ধারণার চেয়ে ঢের শক্তিশালী হিজবুল্লাহ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

২০২৪ সালের নভেম্বরে যখন ইসরাইল এবং হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়, তখন জনমনে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল যে ইরানপন্থি এই

2026-04-29T02:58:39+00:00
2026-04-29T02:58:39+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ধারণার চেয়ে ঢের শক্তিশালী হিজবুল্লাহ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ২:৫৮ এএম 
সংগৃহীত ছবি
২০২৪ সালের নভেম্বরে যখন ইসরাইল এবং হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়, তখন জনমনে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল যে ইরানপন্থি এই লেবানিজ গোষ্ঠীটি সম্ভবত তাদের শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। সেই সময় লেবাননে ইসরাইলের মারাত্মক আক্রমণে, দীর্ঘকাল ধরে হিজবুল্লাহর মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে আসা হাসান নাসরাল্লাহসহ সংগঠনটির প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় নেতা নিহত হয়েছিলেন। একই সঙ্গে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে আগ্রাসন চালিয়েছিল, যে অঞ্চলটি লেবাননে হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত। 

দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বিমান হামলায় হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিও হয়। এর আগে পেজার ডিভাইসে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে শত শত হিজবুল্লাহ কমান্ডারকে আহত করে ইসরাইল। ইসরাইল ও পশ্চিমা বিশ্বের তীব্র চাপের মুখে লেবাননের সরকারি পর্যায়ে তখন এই গোষ্ঠীর পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিল। হিজবুল্লাহর সামরিক ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরেও তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছিল। তবে হিজবুল্লাহ এখন আবারও রণক্ষেত্রে ফিরে এসেছে। দক্ষিণ লেবাননে তারা ইসরাইলি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছে। তাতে দেখা যাচ্ছে যে তাদের যুদ্ধ করার ক্ষমতা, অনেকে যা ধারণা করেছিলেন তার চেয়ে ঢের বেশি।

বিশ্লেষকরা আলজাজিরাকে বলেছেন, হিজবুল্লাহর ভাগ্যের চাকা হয়তো ঘুরে গেছে। তবে তাদের ভবিষ্যৎ এখনও অস্পষ্ট এবং তা মূলত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার আলোচনার ওপর নির্ভর করছে। এই আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা নিরসন।

হিজবুল্লাহ এখনও শক্তিশালী : ২০২৪ সালের নভেম্বরের ‘যুদ্ধবিরতি’র পর ইসরাইল পরবর্তী ১৫ মাস ধরে লেবাননে তুলনামূলক কম মাত্রায় আক্রমণ চালিয়ে আসছিল, যদিও তাতে শত শত মানুষ নিহত হয়। হিজবুল্লাহ গত ২ মার্চ পর্যন্ত এর কোনো জবাব দেওয়া থেকে বিরত ছিল। কিন্তু মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার কয়েক দিন পরই তারা সক্রিয় হয়। খামেনি লেবাননের শিয়া গোষ্ঠীর কাছেও অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন।
একই দিনে লেবানন সরকার হিজবুল্লাহর সব সামরিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। তা সত্ত্বেও ইসরাইল তাদের হামলা আরও জোরদার করে, যার পরিধি রাজধানী বৈরুত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। ইসরাইলি বাহিনী লেবাননের বিশাল এলাকাজুড়ে আগ্রাসন চালায়। এই সংঘাতে প্রায় ১২ লাখেরও বেশি লেবানিজ বাস্তুচ্যুত হন। 

১৬ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১০ দিনের জন্য একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন, যা পরে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। তবুও দক্ষিণ লেবাননে তীব্র লড়াই অব্যাহত রয়েছে। হিজবুল্লাহ জানিয়েছে যে, তারা এবার একতরফা কোনো যুদ্ধবিরতি মেনে নেবে না যেখানে ইসরাইল তাদের সদস্য ও অবকাঠামোতে হামলা চালাবে ঠিকই, অথচ তারা কোনো পাল্টা জবাব দিতে পারবে না; আগের মতো এমন বন্দোবস্ত থাকবে।

