শিশু-কিশোরদের ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া

অদিতি করিম

প্রযুক্তি

আমাদের শিশু কিশোররা বর্তমানে এক ভয়াবহ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাদের স্বাভাবিক বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সোশ্যাল

2026-05-03T16:08:04+00:00
2026-05-03T16:09:05+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
প্রযুক্তি
শিশু-কিশোরদের ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া
অদিতি করিম
প্রকাশ: রোববার, ৩ মে, ২০২৬, ৪:০৮ পিএম  আপডেট: ০৩.০৫.২০২৬ ৪:০৯ পিএম
১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও ট্যাব ব্যবহারের প্রবণতা বেশি। সংগৃহীত ছবি
আমাদের শিশু কিশোররা বর্তমানে এক ভয়াবহ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাদের স্বাভাবিক বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। বইয়ের পরিবর্তে আমরা তাদের হাতে তুলে দিচ্ছি স্মার্ট ডিভাইস। ফলে তারা মোবাইলের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে এবং অবাধে নানা ধরনের কনটেন্ট দেখছে। পড়াশোনার বদলে অধিকাংশ সময় তারা ডিভাইসের স্ক্রিনেই ডুবে থাকে। 

এর প্রভাব একদিকে যেমন তাদের মানসিক বিকাশে পড়ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে নানা শারীরিক সমস্যাও। কিশোর বয়সে পৌঁছে এই মোবাইলই তাদের মাদকের প্রতি আকৃষ্ট করছে এবং সহিংসতার দিকে প্রলুব্ধ করছে। অশ্লীল কনটেন্ট দেখে অনেক কিশোর ইভ টিজিংসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। একসময় ফেসবুক ও টিকটকের প্রভাবে তারা কিশোর গ্যাংয়ে পরিণত হচ্ছে। এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিপথে চলে যাচ্ছে, এবং সোশ্যাল মিডিয়া ধ্বংস করে দিচ্ছে তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ।

‘আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের হামলা’—এ ধরনের ঘটনা এখন প্রায়ই শোনা যায়। এমনকি এসব হামলায় কিশোর নিহত হওয়ার ঘটনাও নতুন নয়। প্রতিটি ঘটনায় দেখা যায় ৩০-৪০ জনের সংগঠিত কিশোর দল, কোথাও আবার শতাধিক কিশোর অংশ নিচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এত অল্প সময়ে তারা কীভাবে একত্রিত হয়? অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার। প্রায় প্রতিটি ঘটনার পেছনেই প্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে।

ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমুর মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রুপ তৈরি করে তারা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। ফলে মুহূর্তেই তথ্য ছড়িয়ে পড়ে এবং স্বল্প সময়ে তারা একত্রিত হয়ে হামলা, ভাঙচুর ও খুনের মতো অপরাধ সংঘটিত করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন অনেকটাই উন্মুক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে, যা শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য ক্ষতিকর। প্রতারণা, হয়রানি ও অনলাইন বুলিংয়ের ঝুঁকিও বাড়ছে। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমও বড় উদ্বেগের বিষয়। এসব অ্যাপ এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর মনোযোগ দীর্ঘ সময় ধরে রাখা যায়। ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ক্ষতি, ঘুমের অভাব এবং সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

এই সমস্যা শুধু বাংলাদেশের নয়; এটি বিশ্বব্যাপী শিশু কিশোরদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বিশ্বের অনেক দেশ শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বা সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের নিচে শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। যুক্তরাজ্যও এ ধরনের পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। ফ্রান্স, ডেনমার্কসহ বিভিন্ন দেশেও বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নরওয়ে বিদ্যমান নিয়ম যথেষ্ট কার্যকর নয় বলে স্বীকার করেছে এবং আরও কঠোর তদারকির পরিকল্পনা করছে। চীন ১৪ বছরের কম বয়সীদের জন্য প্রতিদিন ৪০ মিনিট স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ করেছে এবং রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউবের বিরুদ্ধে শিশুদের মানসিক ক্ষতির অভিযোগে মামলা হয়েছে। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, এসব প্ল্যাটফর্ম ইচ্ছাকৃতভাবে এমন অ্যালগরিদম ব্যবহার করে যা শিশুদের আসক্ত করে এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট ছড়ায়।

এসব বৈশ্বিক উদ্যোগ থেকে বোঝা যায়, এই সমস্যার পুরো দায় শুধুমাত্র অভিভাবকদের ওপর চাপানো ঠিক নয়। সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোকেও দায় নিতে হবে, কারণ তারা শিশুদের মনোযোগ ধরে রেখে বিপুল অর্থ আয় করছে।

একসময় মনে করা হতো, অভিভাবকদের নজরদারি থাকলেই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কিন্তু এখন অনেক দেশই বলছে, শুধু অভিভাবকের তদারকি যথেষ্ট নয়। এর মানে এই নয় যে পরিবার বা রাষ্ট্রের দায় নেই। বরং শিশুদের সুরক্ষায় পরিবার ও রাষ্ট্র উভয়েরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।


আমাদের দেশের অনেক অভিভাবক শিশুদের শান্ত রাখতে বা ঝামেলা এড়াতে তাদের হাতে মোবাইল তুলে দেন। এটি সাময়িকভাবে সুবিধাজনক মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি মারাত্মক আসক্তির জন্ম দেয়। এই ডিজিটাল জগৎ যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণও। উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা ও আসক্তি এখন সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি পরিবার কীভাবে ট্রিলিয়ন ডলারের অ্যালগরিদমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে—এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কঠোর পদক্ষেপ নিলেও বাংলাদেশ এখনো এ বিষয়ে অনেকটাই উদাসীন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ সোশ্যাল মিডিয়া। গবেষণায় দেখা গেছে, এর প্রভাবে বাল্যবিবাহ বেড়েছে এবং কিশোরীদের ওপর যৌন নিপীড়নের ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রেমের ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনাও বাড়ছে উদ্বেগজনকভাবে।

গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে সোশ্যাল মিডিয়া সংশ্লিষ্ট কারণে অন্তত ২০৯টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। শিশু কিশোরদের বই পড়ার অভ্যাস কমে গেছে, মনোযোগ কমে যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া তাদের জীবনীশক্তি ধীরে ধীরে কেড়ে নিচ্ছে। এই সমস্যাকে যত উপেক্ষা করা হবে, ততই তা বাড়বে। তাই এখনই সোশ্যাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা জরুরি, এবং এটিকে সরকারের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

লেখক : লেখক ও নাট্যকার


/ইউএমএইচ



  বিষয়:   সোশ্যাল মিডিয়া  শিশু-কিশোর 


Loading...
Loading...
প্রযুক্তি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: