দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ বাড়লেও একই সঙ্গে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘কৃষি ও গ্রামীণ অর্থায়ন” শীর্ষক ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মাসিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই এক মিশ্র চিত্র। যেখানে একদিকে প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক ধারা, অন্যদিকে আর্থিক ঝুঁকির তীব্র সংকেত স্পষ্ট।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় সামান্য বেশি। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে মোট ২৭ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি। এই প্রবৃদ্ধি দেশের কৃষি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয় এবং উৎপাদনমুখী কার্যক্রমে ব্যাংকগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি মাসে ঋণ বিতরণ কমেছে। এ মাসে বিতরণ হয়েছে ৩ হাজার ১২০ কোটি টাকা, যা জানুয়ারির তুলনায় প্রায় ৬.৯ শতাংশ কম। যদিও গত বছরের ফেব্রুয়ারির তুলনায় এটি ৭.২১ শতাংশ বেশি, তবু মাসিক ভিত্তিতে এই পতন কিছুটা সতর্কবার্তা বহন করে। কৃষিঋণের খাতভিত্তিক বণ্টনেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে ফসল ও প্রাণিসম্পদ খাতে ঋণের অংশ বেড়ে যথাক্রমে ৪৯ শতাংশ ও ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে মৎস্য ও অন্যান্য খাতে ঋণের অংশ কমেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নীতিনির্ধারকদের কৌশলগত অগ্রাধিকারকে প্রতিফলিত করে।
ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে মোট আদায় হয়েছে ২ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭.৬ শতাংশ বেশি। জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে মোট আদায় দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৩.৭ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে।
তবে এই ইতিবাচক চিত্রের আড়ালে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শেষে কৃষিঋণের খেলাপি পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২৩.৯ শতাংশ বেশি। এই বিপুল বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ- রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দুর্বল ব্যবস্থাপনা, ঋণ শ্রেণিকরণের নতুন নীতিমালা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। যদিও ঋণ বিতরণ বাড়ানো হয়েছে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে, কিন্তু যথাযথ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা না থাকলে এটি উল্টো চাপ তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ গ্রামীণ উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি) এবং বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংকের কার্যক্রমেও মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। বিআরডিবির ঋণ বিতরণ কিছুটা কমলেও আদায়ে উন্নতি হয়েছে। অন্যদিকে সমবায় ব্যাংকের কার্যক্রম প্রায় স্থবির অবস্থায় রয়েছে, যা এই প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
রিফাইন্যান্স সুবিধার ক্ষেত্রেও তেমন সক্রিয়তা দেখা যায়নি। তবে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংককে (রাকাব) ১ হাজার কোটি টাকার রিফাইন্যান্স সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা কৃষিঋণ বিতরণ অব্যাহত রাখতে সহায়তা করবে বলে মনে করা হচ্ছে। গ্রামীণ অর্থায়নের ক্ষেত্রে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। তাদের ঋণ বিতরণ ও আদায় উভয়ই বেড়েছে এবং খেলাপি ঋণ কমেছে। এটি মাইক্রোফাইন্যান্স খাতের তুলনামূলক স্থিতিশীলতার প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে গ্রামীণ ব্যাংকসহ বড় এনজিওগুলো প্রায় ১৭ হাজার ২৩১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে এবং প্রায় ৩.৮ কোটি গ্রাহক এই সুবিধা পেয়েছে। তবে এখানেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে, যা নিম্নআয়ের মানুষের আর্থিক চাপের প্রতিফলন। বাংলাদেশ ব্যাংক পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা, প্রভিশন হার কমানো, এবং আগাম ঋণের ঝুঁকি পদ্ধতি চালু করা। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের জন্য বিশেষ সুবিধাও দেওয়া হয়েছে।
সার্বিকভাবে প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে দেখা যায় যে দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থায়ন খাত একদিকে প্রবৃদ্ধির ধারায় এগোচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে আর্থিক ঝুঁকি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হলো ঋণের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। যদি সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তা হলে এই খেলাপি ঋণের চাপ ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজনীয় সুষমনীতি, উন্নত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি খাতে টেকসই অর্থায়নের কৌশল গ্রহণে পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, দেশে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে কৃষিঋণ বিতরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য প্রতি বছর কৃষি ও পল্লিঋণ নীতিমালা ঘোষণা করা হয় এবং লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তিনি জানান, ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের অন্তত ২ শতাংশ কৃষি খাতে বিতরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কেউ অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকদের আর্থিক সহায়তা জোরদার করতেই এ বছরের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। নতুন নীতিমালায় প্রাণিসম্পদ খাতে ২০ শতাংশ বরাদ্দ, সেচ ও কৃষি যন্ত্রপাতি খাতে ২ শতাংশ বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে সিআইবি সার্ভিস চার্জ মওকুফ করা হয়েছে। নীতিমালায় কন্ট্রাক্ট ফার্মিং, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতা বৃদ্ধি এবং খিরা, কচুর লতি, বিটরুট, কালোজিরা, আদা, রসুন, হলুদ ও খেজুর-গুড়সহ নতুন কিছু ফসল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক উৎপাদন সম্ভাবনা অনুযায়ী ঋণ বিতরণের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
সময়ের আলো/আআ