সোমবার হিজবুল্লাহর একজন সামরিক নেতা আলজাজিরাকে বলেছেন, গোষ্ঠীটি আবারও লেবাননের মাটিতে ইসরাইলি লক্ষ্যবস্তুর ওপর ‘আত্মঘাতী অভিযান’ চালানোর পদ্ধতিতে ফিরে আসবে। ১৯৮০-এর দশকে তারা এই পদ্ধতি ব্যবহার করলেও সাম্প্রতিক বছরের যুদ্ধগুলোতে তা থেকে দূরে ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, হিজবুল্লাহর পতন নিয়ে যে দাবি করা হয়েছিল তা ছিল অতিরঞ্জিত। হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ লেবানিজ সাংবাদিক কাসেম কাসির আলজাজিরাকে বলেন, অনেকে হিজবুল্লাহর পরাজয়ের কথা বললেও এটি স্পষ্ট যে তারা এখনও শক্তিশালী এবং সফলভাবে নিজেদের পুনর্বিন্যাস করতে সক্ষম হয়েছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের নন-রেসিডেন্ট ফেলো এবং হিজবুল্লাহকে নিয়ে একটি বইয়ের লেখক নিকোলাস ব্ল্যানফোর্ড আলজাজিরাকে জানান, হিজবুল্লাহর এই পুনরুত্থান মোটেই আশ্চর্যজনক নয়। তাদের যথেষ্ট সক্ষমতা ও যোদ্ধা ছিল, তারা নিজেদের পুনর্গঠিত করার সময় পেয়েছে এবং তাদের অস্ত্রশস্ত্রও ফুরিয়ে যায়নি।

আলোচনাই নির্ধারণ করবে হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ : যুদ্ধ চললেও বর্তমানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় আলোচনা চলছে, যা লেবানন ও হিজবুল্লাহর ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথম ধারাটি হলো লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে সরাসরি আলোচনা। এপ্রিলের শুরুতে ওয়াশিংটন ডিসিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় উভয়পক্ষের মধ্যে প্রথম দুটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
লেবানন সরকার জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার এবং একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। লেবানিজ প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন বলেছেন, এটি ১৯৪৯ সালের দুই দেশের মধ্যকার অস্ত্রবিরতি চুক্তির মতো হতে পারে। 

তিনি সামাজিকমাধ্যমে এক পোস্টে লিখেছেন, আমি কোনো অপমানজনক চুক্তি মেনে নেব না।

তবে হিজবুল্লাহ এই আলোচনার ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকার করেছে এবং উচ্চকণ্ঠে এর তীব্র বিরোধিতা করেছে। সোমবার হিজবুল্লাহ নেতা নাঈম কাসেম এক বিবৃতিতে বলেন, আমরা সরাসরি আলোচনা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। যারা ক্ষমতায় আছেন তাদের জানা উচিত, তাদের এই আলোচনার পদ্ধতি লেবানন বা তাদের নিজেদের কোনো উপকারে আসবে না।

দ্বিতীয় ধারাটি হলো ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান স্থবির আলোচনা। ১৯৭৫-১৯৯০ সালের লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময় হিজবুল্লাহর প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইরান তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। ইরান ও পাকিস্তান প্রাথমিকভাবে বলেছিল, এই যুদ্ধবিরতি লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত, যদিও ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র তা অস্বীকার করে। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডি অনুসারে, ওই দিন ইসরাইল লেবাননে অন্তত ১৫০ জন বেসামরিক নাগরিকসহ ৩৫০ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করে।

সাংবাদিক কাসেম কাসির বলেন, হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ এখন কেবল ইরান, আমেরিকা ও লেবানন পর্যায়ের আলোচনার সমাপ্তির পরই নির্ধারিত হতে পারে। হিজবুল্লাহ আগের চেয়ে অনেক বেশি জনপ্রিয় ও শক্তিশালী হয়ে উঠছে এবং যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম। তবে  ভবিষ্যতে তাদের ভূমিকা কী হবে তা আলোচনার ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে।

