আজকের পৃথিবীতে সম্পদ নামে যা কিছু হাজির আছে, তার সবটাকেই চুরি করা শ্রম মনে করেন এক ধারার সমাজতন্ত্রীরা। এদিকে মার্ক্সীয় ধারণায় পুঁজি মূলত মৃত শ্রম, যা জীবন্ত শ্রমকে শোষণ করে উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি করে। সেই অর্থে, আজকের পৃথিবীতে সম্পদ নামে যা কিছু সঞ্চিত, তার সবটাই শোষিত শ্রমের ফল। সে কারণেই সুবিখ্যাত রুশ সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কি মনে করেন, শ্রমই জীবনের অর্থ, উদ্দেশ্য, আর সব সংস্কৃতি ও সভ্যতার উৎস।
কিন্তু এই শ্রমের কারিগর যারা, সেই শ্রমিকদের বাস্তবতা কী? ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে যে অধিকারের লড়াই শুরু হয়েছিল, তা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?
সরেজমিন ঘুরে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন ধারার শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসলে অধিকাংশই শ্রম-অধিকার বিষয়ে সচেতন নন।
বাংলাদেশে শ্রমিকরা সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক- দুভাবে বিভক্ত। প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কিছু অধিকার পেতে দেখা গেলেও বেশি অবহেলিত হতে দেখা যায় অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের।
যেসব শ্রমিক কারখানা, অফিস, শিল্প প্রতিষ্ঠান বা নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তারা প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের মধ্যে সম্পৃক্ত।
দেশে প্রচলিত শ্রম আইনে তাদের অধিকারগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো– ন্যায্য মজুরি ও সময়মতো বেতন, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা (৮ ঘণ্টা) ও ওভারটাইম, সাপ্তাহিক ছুটি ও ছুটির সুবিধা (বার্ষিক, অসুস্থতা, মাতৃত্বকালীন ছুটি ১৬ সপ্তাহ), নিরাপদ কর্মপরিবেশ (কর্মস্থলে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ব্যবস্থা), চাকরির নিরাপত্তা (কারণ ছাড়া চাকরিচ্যুতি নিষিদ্ধ, চাকরি থেকে বাদ দিলে ক্ষতিপূরণ), ট্রেড ইউনিয়ন গঠন (শ্রমিকদের সংগঠন গঠন ও সদস্য হওয়ার অধিকার এবং অধিকার নিয়ে দরকষাকষির সুযোগ) ও সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা (গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ)।
এদিকে রিকশাচালক, গৃহকর্মী ও দিনমজুরসহ অন্য অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদেরও একই অধিকার স্বীকৃত হলেও বাস্তবে সেই অধিকার তাদের জন্য প্রায় অকল্পনীয়। আইনগতভাবে মজুরি নির্ধারণ থাকলেও বাস্তবে তা না মানা, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা না থাকা এবং অতিরিক্ত কাজের জন্য অতিরিক্ত পারিশ্রমিক অনিশ্চিত, সাপ্তাহিক ও বার্ষিক ছুটি অনেক ক্ষেত্রেই না থাকা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল এবং দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ অনিশ্চিত, যেকোনো সময় কাজ হারানোর ঝুঁকি এবং লিখিত চুক্তি না থাকা, ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ সীমিত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্রমিকরা সংগঠিত না থাকার সুযোগ তাদের উল্লেখযোগ্য সংকট।
এ ছাড়া শ্রমিকদের আরেকটি পক্ষ সর্বদা অবহেলিত হয় শুধু মধ্যস্ততাভোগীর হাত ধরে কাজে সম্পৃক্ত হওয়ায়। তারা অনেক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেও তাদের নিয়োগ চুক্তিভিত্তিক হওয়ায় যেন অধিকার আদায়ে সরব হতে পারে না, না মালিকের কাছে, না মধ্যস্ততাবাদীদের কাছে। ফলে এই দুই পক্ষের মাঝে পড়ে তাদের আরও বেশি অধিকারচ্যুত হতে হয় নিয়ম করেই। এ দিকে শ্রমিকদের অধিকার দেওয়া হচ্ছে কি না সেই বিষয়ে দেশে পর্যবেক্ষণে সংস্থা ও লোকবল থাকলেও তা একদমই অপ্রতুল।
শ্রম আদালতেও উপেক্ষিত খোদ শ্রমিকরা। হয়রানি কিংবা দীর্ঘসূত্রতার করণে অনেকে অধিকার না পেয়েও যেন যেতে আগ্রহী হন না এই আদালতে। এ ছাড়া আইনের তদারকি কিংবা দুর্বল প্রয়োগ তো আছেই।
এদিকে যেকোনো ছোটখাটো অপরাধে আইনের বিভিন্ন ধারায় শ্রমিকদের শাস্তি দেওয়া যায়, সেগুলো ব্যবহারে সচেতন থাকতে দেখা যায় মালিক পক্ষকে। তবে শ্রমিকের অধিকার আদায়ের ধারাগুলো সবসময়ই উপেক্ষিত। মালিকদের শাস্তি দেওয়ার ধারাগুলো মানা হয় না প্রায়।
রাজধানীর ইস্কাটন এলাকার সাগর বিশ্বাস নামের এক নির্মাণ শ্রমিক সময়ের আলোকে বলেন, আমরা উঁচু বিল্ডিংয়ে নিয়মিত ঝুঁকি নিয়েই কাজ করে থাকি। নামমাত্র সেফটির কিছু ব্যবস্থা থাকে। এত শ্রম দেওয়ার পর যখন কোনো শ্রমিক দুর্ঘটনাবশত মারা যায় তার পরিবারকে নানাভাবে ঘুরিয়ে আর ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় না। আমরা কোম্পানির না হয়ে ঠিকাদারের চুক্তিভিত্তিক হওয়ায় আমাদের দায় সবাই এড়িয়ে যেতে চায়। আমরা আমাদের অধিকার ভালো করে জানি না। কাজ করি আর দিন হিসাবে টাকা পাই, এভাবেই চলছে!
আসমা বেগম নামের এক গৃহকর্মী জানান, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করেন। ‘তারপরও বাসার আপা দুর্ব্যবহার করেন। এছাড়া সাপ্তাহিক কোনো ছুটিও নাই। শ্রমিক আইন বা অধিকার– ওইসব তো আমরা জানি না ভালো করে, এভাবেই জীবনটা কেটে যাচ্ছে।’
মতিউর রহমান নামের এসেট কোম্পানির এক নিরাপত্তা কর্মী বলেন, আমাদের প্রায় সব সুযোগ-সুবিধাই দেয় কোম্পানি। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী, ওভারটাইম ডিউটির টাকা স্বাভাবিক দিনের মজুরির ডাবল পাই না, স্বাভাবিক দিনের হিসাবেই দেয় তারা। আসলে আমরা জানিও না যে ওভারটাইমের বিল ডাবল দিতে বাধ্য কোম্পানি। এ ছাড়া আমরা কয়েকজন একসঙ্গে হয়ে যে আমাদের অধিকার নিয়ে কোনো বিষয়ে কথা বলব সেই সুযোগও আমাদের দেওয়া হয় না। অধিকার জেনে আর কী করব।
সাভার এলাকার মাহমুদা আক্তার নামের এক পোশাকশ্রমিক বলেন, আমরা আমাদের সব অধিকারের বিষয়ে জানি না। কিন্তু যেসব বিষয়ে জানি সেসবই মাঝেমধ্যে আদায় করতে পারি না। আমাদের ৮ ঘণ্টা ডিউটি করার কথা থাকলেও আমরা প্রতিনিয়তই তারও বেশি সময় কাজ করি, কিন্তু সেই অতিরিক্ত টাকা পাই না। এ ছাড়া যে টাকা বেতন দেয় তা দিয়ে তো আমরা একটু সচ্ছলভাবে চলতেও পারি না।
এফআর