জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্ব যে পুলিশের তারাই আজ বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত। শারীরিক ও মানসিক চাপে থাকায় তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনেও। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এবং প্রশাসনিক রদবদলের ফলে এই চাপ আরও বেড়েছে। নানাবিধ এসব সমস্যাকে সামনে রেখেই আগামী ১০ মে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬।
পুলিশের সমস্যার বিষয়ে গত কয়েক দিন বিভিন্ন স্তরের পুলিশ সদস্যের বক্তব্য জানতে চাইলে সবার কাছ থেকেই উঠে আসে হতাশার গল্প। তবে একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে নিজেদের দৃঢ় অবস্থানের কথাও ব্যক্ত করেন তারা।
পুলিশ সদস্যরা জানান, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পদোন্নতি ও ছুটি না পাওয়া, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রূঢ় আচরণ, পারিবারিক ঝামেলা, পরিবার থেকে দূরে থাকা ও কাজের ধরনসহ নানা কারণে সহকর্মীদের অনেকেই হতাশাগ্রস্ত হচ্ছেন। সেই সঙ্গে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের নেতিবাচক মনোভাব বাহিনীটির সদস্যদের আরও বেশি বিপর্যস্ত করে তোলে। যদিও সেই অবস্থা থেকে তারা অনেকটাই বের হয়ে আসছেন বলে জানা যায়।
ডিএমপির শাহ আলী থানার একজন উপ-পরিদর্শক বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে টানা ডিউটি করতে হচ্ছে অনেককে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ ও মবের মত ঘটনাগুলো মোকাবিলা করতে হয়েছে। এর পরপরই করতে হয়েছে নির্বাচনি ডিউটি। এ ছাড়া নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থাকতে হচ্ছে বদলি আতঙ্কে। সব মিলিয়ে কোনো ছুটি কিংবা বিশ্রাম ছাড়াই অনেককে টানা ডিউটি করতে হয়। সে সঙ্গে ৫ আগস্টের পর এক ধরনের আতঙ্কের ভেতর দিয়ে ডিউটি করছেন পুলিশ সদস্যরা।
আরও পড়ুন
মাঠপর্যায়ে পুলিশের বর্তমান অবস্থা জানাতে গিয়ে ডিএমপির মিরপুর বিভাগের একাধিক থানার কয়েকজন এএসআই ও এসআই বলেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন ভঙ্গের প্রবণতা পূর্বের তুলনায় বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে পুলিশের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থান নেওয়া যায় না। মানুষের ভেতর পুলিশ সম্পর্কে যে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়েছে তা কাটাতে পুলিশকে এখন অনেক বেশি ধৈর্যশীলতার পরিচয় দিতে হচ্ছে, যা অনেক সময় নিজেদের ওপরই মানসিক চাপ বৃদ্ধি করছে। কিন্তু তারপরও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভেতর থেকে এক ধরনের শাক্তি ও শান্তি অনুভবের কথাও বলেছেন তারা।
পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার এক পুলিশ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারের অন্য কর্মচারীরা ছুটি ভোগ করে ওভার টাইম ভাতা পান, সেখানে দৈনিক ১৬ ঘণ্টা কখনো কখনো ২৪ ঘণ্টা ডিউটি, মানসিক চাপ, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেও পুলিশ সদস্যরা কেন ঝুঁকি কিংবা ওভার টাইম ভাতা পাবেন না? পুলিশের উন্নত জীবন ব্যবস্থা, রাজনৈতিক চাপ মুক্ত কর্ম পরিবেশ এবং মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পুলিশের প্রধান সমস্যাগুলো কী কী- এরকম প্রশ্নে প্রায় সব পুলিশ সদস্যই মেলে ধরেন তাদের সমস্যার ঝাঁপি। এর মধ্যে প্রায় সবাই যে বিষয়গুলোর কথা বেশি উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, পরিবারকে সময় দিতে না পারা, বাসস্থান, পদোন্নতি ও সার্বক্ষণিকভাবে মানসিক চাপের কথা বলেছেন।
