইফুদ্দিন তুহিন (চট্টগ্রাম)

জাতীয়

দেশজুড়ে জ্বালানি তেল ঘিরে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক। সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি না থাকলেও গুজব, আশঙ্কা এবং অতিরিক্ত লাভের

2026-04-22T23:45:16+00:00
2026-04-23T01:25:40+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
অবৈধ জ্বালানি মজুদে মৃত্যুঝুঁকি
এম মামুন হোসেন (ঢাকা) ও সাইফুদ্দিন তুহিন (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৪৫ পিএম  আপডেট: ২৩.০৪.২০২৬ ১:২৫ এএম
জ্বলানী সংকটের ভয়ে অনেকেই মজুত করছে তেল। ছবি : শেখ ফেরদৌস
দেশজুড়ে জ্বালানি তেল ঘিরে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক। সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি না থাকলেও গুজব, আশঙ্কা এবং অতিরিক্ত লাভের লোভে মানুষের আচরণ হয়ে উঠছে অস্বাভাবিক। ফলস্বরূপ স্বাভাবিক বাজারব্যবস্থার বাইরে গিয়ে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম সংকট, আর একই সঙ্গে বাড়ছে ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঝুঁকি। এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, জননিরাপত্তার জন্যও এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলায় নিজ বাড়িতে ড্রামে ৫০ লিটার ডিজেল মজুদ করেন ট্রাক মালিক আশিকুর রহমান বাবু প্রামাণিক। সেই ডিজেলে ডুবে বুধবার ছেলে আরাফ প্রামাণিকের (৩) মৃত্যু হয়েছে। সকালে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি মারা যায়। আগের দিন মঙ্গলবার বিকালে ড্রামে রাখা ডিজেলে ডুবে অসুস্থ হওয়ায় আরাফকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি আগ্রাসনের পর থেকে সারা দেশে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মজুদ প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অসাধু ব্যবসায়ী- সবার মধ্যেই যেন ঝুঁকিপূর্ণভাবে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল মজুদের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। টিনের কৌটা, প্লাস্টিক বোতল, ড্রাম, এমনকি পুকুরের পানির নিচেও লুকিয়ে রাখা হচ্ছে জ্বালানি তেল। এতে শুধু কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে না, ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকিও বাড়ছে।

দিন দিন দেশে জ্বালানি তেলের পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দেশের বাজারে মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করেছে। যদিও সরকার বারবার বলছে দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই, তারপরও পাম্পে দীর্ঘ লাইন এবং ‘তেল নেই’ প্ল্যাকার্ড মানুষের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। পেট্রোল পাম্প মালিকরাও বিপাকে পড়েছেন। তাদের দাবি, তারা নিয়ম মেনে বিক্রি করলেও ক্রেতারা অতিরিক্ত কিনে মজুদ করছেন, যা নিয়ন্ত্রণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। একই সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে পাম্প মালিকদের বিরুদ্ধেই মজুদদারির অভিযোগ উঠছে। সংকটের এ সুযোগে মিয়ানমারে পাচারকারীরাও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রতিবেশী দেশেও পাচার হচ্ছে জ্বালানি তেল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেট্রোল ও অকটেন অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ, যা স্বাভাবিক তাপমাত্রায় দ্রুত বাষ্পে পরিণত হয়। খোলা বা অনিরাপদ পাত্রে সংরক্ষণ করলে তা আশপাশে গ্যাসের মতো ছড়িয়ে পড়ে। সামান্য স্ফুলিঙ্গ, ম্যাচের আগুন বা বৈদ্যুতিক স্পার্ক থেকেই বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ফলে আবাসিক এলাকায় এ ধরনের মজুদ পুরো পাড়া-মহল্লাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল হক সময়ের আলোকে বলেন, জ্বালানি তেল দাহ্য পদার্থ, তাই সংরক্ষণে নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাম্পগুলো সংরক্ষণের জন্য বিশেষভাবে তৈরি, কিন্তু গ্রামগঞ্জে যে যেভাবে পারছে মজুদ করছে। এ থেকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি রয়েছে। তিনি আরও বলেন, যেখানে সেখানে তেল মজুদে মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

রাজধানীজুড়ে পেট্রোল পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। এ লাইন যেন শেষ হতে চায় না- লাইনের মাথা ফিলিং স্টেশনে, কিন্তু লেজ চলে গেছে বহুদূর। জ্বালানি তেল নিয়ে অস্বস্তি প্রতিদিনই বাড়ছে। ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের ক্রেতারা পড়েছেন চরম বিপাকে; তারা চাহিদামতো জ্বালানি পাচ্ছেন না। তেল না থাকায় অনেক ফিলিং স্টেশনও বন্ধ রয়েছে।
আরও পড়ুন

শনিবার আরামবাগের মেসার্স এইচকে ফিলিং স্টেশনে তেলের দীর্ঘ লাইন সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। মোটরসাইকেলের লাইন স্টেশনের সামনে থেকে ফকিরাপুল হয়ে রাজারবাগ পুলিশ বক্স ঘুরে এজিবি কলোনির গলি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। শত শত প্রাইভেটকার এবং হাজারো মোটরসাইকেলের লাইন দেখা গেছে। বিকালে তেল নিয়ে হট্টগোলও দেখা যায়। শুধু এই পেট্রোল পাম্পের চিত্রই এমন তা নয়; সারা দেশের ছোট-বড় সব পাম্পের পরিস্থিতি প্রায় একই। ‘তেল বা অকটেন নেই’- এমন প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখা কিংবা দিনে একবার নির্দিষ্ট পরিমাণে জ্বালানি বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে অনেক স্টেশনে। ফলে যখন যেই স্টেশনে তেল বিক্রি শুরু হচ্ছে, সেখানেই একসঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত বাইকের ভিড় ও গাড়ির দীর্ঘ লাইনের ছবি এবং ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। আবার এর মধ্যেই অভিযোগ উঠেছে, কেউ কেউ এক জায়গা থেকে তেল কিনে খোলা বাজারে বিক্রি করছে এবং পরে অন্য পাম্প থেকে আবার তেল সংগ্রহ করছে।

খোলাবাজারে এসব তেল লিটারপ্রতি দুইশ টাকার বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘ লাইনের ভোগান্তি এড়াতে অনেকেই বেশি দামে এসব কালোবাজারির কাছ থেকে তেল কিনছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পেট্রোল পাম্প থেকে সংগৃহীত জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ সরাসরি ব্যবহার না হয়ে মজুদে চলে যাচ্ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সামনে তেলের ঘাটতি তৈরি হতে পারে এই আতঙ্ক থেকেই ‘প্যানিক বায়িং’ বা অতিরিক্ত কেনার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। সেই সুযোগে একটি সিন্ডিকেট চড়া দামে বিক্রির জন্য অবৈধভাবে তেল মজুদ করছে। এতে বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।

তেল মজুদ করা হচ্ছে গোয়ালঘরেও : মজুদের তালিকায় গ্রামের গোয়ালঘরও বাদ যাচ্ছে না। গত মার্চের শেষ সপ্তাহে কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলায় একটি গোয়ালঘর থেকে ড্রামভর্তি পেট্রোল জব্দ করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ঘটনায় অবৈধ মজুদ ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় উপজেলার দাঁতভাঙা ইউনিয়নে অভিযান পরিচালনা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাফিউর রহমান।

ভ্রাম্যমাণ আদালত জানান, ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের এক বাসিন্দার গোয়ালঘরে অবৈধভাবে পেট্রোল মজুদ রাখা হয়েছিল। অভিযোগ আছে, তার পরিবারের এক সদস্য ড্রামে পেট্রোল সংরক্ষণ করে বেশি দামে বিক্রি করছিলেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে গোয়ালঘর থেকে পেট্রোলভর্তি ড্রাম ও তেল বিক্রির বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। অভিযানের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত না থাকায় তার পরিবারের অন্য একজন জরিমানার অর্থ পরিশোধ করেন।

অবৈধভাবে মজুদ তেল জব্দের পরিমাণও বাড়ছে : অবৈধ মজুদ ও সরবরাহে অনিয়ম রোধে সারা দেশে তৎপর ভ্রাম্যমাণ আদালত। প্রতিদিন জব্দ হচ্ছে জ্বালানি তেল। এ সময় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। চলমান অভিযানে মোট ৫ লাখ ৪২ হাজার ২৩৬ লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়েছে বলে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত চলা অভিযানে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ৬৬ হাজার ১ লিটার ডিজেল জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩৯ হাজার ৭৭৬ লিটার অকটেন এবং ৮৭ হাজার ৯৫৯ লিটার পেট্রোল উদ্ধার করা হয়। চট্টগ্রামে পৃথক অভিযানে আরও ৪৮ হাজার ৫০০ লিটার ফার্নেস অয়েল জব্দ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। এ সময়ে জ্বালানি তেলের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সারা দেশে ৯ হাজার ১১৬টি অভিযান পরিচালিত হয়। এসব অভিযানে ৩ হাজার ৫১০টি মামলা করা হয়েছে।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযানের সময় মোট ১ কোটি ৫৬ লাখ ৯ হাজার ৬৫০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয় এবং বিভিন্ন অপরাধে ৪৫ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, এ খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অবৈধ কার্যক্রম দমনে এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

এদিকে তেল মজুদের ঝুঁকি বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্মকর্তারা সতর্ক করে জানিয়েছেন, অনিরাপদভাবে জ্বালানি মজুদ এখন একটি ‘টাইম বোমা’তে পরিণত হয়েছে। তাদের মতে, দুর্ঘটনা এড়াতে পাম্প পর্যায়ে বিক্রি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক নজরদারি এবং জনসচেতনতা জরুরি। কারণ ফায়ার সার্ভিসের পক্ষে প্রতিটি এলাকায় গিয়ে মনিটরিং করা সম্ভব নয়।

সময়ের আলোর ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি এস এম আক্কাছ জানান, তেল মজুদ করতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ হয়ে পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থেকে পেট্রোল পাম্পের সহকারী ব্যবস্থাপকের অবশেষে মৃত্যু হয়েছে। শনিবার বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তার মৃত্যু হয়। এর আগে ১৪ এপ্রিল রাতে বসতঘরের সামনে মোটরসাইকেলের প্লাগ পরিষ্কার করতে গিয়ে অসাবধানতায় অগ্নিদদ্ধ হন তিনি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি দীর্ঘদিন ধরে জনতা পেট্রোল পাম্পে চাকরির সুবাদে গভীর রাতে সেখান থেকে গ্রামের বাড়িতে পেট্রোল-অকটেনের মজুদ করতেন। পরে সুযোগ বুঝে বাড়ি থেকেই অতিরিক্ত দামে ক্রেতাদের এসব তেল সরবরাহ করতেন। ঘটনার দিন অনুরূপ তেল সরবরাহ করতে গিয়েই তিনি মূলত অগ্নিদগ্ধ হন।

ফটিকছড়ি থানার ওসি মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এক দল পুলিশ পাঠিয়েছি। কারও অভিযোগ না থাকলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে বিস্ফোরক অধিদফতরের নিয়ম অনুযায়ী, জ্বালানি তেল সংরক্ষণে কঠোর নীতিমালা রয়েছে। লাইসেন্স ছাড়া কোথাও তেল মজুদের অনুমতি নেই। নিরাপদ স্টোরেজ, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, প্রশিক্ষিত জনবলসহ অন্তত অর্ধশত শর্ত পূরণ করেই কেবল বৈধভাবে জ্বালানি সংরক্ষণ করা যায়। অথচ বর্তমানে এসব নিয়মের তোয়াক্কা না করেই যত্রতত্র তেল মজুদ করা হচ্ছে।

১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে মজুদদারি ও কালোবাজারির জন্য সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবু মজুদদারদের তৎপরতা থামছে না; বরং সংকট যত বাড়ছে, ততই সক্রিয় হয়ে উঠছে অসাধু চক্র।

বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক সময়ের আলোকে বলেন, মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ট্যাঙ্ক ভরে তেল নেওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। সরকারের তিনটি ডিপো বাড়তি চাহিদার জোগান দিতে পারছে না। তিনি বলেন, মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ভিড় করে তেল কিনে মজুদ করছে। কিন্তু বাড়তি চাহিদার কারণে ট্যাঙ্ক লরির দীর্ঘলাইন পড়ে গেছে, ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। পাম্পগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান তিনি।

বিস্ফোরক অধিদফতরের সহকারী পরিদর্শক সানজিদা বলেন, বাসাবাড়িতে জ্বালানি তেল সংরক্ষণের কোনো সুযোগ নেই। লাইসেন্স ছাড়া কোথাও এটি রাখা যাবে না, আইনেও এমন অনুমতি নেই। দাহ্য পদার্থ আগুনের সংস্পর্শে এলে বড় আকারের অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটতে পারে এবং ক্ষয়ক্ষতিও হবে ব্যাপক।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে দেদার পাচার হচ্ছে জ্বালানি তেল। সম্প্রতি পতেঙ্গা থেকে বিপুল জ্বালানি তেল জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড। মিয়ানমারে পাচারের আগমুহূর্তে ধরা পড়ে এসব ডিজেল। গত ২৭ মার্চ চট্টগ্রাম বিমানবন্দর সংলগ্ন দক্ষিণ পতেঙ্গার চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় অবৈধভাবে মজুদ করা ৬ হাজার লিটার ডিজেল জব্দ করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করে এসব জব্দ করে। পতেঙ্গা থানার এসআই পল্লব সরকার বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে বিপুল ডিজেল জব্দ করা হয়েছে। অভিযানে প্রায় ৩০ ড্রামভর্তি ৬ টন অবৈধভাবে মজুদকৃত ডিজেল জব্দ করা হয়েছে। যা ৬ হাজার লিটারের কিছু বেশি। পাশাপাশি ডিজেল লোডিং ও আনলোডিংয়ের কাজে ব্যবহৃত তিনটি পাম্পও জব্দ করা হয়।

গত ৪ এপ্রিল সকাল ৬টায় পতেঙ্গা থানাধীন চট্টগ্রাম বহির্নোঙর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডিজেলসহ ১২ জন পাচারকারীকে আটক করেছে কোস্ট গার্ড। এ সময় মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে মজুদ করা ৬ হাজার লিটার ডিজেল জব্দ করা হয়।

কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কোস্ট গার্ড আউটপোস্ট পতেঙ্গা এই অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় সন্দেহজনক একটি বোটে তল্লাশি চালানো হয়। এরপর অবৈধভাবে শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে পাচারের উদ্দেশ্যে মজুদ রাখা ৬ হাজার লিটার ডিজেল জব্দ করা হয়। এসব ডিজেলের বাজার মূল্য প্রায় ৬ লাখ ২৪ হাজার টাকা। অভিযানে ৬টি গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডার, নগদ ১৫ হাজার ৮৯৬ টাকা এবং পাচারকাজে ব্যবহৃত বোটটি জব্দ করা হয়েছে।

জব্দ বোটটি ব্যবহার করে আনুমানিক ১৫০ থেকে ২০০ জনকে মালয়েশিয়ায় পাচারের একটি বড় পরিকল্পনা ছিল। আটককৃত পাচারকারীদের মধ্যে ৪ জন বাংলাদেশি এবং ৮ জন রোহিঙ্গা নাগরিক রয়েছেন। জব্দকৃত মালামাল ও আটককৃত পাচারকারীদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন। পাচার ও চোরাচালান রোধে কোস্ট গার্ডের এই ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

অবৈধ মজুদ ঠেকাতে কঠোর সরকার : গত ২৮ মার্চ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের মতো জ্বালানি তেল অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ হওয়ায় এগুলো ঘরে বা অনিরাপদ স্থানে মজুদ করা ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। অবৈধ মজুদে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ নিজেই বলেছেন, কালোবাজারিরা তেলের মজুদ তৈরি করে সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করছে।

জ্বালানি তেল মজুদদারির তথ্য দিলে মিলবে পুরস্কার : দেশে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট রোধে অবৈধ মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। ২৭ মার্চ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, এখন থেকে জ্বালানি তেল অবৈধভাবে মজুদ করার সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করা হবে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, জ্বালানি তেলের সরবরাহ তদারকি করতে ইতিমধ্যে দেশের সব জেলায় ভিজিলেন্স টিম গঠন করা হয়েছে। অবৈধ মজুদদারি বন্ধে যারা তথ্য দিয়ে সহায়তা করবেন তাদের জন্য দ্রুতই আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কারের ঘোষণা আসতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে সচেতন নাগরিকদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও পরামর্শ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, যারা অবৈধ মজুদদারির তথ্য দিচ্ছেন, তাদের ১ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এএডি/


  বিষয়:   অবৈধ  জ্বালানি  মজুদ  মৃত্যু 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: