উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরে অসময়ের ভারী বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে অকাল বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৮ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাওয়া অতি ভারী বর্ষণ ও ভারতের চেরাপুঞ্জিতে সম্ভাব্য বৃষ্টিপাতের ফলে নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ফসল তোলা নিয়ে চরম উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার লাখো কৃষক।
সুনামগঞ্জের পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ২৮ এপ্রিল থেকে ভারী বৃষ্টির প্রভাবে সুরমা, কুশিয়ারা, ধনুসহ প্রধান নদীগুলোর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি হলে সেই পানি পাহাড়ি ঢল হিসেবে হাওরে প্রবেশ করে বাঁধের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে। ইতিমধ্যে গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে রক্ষা বাঁধের মাটি দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা ঢলের পানি সামলানোর ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। নেত্রকোনার সোমেশ্বরী, কংস ও উব্দাখালী নদীর পানিও ক্রমাগত বাড়ছে।
সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে আবাদ হওয়া বোরো ধানের অর্ধেকের বেশি এখনো কাটার বাকি। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এখনো প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ধান হাওরে রয়ে গেছে। এর মধ্যে অনেক ধান এখনো পুরোপুরি পাকেনি। নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলেও একই অবস্থা; সেখানে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫৮ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, কৃষকরা এখন দ্বিমুখী সংকটে পড়েছেন। অনেক নিচু জমিতে পানি জমে থাকায় কম্বাইন্ড হারভেস্টার চালানো যাচ্ছে না। আবার শ্রমিকের প্রচণ্ড সংকট ও বাড়তি মজুরির কারণে কৃষকরা দিশেহারা। সুনামগঞ্জে জনপ্রতি শ্রমিকের মজুরি ১২০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বন্যার হাত থেকে বাঁচতে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে আধা পাকা ধান কেটে ফেলছেন। কিন্তু বিরূপ আবহাওয়ার কারণে সেই ধান মাড়াই করা বা রোদে শুকানো সম্ভব হচ্ছে না। ধান শুকাতে না পারলে তা নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এছাড়া প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে ধান ঘরে তুললেও বাজারে প্রত্যাশিত দাম পাওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের বর্তমান বাজারমূল্য অনেক কম হওয়ায় আমার লোকসানের শঙ্কায় আছি।
কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন কৃষকদের ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেলেই তা দ্রুত কেটে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছে। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ধান কাটার যন্ত্রের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিক আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের উপজেলা প্রশাসনগুলো মাইকিং করে কৃষকদের সতর্ক করছে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের অকাল বন্যায় হাওরের ফসল পুরোপুরি তলিয়ে যাওয়ায় সারাদেশে চালের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। এবারও জাতীয় খাদ্যভাণ্ডারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই অঞ্চলের ধান রক্ষা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
/কহু