অনলাইন জুয়ার ফাঁদে সারা দেশ

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

জাতীয়

মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে অনলাইন জুয়ায় আসক্তদের সংখ্যা। নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন অনেকে। পরিবারগুলোয় দেখা দিচ্ছে অশান্তি, অনেকে হয়ে পড়ছেন ঋণগ্রস্ত।

2026-05-08T03:46:07+00:00
2026-05-08T03:46:07+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
অনলাইন জুয়ার ফাঁদে সারা দেশ
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬, ৩:৪৬ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে অনলাইন জুয়ায় আসক্তদের সংখ্যা। নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন অনেকে। পরিবারগুলোয় দেখা দিচ্ছে অশান্তি, অনেকে হয়ে পড়ছেন ঋণগ্রস্ত। জুয়ার টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে অহরহ। আদালত ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। 

তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) পক্ষ থেকেও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। আবার বিভিন্ন সময়ে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করা হলেও জুয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত কোম্পানিগুলো থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

দিন দিন অনলাইন জুয়াড়ির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সারা দেশের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষ, বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা জড়িয়ে পড়ছে এই জুয়ার ফাঁদে। গত কয়েক বছরে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন অনলাইনমাধ্যমে ক্যাসিনোর বিজ্ঞাপন বেড়ে যাওয়ায় তরুণদের মধ্যে এটি আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

অনলাইন জুয়া বর্তমানে মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা সহজে অর্থ উপার্জনের আশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। এর ফলে অনেকেই আর্থিকভাবে দেউলিয়া ও নিঃস্ব হচ্ছে এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, পারিবারিক সহিংসতা এমনকি আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে।

গত ২৫ এপ্রিল অনলাইন জুয়ার টাকা জোগাড় করতে ঢাকার ধামরাইয়ে ঘরে ঢুকে নাহিদা আক্তার (১৬) নামে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীকে গলাকেটে হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় প্রতিবেশী শামীম ওরফে স্বপনকে (৩৫) আটক করা হয়। স্বপনকে জিজ্ঞাসাবাদের সূত্রে ধামরাই থানার ওসি নাজমুল হুদা খান বলেন, স্বপন অনলাইন জুয়ায় আসক্ত ছিলেন এবং ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ওই টাকা জোগাড় করতে তিনি নাহিদাকে হত্যা করে তার গলায় ও কানে থাকা স্বর্ণের গহনা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যান।

গত বছরের অক্টোবর মাসে ময়মনসিংহের ত্রিশালে অনলাইন জুয়া খেলার টাকা জোগাড় করতে না পেরে বাবা-মাকে খুন করে ঘরের মেঝেতে পুঁতে রাখে রাজু নামে এক ব্যক্তি। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে বিভিন্ন ব্যক্তির হোয়াটসঅ্যাপ আইডি হ্যাক করে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গতকাল রিহাদ হাসান (২৩) নামে এক তরুণকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা যায়, সাইবার জুয়া কোম্পানিগুলো মোবাইল ব্যাংকিংসহ ব্যাংক, ফাইন্যান্সিয়াল হাউস, পেমেন্ট গেটওয়ে, এমএফএস/পিএসও/পিএসপি ইত্যাদির সঙ্গে ইন্টিগ্রেটেড। মাসের পর মাস নির্দিষ্ট কিছু পুলের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে ইরেগুলার, একমুখী এবং অস্বাভাবিক ট্রানজেকশন হচ্ছে। একটি পুল নম্বরে টাকা গিয়ে তা নির্দিষ্ট নম্বরে ক্যাশ আউট হয়ে বাইরে পাচার হচ্ছে। কিন্তু তারপরও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায় না।

সম্প্রতি অন্যান্য অপরাধের পাশাপাশি অনলাইন জুয়া চক্রের বিরুদ্ধে বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান জোরদার করার কথা বলেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার। তিনি জানান, গত মে মাস থেকে এ অভিযান শুরু হয়েছে। তবে গত পাঁচ দিনে এ বিষয়ে বড় কোনো অভিযান বা গ্রেফতারের খবর পাওয়া যায়নি। 

গত বছরের এপ্রিল মাসে অনলাইন জুয়া/বেটিংয়ের ওয়েবসাইট ও অ্যাপ চিহ্নিত করা, কার্যক্রম নির্ণয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেয়। তানজিম রাফিদ নামে রাজধানীর এক বাসিন্দা গত বছরের ১৬ এপ্রিল রিটটি করেন।

বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সূত্রে জানা যায়, গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি হওয়া সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী অনলাইন জুয়া ও বেটিংয়ের বিরুদ্ধে সারা দেশে অভিযান শুরু হয়। ওই সময় এক হাজারেরও বেশি মোবাইল ব্যাংকিং (এমএফএস) এজেন্টকে অনলাইন জুয়ার লেনদেনে জড়িত থাকার প্রমাণসহ শনাক্ত করে সিআইডি। এসব এজেন্টের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়। তবে এরপর প্রায় এক বছর ধরে দৃশ্যমান আর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

বিটিআরসির পক্ষ থেকে দৃশ্যমান বেটিং (জুয়া) সাইট বন্ধের কথা বলা হলেও এখনও প্রকাশ্যে বেশ কিছু বহুল ব্যবহৃত বেটিং সাইট সহজেই পাওয়া যায়। এর মধ্যে ওয়ানএক্সবেট, মেলবেট, লিনবেট, সেফিয়ারবেট, বেট অন গেম, মেগাপারি, পিন-আপ বেট, বাজিওকে, ফেয়ারপ্লে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। নিম্ন আয়ের মানুষের একটি অংশ এখন দিনের বড় সময় অনলাইনে বাজি ধরতে ব্যস্ত থাকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিটিআরসির সংশ্লিষ্ট শাখার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বেটিং ও পর্ন সাইটগুলো স্ব-উদ্যোগেই বিটিআরসি থেকে বন্ধ করা হয়। কিন্তু এসব সাইট সংশ্লিষ্টরা নাম পরিবর্তন করে বা সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে আবার ফিরে আসে। কেউ কেউ নাম পরিবর্তনসহ নানা কৌশলে আবারও ফিরে আসে।

বিটিআরসির সিনিয়র সহকারী পরিচালক (মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড পাবলিকেশন উইং) মো. আব্দুল হালিম বলেন, সিআইডি ও ডিবির সুপারিশের ভিত্তিতেই বেটিং ও পর্ন সাইটগুলো বন্ধ করা হয়। এ ধরনের সাইট নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। 

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান বলেন, অনলাইন বেটিং সাইট বিষয়ে সিআইডির বিশেষায়িত ইউনিট নিয়মিত মনিটরিং করছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে এসব সাইটের বিষয়ে বিটিআরসিকে অবহিত করা হয়। তিনি নাগরিকদের অনলাইন জুয়া ও বেটিং থেকে বিরত থাকতে এবং পরিবার, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করার আহ্বান জানান।

দেশে অনলাইন জুয়ার বিস্তারে উদ্বেগ প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২৪ সালে এক বিবৃতিতে বলেছিল, তরুণসমাজকে এর কবল থেকে রক্ষা করতে অবিলম্বে অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপন বন্ধ করতে হবে। সংস্থাটি আরও বলেছে, সর্বোচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও অনলাইন জুয়া বন্ধে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই।

সময়ের আলো/জেডি 



  বিষয়:   অনলাইন  জুয়া  ফাঁদ  আসক্ত 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: