যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক অভিযানের পরও ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় সময়সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়নি। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, তেহরান চাইলে এখনো মাত্র ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যেই একটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ এবং ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-র মাধ্যমে ইরানের সামরিক অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ার দাবি করা হলেও, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির মূল ভিত্তিগুলো এখনো অক্ষত রয়েছে। এর আগে ধারণা করা হয়েছিল যে, যৌথ হামলায় এই সময়সীমা অন্তত এক বছর পিছিয়ে যাবে, কিন্তু বর্তমান মূল্যায়ন সেই আশাকে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ বলে প্রমাণ করছে।
মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইরানের প্রচলিত সামরিক স্থাপনা, নেতৃত্ব এবং প্রতিরক্ষা শিল্পকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, যার ফলে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলো বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছে। তেহরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি সম্ভবত এমন গভীর ভূগর্ভস্থ টানেলে সরিয়ে নিয়েছে, যেখানে প্রচলিত মার্কিন অস্ত্র পৌঁছানো সম্ভব নয়।
সাবেক গোয়েন্দা বিশ্লেষক এরিক ব্রিউয়ারের মতে, ইরানের কাছে এখনো প্রয়োজনীয় সব পারমাণবিক উপাদান সংরক্ষিত রয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারছে না, যা দিয়ে অন্তত ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পারমাণবিক এই অচলাবস্থা নিরসনে গত ৭ এপ্রিল থেকে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও দুই পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। এরই মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস দাবি করেছেন, মার্কিন অভিযানে ইরানের প্রতিরক্ষা ঢাল ভেঙে দেওয়া হয়েছে, তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা দমাতে হলে তাদের ইউরেনিয়াম মজুদ পুরোপুরি ধ্বংস করা বা সরিয়ে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। এই পরিস্থিতিতে ইস্পাহানের ভূগর্ভস্থ টানেলে সংরক্ষিত ইউরেনিয়াম উদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ স্থল অভিযানের পরিকল্পনাও বিবেচনা করছে।
ইরান দীর্ঘকাল ধরে দাবি করে আসছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না, তবে ইসরায়েল এবং কিছু বিশেষজ্ঞের দাবি তেহরান গোপনে এই কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও ইসরায়েলের অভিযানে ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ পারমাণবিক বিজ্ঞানী নিহত হয়েছেন, যা প্রযুক্তিগত দক্ষতায় কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, কিন্তু পারমাণবিক জ্ঞানকে পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি।
বর্তমান বাস্তবতায় তেহরানের সক্ষমতা নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করা বিশ্বের শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্যও একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শান্তি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না এলে মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি এবং জ্বালানি অস্থিরতা আরও বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: রয়টার্স
সময়ের আলো/টিএইচ