পারস্য উপসাগরের উত্তাল ঢেউ আর মুহুর্মুহু ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জনের মধ্যে গত ১০ সপ্তাহ ধরে আটকে আছেন ভারতীয় নাবিক অনীশের। রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়া শাত-আল-আরব জলসীমায় একটি পণ্যবাহী জাহাজে আটকা পড়ে তিনি এখন এক ভয়াবহ যুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে তিনি এখানে পৌঁছেছিলেন। এরপর থেকেই শুরু হয় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণের এক দীর্ঘ অধ্যায়। খবর আলজাজিরার
অনীশ (ছদ্মনাম) টেলিফোনে তার আর্তনাদ তুলে ধরে বলেন, ‘ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোন আমাদের মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে যুদ্ধ দেখছি। আমাদের মানসিক অবস্থা এখন বিধ্বস্ত।’
অনীশ জানান, তার অনেক সহকর্মী স্থলপথে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আর্মেনিয়া হয়ে দেশে ফেরার চেষ্টা করলেও অধিকাংশ নাবিক আটকা পড়েছেন পাওনা বেতনের আশায়। নিয়োগকারী এজেন্টরা বেতন দিচ্ছে না, আবার ইরানি পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় ডলার মিলছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে আলু, পেঁয়াজ আর শুকনো রুটি খেয়েই দিনাতিপাত করছেন তারা। দুবাই-ভিত্তিক এজেন্টের কাছ থেকে গত ৯ মাস ধরে কোনো বেতন পাননি অনীশ। আগামী ২০ মে তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু সমুদ্র থেকে তিনি আদৌ সুস্থ শরীরে ফিরতে পারবেন কি না, তা নিয়ে খোদ তার পরিবারও এখন শঙ্কিত। অনেক জাহাজে সুপেয় পানি ও খাদ্য ফুরিয়ে আসার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার ফলে অনীশের মতো প্রায় ২০ হাজার নাবিক বর্তমানে সেখানে আটকা পড়েছেন। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। গত ৭ এপ্রিল একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলেও বাস্তবে জলসীমায় উত্তেজনা বিন্দুমাত্র কমেনি। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করেছে। অন্যদিকে তেহরানের অভিযোগ, ওয়াশিংটন বেসামরিক এলাকায় বিমান হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থা (আইএমও) এই পরিস্থিতিকে ‘নজিরবিহীন মানবিক সংকট’ হিসেবে অভিহিত করেছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীতে ইরান অপরিকল্পিতভাবে মাইন পেতে রেখেছে, যার ফলে জাহাজ চলাচলের করিডোরগুলো এখন মৃত্যুফাঁদ। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী কোনো নাবিককে এক বছরের বেশি জাহাজে রাখা নিষিদ্ধ হলেও যুদ্ধের কারণে কর্মী বদল (ক্রু রোটেশন) সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে আছে।
আইটিএফ-এর সাধারণ সম্পাদক স্টিফেন কটন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটি রীতিমতো পাগলামি। এরা সাধারণ শ্রমিক, অথচ তাদের ওপর জলদস্যুদের মতো সামরিক চড়াও হওয়া হচ্ছে।
/কহু