উল্লেখ্য যে, লেবাননে একটি ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে সৌদি আরবকে প্রধান ভূমিকায় রেখে আঞ্চলিক কূটনৈতিক বৈঠকও শুরু হয়েছে। গত ২৩ এপ্রিল সৌদি আরবের দূত প্রিন্স ইয়াজিদ বিন ফারহান এবং লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার ও হিজবুল্লাহর প্রধান মিত্র নাবিহ বেরির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বেরি পরে লেবাননের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা লক্ষ্য করে ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধে সৌদি আরবের প্রচেষ্টার জন্য ধন্যবাদ জানান।

হিজবুল্লাহর ইরানি পৃষ্ঠপোষক : হিজবুল্লাহ বর্তমানে দুর্বল, অনেকের এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হলেও তাদের সামনে এখনও অনেক বাধা রয়েছে। হিজবুল্লাহর সমর্থনের মূল ভিত্তি হলো লেবাননের শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়, তবে অন্যান্য গোষ্ঠীর কাছে তারা অনেকটাই অজনপ্রিয়। ২ মার্চ হিজবুল্লাহ যখন আবারও যুদ্ধে যোগ দেয়, তখন খোদ শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্য থেকেও কিছু ভিন্নমত দেখা দিয়েছিল। তবে দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বাহিনীর বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর শক্ত অবস্থানের ফলে সেই সমালোচনা অনেকটাই থিতু হয়ে এসেছে।

আর্থিক সহায়তার জন্য হিজবুল্লাহ এখনও বড় আকারে ইরানের ওপর নির্ভরশীল। মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধে ইরানের অনেক শীর্ষ নেতা নিহত হলেও তেহরান সামরিক বা কূটনৈতিকভাবে আত্মসমর্পণ করবে বলে মনে হচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান হিজবুল্লাহকে তাদের অস্তিত্ব ও স্বার্থের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখে। ‘হিজবুল্লাহ : পলিটিক্যাল ইকোনমি অব দ্য পার্টি অব গড’-এর লেখক জোসেফ দাহের আলজাজিরাকে বলেন, হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলা মানে ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলা। ইরান তাদের ছেড়ে দেবে না।

সম্প্রতি খবর ছড়িয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে হিজবুল্লাহ ও হামাসসহ আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থায়ন বন্ধ করতে বলেছে। দাহেরের মতে, হিজবুল্লাহর ওপর ইরানের প্রভাব থাকলেও হিজবুল্লাহকে কেবল একটি ‘প্রক্সি’ বা ভাড়াটে গোষ্ঠী হিসেবে অভিহিত করা ভুল হবে। তবে উভয়পক্ষই পারস্পরিক স্বার্থ ভাগাভাগি করে এবং সমন্বয় বজায় রাখে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রতি ইরানের যে অবিশ্বাস রয়েছে, তাতে তাদের লেবানিজ মিত্রকে পরিত্যাগ করার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। অর্থনৈতিকভাবে সিরিয়ার আসাদ সরকারের পতন এই গোষ্ঠীর জন্য একটি বড় ক্ষতি ছিল, কারণ সিরিয়ার নতুন সরকার লেবাননে চোরাচালানের পথগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। তবে ক্ষমতার ভারসাম্যের এই পরিবর্তন হিজবুল্লাহর জন্য যথেষ্ট প্রতিকূল হলেও তা তাদের নিঃশেষ করতে পারেনি।

দাহেরের মতে, লেবানন রাষ্ট্রের মূল সমস্যা হলো তারা কেবল হিজবুল্লাহর অস্ত্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বৈধতা দাবি করতে পারবে না। হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরীণ জনসমর্থন কমাতে হলে, রাষ্ট্রকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বিকল্প গড়ে তুলতে হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিজবুল্লাহর মূল অর্থায়ন সবসময়ই ইরান থেকে এসেছে। ইরান যদি টিকে থাকতে পারে, তবে হিজবুল্লাহও টিকে থাকার পথ খুঁজে পাবে। কিন্তু সেই টিকে থাকা রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে দেখতে কেমন হবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে বিভিন্ন পর্যায়ে চলা আলোচনার ফলাফলের ওপর।



  বিষয়:   ইসরাইল  হিজবুল্লাহ  যুদ্ধবিরতি 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: