আত্মীয়তার সম্পর্ক মানুষের জীবনের অন্যতম পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ বন্ধন। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে আমাদের দৈনন্দিন আচরণই এই সম্পর্ককে সুদৃঢ় বা ভঙ্গুর করে তোলে। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে এখনও এমন কিছু কুসংস্কার ও অনৈতিক আচরণ প্রচলিত রয়েছে যেগুলো আমরা অনেক সময় হাস্যরস, কৌতুক কিংবা সামাজিক রীতির আড়ালে লালন করে থাকি। কিন্তু গভীরভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায়, এগুলোর বেশিরভাগ স্পষ্ট জুলুম, অন্যায় এবং মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। বিশেষত আত্মীয়তার সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু আচরণ অত্যন্ত নিন্দনীয় হয়ে উঠেছে। যেমন কোনো বিয়েবাড়িতে গিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত খাওয়া, খাবারের অপচয় করা, কিংবা আয়োজকের প্রতি তুচ্ছতাচ্ছিল্য প্রকাশ করা। অনেক সময় দেখা যায়, কেউ কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে খাবারের দোষ খুঁজে বের করেন। লবণ কম, ঝাল বেশি, কোনো পদ ভালো হয়নি ইত্যাদি বলে সমালোচনা করতে থাকেন। এসব কথাবার্তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য থাকে আয়োজককে অপমান করা, তাকে হেয় করা কিংবা পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তোলা। এমনকি কখনো কখনো এসব আচরণ বড় ধরনের বিরোধ বা সম্পর্ক ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
একইভাবে আত্মীয়ের বাড়িতে মেহমান হয়ে গিয়ে তাদের সামর্থ্যরে কথা বিবেচনা না করে অসন্তোষ প্রকাশ করা, কিংবা খাবার পছন্দ না হওয়ায় ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়া- এসবও চরম অন্যায়। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে সহানুভূতি, সহমর্মিতা এবং পরস্পরের কল্যাণ কামনা করতে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর : ৫৫)। অর্থাৎ একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো অন্যের মঙ্গল কামনা করা, তার অকল্যাণ বা অপমানের কারণ হওয়া নয়।
আরেকটি কৌশলী কিন্তু অত্যন্ত নিন্দনীয় আচরণ হলো, কোনো বাড়িতে আগে থেকেই মেহমান থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পিতভাবে নতুন অতিথি পাঠানো, যাতে আয়োজনে সংকট সৃষ্টি হয় এবং গৃহকর্তা বিব্রত হন। এর মাধ্যমে মূলত একজন মানুষকে ছোট করা, তাকে লজ্জায় ফেলা এবং সম্পর্কের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করাই লক্ষ্য থাকে। এ ধরনের আচরণ নিঃসন্দেহে হিংসা ও বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ। ইসলাম হিংসা-বিদ্বেষকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে, কারণ এগুলো মানুষের নেক আমলকে ধ্বংস করে দেয়।
অনুরূপভাবে কাউকে জোরপূর্বক চা-স্টল বা হোটেলে নিয়ে গিয়ে অতিরিক্ত খাওয়া, যাতে তাকে আর্থিকভাবে বিপদে ফেলা যায়, এটাও এক ধরনের জুলুম। বাহ্যিকভাবে এটি মজা বা বন্ধুত্বের প্রকাশ মনে হলেও বাস্তবে এটি অন্যের সম্পদের প্রতি অন্যায় হস্তক্ষেপ এবং মানসিক কষ্ট দেওয়ার শামিল। ইসলামের দৃষ্টিতে কারও সম্মতি ছাড়া তার সম্পদ ভোগ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না, তবে পরস্পরের সম্মতিতে ব্যবসা করা বৈধ’ (সুরা নিসা, আয়াত : ২৯)। এই আয়াত আমাদের শেখায় যে, অন্যের সম্পদ গ্রহণের একমাত্র বৈধ উপায় হলো পারস্পরিক সম্মতি ও ন্যায্যতা। প্রতারণা, জোর-জবরদস্তি বা কৌশলের আশ্রয় নিয়ে কারও সম্পদ ভোগ করা সম্পূর্ণ হারাম।
খাবার ও আপ্যায়ন সম্পর্কেও ইসলামের শিক্ষা অত্যন্ত সুন্দর ও মার্জিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে আমরা এর উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোনো খাবারের দোষ ধরতেন না। যদি তা তাঁর পছন্দ হতো, তিনি খেতেন আর অপছন্দ হলে তা ছেড়ে দিতেন (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর : ৫৪০৯)। এই হাদিস আমাদের জন্য এক গভীর শিক্ষা বহন করে। যেখানে আমরা সামান্য বিষয়েও অভিযোগ ও সমালোচনায় লিপ্ত হই, সেখানে নবীজি (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন নীরবতা, সংযম এবং শিষ্টাচার।
বর্তমান সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি, খাবারের সামান্য ত্রুটিকে কেন্দ্র করে বিরোধ, মনোমালিন্য এমনকি সম্পর্কচ্ছেদ পর্যন্ত ঘটে। অথচ এই ক্ষুদ্র বিষয়গুলোর পেছনে মূলত কাজ করে অহংকার, হিংসা এবং আত্মকেন্দ্রিকতা। এগুলো শুধু পারিবারিক বন্ধনকে দুর্বল করে না, বরং মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। এ প্রসঙ্গে হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার রিজিক প্রশস্ত হওয়া এবং আয়ু বৃদ্ধি পাওয়া পছন্দ করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর : ২৫৫৭)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, আত্মীয়তার সম্পর্ক শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি দুনিয়াবি কল্যাণ ও আখেরাতের সাফল্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
অতএব, আমাদের উচিত আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে সর্বদা সম্মান, শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতার সঙ্গে আচরণ করা। কারও সামর্থ্যরে প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, তার সম্মান রক্ষা করা এবং তার সুখ-দুঃখে পাশে থাকা এসবই একজন আদর্শ মানুষের বৈশিষ্ট্য। আমরা যদি নিজেদের আচরণে সামান্য সংযম, সহানুভূতি ও মানবিকতা আনতে পারি, তবে অনেক অশান্তি ও বিভেদ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আত্মীয়তার সম্পর্ককে কল্যাণকর ও সুদৃঢ় রাখা আমাদের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার ও কূটকৌশল পরিহার করে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সদাচরণের মাধ্যমে আমরা এই সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে পারি। আমাদের প্রতিটি আচরণ হোক ইতিবাচক, প্রতিটি সম্পর্ক হোক সৌহার্দপূর্ণ— এই কামনাই হোক জীবনের মূল প্রতিজ্ঞা।
খতিব, ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, গাজীপুর