মাঠ কর্মকর্তাদের কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই। দিনে কখনো ২৪ ঘণ্টাও দায়িত্ব পালন করতে হয়। সাপ্তাহিক ছুটি বা উৎসবের ছুটি পাওয়া তাদের জন্য ‘বিশেষ সৌভাগ্যের’ বিষয়। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে সময় দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে কনস্টেবল ও উপ-পরিদর্শকদের পরিবারকে পুলিশ লাইনে বা থানার সঙ্গে রাখার সুযোগ খুব কম, ফলে কর্মস্থল থেকে দূরে রাখতে হচ্ছে পরিবারকে। দীর্ঘ ডিউটি এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে অনেক পুলিশ সদস্য মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন। এ ধরনের পুলিশ সদস্যদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জরুরি।
কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তারা বলেন, পুলিশের বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ে যারা কাজ করেন তাদের যে ধরনের চাপে থাকতে হয় তা সব সময়ই চ্যালেঞ্জের। মানুষকে সেবা দিতে গিয়ে অনেক সময় অনেক পুলিশ সদস্য নিজেরাই মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আবার মাঠ পর্যায়ে কর্মরতদের মধ্যে সুযোগ-সুবিধা না পাওয়া বা ব্যক্তিগত যে মতামত তৈরি হয়, তার প্রভাবেও অনেকেই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এ ছাড়া পারিবারিক ও সামাজিক নানা সংকট তো থাকেই। এসব কিছুর ফলে মাঝেমধ্যেই পুলিশ সদস্যদের আত্মহননের মতো ঘটনা ঘটে। কিন্তু এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য যে কাউন্সেলিং প্রয়োজন সেই ব্যবস্থা নেই পুলিশ বাহিনীতে।
মাঠ পর্যায়ের পুলিশের সদস্যদের মতো উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারাও থকেন মানসিক চাপে।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দফতরের একজন অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক বলেন, আমাদের মতো কর্মকর্তা যারা আছেন তাদের কাজের সময়-অসময় বলে কিছু নেই। দিন-রাত সবসময় সজাগ ও সতর্ক থাকতে হয়। রাষ্ট্রীয় বা সরকারি বিভিন্ন মিটিং ও অভিযান মনিটরিংসহ পুরো বাহিনী দেখভাল করতে গিয়ে পরিবারকে ব্যাপকভাবে বঞ্চিত করি আমরা। পুলিশের প্রতিটি সদস্যই অমানবিক পরিশ্রম করে থাকেন। তারপরও একজন কনস্টেবল বা সিপাহি অথবা নিম্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা তার ডিউটি শেষ করে অন্তত কিছুটা সময় শান্তিতে ঘুমাতে পারেন। কিন্তু আমাদের মতো কর্মকর্তাদের নিশ্চিন্তে ঘুমানোর কোনো সুযোগই নেই। ঘুমের মধ্যেও টেনশন কাজ করে, কখন কোথায় কী ঘটছে!
পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুলিশের অসন্তুষ্টির অন্যতম বিষয় হচ্ছে পদোন্নতি, পদায়ন ও বদলি।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক নিয়মে পদায়ন এবং বদলির বিষয়টি নিশ্চিত না হলে স্বাভাবিক কাজকর্মে স্থবিরতা চলে আসে। এটা থেকে বাদ পড়ছে না পুলিশও। সেবাপ্রত্যাশীদের প্রকৃত সেবার বদলে উল্টো হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বাহিনীতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ অনেক যোগ্য কর্মকর্তা এতে বঞ্চিত হচ্ছেন।
জানা যায়, এসআই পদে যোগদানের চার বছর পরে পরিদর্শক পদে পরীক্ষার জন্য যোগ্যতা অর্জন করেন তারা। পরীক্ষা পাসের পর শূন্যপদ-সাপেক্ষে করা হয় পদায়ন। পরবর্তী সময়ে পরিদর্শক থেকে এএসপি পদোন্নতি পেতেই শুভঙ্করের ফাঁকিতে পড়তে হয় নন-ক্যাডার অফিসারদের। ৩০ শতাংশ পদে এএসপি হিসেবে পদোন্নতি পেতে লেগে যায় ১৬ থেকে ১৭ বছর। চাকরি জীবনের শেষ বেলায় কোনোমতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের র্যাঙ্ক পড়তে পারেন ভাগ্যবান কেউ কেউ।
সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশে সরাসরি চার হাজার এসআই নিয়োগের সিদ্ধান্তের ফলে এএসআই ও কনস্টেবলদের মধ্যে পদোন্নতি বঞ্চনার আশঙ্কা ও তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে পুলিশ রেগুলেশন ১৯৪৩ অনুযায়ী এসআই পদের ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ এবং ৫০ শতাংশ বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণের বিধান রয়েছে। একযোগে ৪ হাজার এসআই সরাসরি নিয়োগের ফলে পদ শূন্য না থাকায় এএসআই ও কনস্টেবলদের পদোন্নতি স্থবির হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আবার নবম গ্রেডের পরিদর্শক থেকে পদোন্নতি পেয়ে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হওয়ার পরও একই গ্রেডে থেকে যাচ্ছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
র্যাঙ্ক ব্যাজ জটিলতায়ও ক্ষোভ বিরাজ করছে পুলিশ বাহিনীতে। পুলিশের একজন পরিদর্শক প্রথম শ্রেণির হলেও তিনি একটি পিপস পরিধান করেন। অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হলেও তিনি পরিধান করেন তিনটি পিপস। আবার কারা অধিদফতরের ডেপুটি জেলার দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তার শোল্ডারে থাকে দুটি পিপস। উপজেলা আনসার ও ভিডিপি অফিসার দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা শোল্ডারে পরেন একটি পিপস।
এসব বিষয় সমাধানের জন্য পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়ে এলেও এর সুরাহা হচ্ছে না।
পেশাগত কাজের অংশ হিসেবেই মৃতদেহ উদ্ধার, মামলা তদন্ত ও আসামি গ্রেফতারের মতো কাজগুলো করতে হয় পুলিশকে। অনেক সময় এ জন্য প্রত্যন্ত এলাকা এমনকি অন্য জেলাতেও যেতে হয়। কিন্তু এ জন্য পুলিশের বরাদ্দ থাকে সামান্যই। আবার সেই সামান্য বরাদ্দকৃত অর্থের বিল প্রাপ্তিতেও থাকে দীর্ঘসূত্রতা।
পুলিশের আবাসন সংকটের বিষয়টিও বেশ পুরোনো। ঢাকায় কর্মরত পুলিশ সদস্যের মধ্যে আবাসন সুবিধা পান মাত্র সাড়ে ৯ শতাংশ। বাকি সাড়ে ৯০ শতাংশ পুলিশ সদস্য ও তাদের পরিবার ভাড়া বাসায় থাকেন। আছে যানবাহনের সংকটও।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রাজধানীসহ দেশের অন্য থানাগুলোর চিত্রও একই। থানায় দায়িত্বরত পুলিশের সংখ্যার তুলনায় গাড়ির সংখ্যা একেবারে সীমিত। প্রায় সময়ই নিজেদের খরচে ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয় তাদের।
ডিএমপির আটটি বিভাগে ৫০টি থানার পাশাপাশি রয়েছে ৫৩টি পুলিশ ফাঁড়ি। এসব ফাঁড়িগুলোও নানা সমস্যায় জর্জরিত। বিশ্রাম ও খাওয়ার পর্যাপ্ত সুবিধা নেই অধিকাংশ ফাঁড়িতেই। অপরিচ্ছন্ন এসব ফাঁড়িতে দীর্ঘ ডিউটি শেষে ভালোভাবে বিশ্রাম নিতে পারেন না পুলিশ সদস্যরা। আবার আবাসিক এলাকায় অবস্থিত ফাঁড়িতে দায়িত্বরতরা থাকেন আতঙ্কে। মব সন্ত্রাস ও বহিরাগতদের হামলার আশঙ্কায় সব সময় অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে চিন্তিত থাকার কথা বলেছেন তারা। ফাঁড়িগুলোর দীর্ঘদিনের এসব সমস্যা কর্তৃপক্ষের নজরে এনেও সমাধান মিলছে না বলে অভিযোগ পুলিশ সদস্যদের।
এএডি/