ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতার চেয়ারে পৌঁছাতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে। লড়াইয়ের ময়দানে এবার যেমন রয়েছেন ঝানু রাজনীতিবিদরা, তেমনি আছেন গ্ল্যামার জগতের পরিচিত মুখ থেকে শুরু করে মাঠ কাঁপানো ছাত্রনেতারা। এই নির্বাচনে প্রতিটি প্রার্থীর ব্যক্তিগত জীবন, পছন্দ-অপছন্দ আর রাজনৈতিক কৌশলের এক বিচিত্র সমাহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের মূল ভিত্তিই হলো লড়াই। ৭১ বছর বয়সেও তিনি লড়াকু মেজাজ বজায় রেখেছেন। গত নির্বাচনে নন্দীগ্রামে বিপর্যয়ের পর এবার তিনি নিজের পুরনো দুর্গ ভবানীপুরেই আস্থা রেখেছেন। তবে এবার দিদির স্লোগান কিছুটা ভিন্ন— ফাটাফাটি খেলা হবে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বেঁধে দেওয়া জয়ের ব্যবধান লক্ষ্য রেখে তিনি প্রতিটি কর্মিসভায় নিজে তদারকি করছেন। ঘনিষ্ঠ মহলে উদ্বেগ না থাকলেও প্রতিটি লড়াইয়ের মতো এবারও তিনি অত্যন্ত গম্ভীর ও কৌশলী।
মমতার প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন শুভেন্দু অধিকারী। এক সময়ের ঘাসফুল শিবিরের অন্যতম ভরসা শুভেন্দু এখন পদ্ম শিবিরের তুরুপের তাস। ৫৫ বছর বয়সী এই নেতা নিজের ডায়েট আর ফিটনেসের বিষয়ে যেমন সচেতন, রাজনীতির মাঠেও তেমনি প্রখর। ব্রাউন রাইস আর নিয়মিত হাঁটাচলা তার প্রতিদিনের রুটিন হলেও রাজনৈতিক ভাষণে তিনি সর্বদা আক্রমণাত্মক। একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজনৈতিক গুরু মানলেও এখন তার ভরসা অমিত শাহ। নন্দীগ্রাম জয়ের পর এবার ভবানীপুরেও মমতাকে টক্কর দিতে তিনি প্রস্তুত।
রঙিন মেজাজের নেতা হিসেবে পরিচিত মদন মিত্র, ৭০ পার করলেও এখনো তারুণ্যে ভরপুর। জনপ্রিয়তায় তিনি এখনো অনেককে টেক্কা দিতে পারেন। ওহ লাভলি সংলাপের স্রষ্টা মদন মিত্র এখন সমাজমাধ্যমের লাইভ স্টার হলেও এলাকার মানুষের সেবায় এখনো নিবেদিত। তার আসল শক্তি হিসেবে কাজ করে তার লড়াকু স্পিরিট এবং নাতি লোলোর প্রতি গভীর স্নেহ।
বিজেপির আরেক প্রভাবশালী মুখ দিলীপ ঘোষের উত্থান সঙ্ঘের প্রচারক থেকে রাজপথের লড়াকু নেতা হিসেবে। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে কিছুটা ধাক্কা খেলেও বিধানসভা নির্বাচনে তিনি আবার স্বমহিমায়। লাঠি খেলা আর তলোয়ার চালনায় দক্ষ এই নেতা স্পষ্ট কথা বলতেই ভালোবাসেন। তার রাজনৈতিক জীবনে উত্থান-পতন থাকলেও নিজের সিদ্ধান্তে তিনি সর্বদা অনড়।
মুর্শিদাবাদের রাজনীতির রবিনহুড হিসেবে পরিচিত অধীর রঞ্জন চৌধুরী তিন দশক পর আবার বিধানসভার লড়াইয়ে ফিরেছেন। বহরমপুরের এই জনপ্রিয় নেতা লোকসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর এবার বিধানসভাকেই পুনরুদ্ধারের হাতিয়ার করেছেন। রাজনৈতিক লড়াইয়ের দীর্ঘ ইতিহাস আর জেল খাটার অভিজ্ঞতা তাকে করে তুলেছে অপরাজেয়।
বামেদের তরুণ তুর্কি মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায় এবার উত্তরপাড়ার লড়াইয়ে খাতা খোলার মিশনে নেমেছেন। যুব সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়ার পর কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাওয়া মিনাক্ষীর সারল্যই তার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে রেখেছে। একই সারিতে আছেন দীপ্সিতা ধর, যিনি উত্তর দমদমে বামেদের তরুণ মুখ হিসেবে লড়াই করছেন।
বিজেপির অন্দরে শঙ্কর ঘোষ এখন শুভেন্দু অধিকারীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত সৈনিক। শ্মশানে দাহকার্য করার সময় একটি ফোন কল যেভাবে তার রাজনৈতিক দর্শন বদলে দিয়েছিল, তা এখন বাংলার রাজনীতির অন্যতম গল্প। শিলিগুড়ির এই বিধায়ক এবার মেয়র গৌতম দেবের বিরুদ্ধে কঠিন লড়াইয়ে অবতীর্ণ। অন্যদিকে, আসানসোলের লড়াকু মুখ অগ্নিমিত্রা পাল ফ্যাশন ডিজাইনারের গ্ল্যামার ছেড়ে এখন রাজপথের আগুনঝরা নেত্রী।
ফিরহাদ হাকিম বা ববি তৃণমূলের অন্যতম প্রভাবশালী স্তম্ভ। কলকাতার মেয়র এবং রাজ্যের মন্ত্রী হিসেবে বহুমুখী দায়িত্ব পালন করলেও পাড়ার মেজাজটা তিনি হারাননি। শরীরচর্চায় মনোযোগ দিলেও চেতলা বাজারের আড্ডায় তিনি এখনো অতি সাধারণ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আস্থাভাজন এই নেতা রাজনৈতিক ময়দানে এক ওজনদার খেলোয়াড়।
টলিপাড়ার পরিচালক রাজ চক্রবর্তী সিনেমা আর রাজনীতি- এই দুই পৃথিবীকেই সমানতালে সামলাচ্ছেন। ব্যারাকপুরের বিধায়ক হিসেবে এবারও তিনি মমতার উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে মরিয়া। তার প্রতিটি পদক্ষেপেই কৌশলী ছোঁয়া থাকে।
সবশেষে বলা যায় নওশাদ সিদ্দিকির কথা। শান্ত মেজাজের এই পিরজাদা রাজনীতির মাঠে অত্যন্ত তেজি। অর্থবল বা প্রশাসনিক সমর্থন না থাকলেও সাধারণ মানুষের ভরসায় তিনি রাজনীতির মাটিতে পা শক্ত করেছেন। বিরিয়ানি প্রিয় এই তরুণ নেতা ভাঙড়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে এখন গোটা রাজ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
/কহু