দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসবাদ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিত থাকলেও সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে পাকিস্তান এক অপরিহার্য ‘মিডল পাওয়ার’ বা মধ্যম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ইসলামাবাদের বর্তমান কূটনৈতিক তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, দেশটি নিজের অর্থনীতির সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অত্যন্ত সক্রিয় ও প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান চরম উত্তেজনার সময়ে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে পাকিস্তান তার কৌশলগত গুরুত্ব বিশ্ববাসীকে জানান দিয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়ে সব পক্ষকে আস্থায় নেওয়ার এই সক্ষমতাই দেশটিকে বর্তমান মেরুকৃত বিশ্বে অনন্য করে তুলেছে।
পাকিস্তানের এই ক্রমবর্ধমান প্রাসঙ্গিকতার মূল উৎস হলো দেশটির ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ বা বহুমুখী জোটবদ্ধ থাকার নীতি। ইসলামাবাদ একদিকে যেমন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে ইরান ও উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর সঙ্গেও ভারসাম্যপূর্ণ যোগাযোগ রক্ষা করছে।
ইরানের জন্য পাকিস্তান ছিল এক বাস্তবসম্মত মধ্যস্থতাকারী, কারণ দেশ দুটির মধ্যে ভৌগোলিক নৈকট্য ও ঐতিহাসিক বন্ধন বিদ্যমান। আবার কয়েক দশকের সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতার কারণে ওয়াশিংটনের কাছেও ইসলামাবাদের গুরুত্ব অপরিসীম। এই নমনীয়তার ফলে কোনো উগ্র আদর্শিক বৈরিতা ছাড়াই ইসলামাবাদ তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনার পথ সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে, যা বর্তমানে অনেক বড় শক্তির পক্ষেও অসম্ভব।
অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক সাফল্যের পেছনে রয়েছে দেশটিকে একটি সক্ষম নিরাপত্তা শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা। গত বছরের মে মাসে ভারতের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের সময় পাকিস্তান তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও উত্তেজনা মোকাবিলার সামর্থ্য প্রমাণ করেছে। এটি বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে পাকিস্তানের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে, যারা দেশটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা প্রদানকারী রাষ্ট্র হিসেবে দেখে।
এছাড়া সামরিক-বেসামরিক সমন্বয় বৃদ্ধি এবং একটি সুসংহত পররাষ্ট্রনীতি ইসলামাবাদকে তার প্রভাব কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে। পাকিস্তান এখন নিজেকে আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে তুলে ধরছে, যা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে দেশটির রাজনৈতিক বৈধতা আরও বাড়িয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থান পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্বের আরেকটি বড় কারণ। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারত মহাসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে করাচি ও গোয়াদর বন্দরের গুরুত্ব প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
এই অবস্থান দেশটিকে ভবিষ্যতে এশিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং আফ্রিকার বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এই ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে টেকসই করতে হলে পাকিস্তানকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, সুশাসনের অভাব এবং অর্থনৈতিক অসঙ্গতি দূর করতে হবে। সন্ত্রাসবাদ ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা দেশটির দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিশ্বব্যবস্থা বর্তমানে এমন এক যুগে প্রবেশ করছে যেখানে প্রভাব কেবল পরাশক্তিদের হাতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং বিবাদমান পক্ষগুলোর মাঝে সেতুবন্ধন করতে পারে এমন দেশগুলোর হাতেও ক্ষমতার চাবিকাঠি যাচ্ছে।
পাকিস্তানের জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো তার এই নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতাকে একটি স্থিতিশীল ও টেকসই কূটনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করা। বৈশ্বিক মেরুকরণের এই সন্ধিক্ষণে পাকিস্তানের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি একটি বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা দেশটিকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম ‘প্রয়োজনীয়’ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
সূত্র: এশিয়া টাইমস
সময়ের আলো/টিএইচ