বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা রয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, ইউক্রেন কিংবা সাম্প্রতিক ইরান সংকট প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেশটিকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগের মুখে পড়তে হয়েছে। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য সমর্থন নিয়েও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনা চলছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের কথা বলেছিলেন। নির্বাচনি প্রচারণায় তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ জড়ানোর জন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে ক্ষমতায় এলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ করার প্রতিশ্রুতিও দেন।
কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি এখনো স্পষ্ট নয়। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ চলছেই এবং ট্রাম্পের মধ্যস্থতার উদ্যোগও কার্যকর ফল দেখাতে পারেনি। একইভাবে গাজা সংকট সমাধান এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তার ঘোষিত উদ্যোগও সফল হয়নি।
এর মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। এই সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়। ফলে যুদ্ধের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এখন এক ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংকটে পড়েছেন। একদিকে তিনি যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ করতে পারছেন না, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও চাপ বাড়ছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং যুদ্ধবিরোধী জনমতও জোরালো হচ্ছে। বিভিন্ন জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
২০২৫ সালের ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এরপর ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার কিছু তথ্য তার এই দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ওমানে ইরানের সঙ্গে আলোচনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন করে হামলা শুরু হলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ কয়েকজন শীর্ষ জেনারেল নিহত হন বলে দাবি করা হয়।
এরপর ট্রাম্প প্রশাসন জানায়, ইরানের সরকার পরিবর্তন এবং তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করাই এই অভিযানের লক্ষ্য। যদিও দীর্ঘ সংঘাতের পরও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। পরে ১৫ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়, যা এখনো ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।
এই সময়ের মধ্যে ট্রাম্প একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান সমঝোতায় না এলে দেশটিকে “ধ্বংস করে দেওয়া হবে”। অন্যদিকে ইরানও তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চললেও পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে এখনো সমঝোতা হয়নি। দুই পক্ষই একে অপরকে দোষারোপ করছে। হরমুজ প্রণালিতে মাঝেমধ্যেই উত্তেজনা ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
চলতি বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই নির্বাচনে ট্রাম্প কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারেন। এমনকি ভবিষ্যতে তিনি অভিশংসনের মুখেও পড়তে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে।
এ অবস্থায় ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করা অথবা কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো। তবে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করতে কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন হতে পারে, যা পাওয়া কঠিন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে ইরানও বড় ধরনের ছাড় দিতে রাজি নয়।
সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান যে প্রস্তাব দিয়েছে তা “অগ্রহণযোগ্য”। তিনি আরও বলেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি এখন “লাইফ সাপোর্টে” রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে লাতিন আমেরিকাতেও ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থান নিয়ে আলোচনা চলছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বিশেষ অভিযানে আটক করার অভিযোগ ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। এরপর কিউবার বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নেয় ওয়াশিংটন।
শুধু প্রতিপক্ষ নয়, দীর্ঘদিনের মিত্রদের সঙ্গেও ট্রাম্পের সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য বানানোর মন্তব্য এবং গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্ক তৈরি করে। পরে ইউরোপীয় নেতাদের চাপের মুখে এসব বিষয়ে কিছুটা পিছু হটেন তিনি।
এছাড়া ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম বড় বাণিজ্যযুদ্ধ শুরুর জন্যও দায়ী করা হয়। চীন ও রাশিয়ার পাশাপাশি মিত্র দেশগুলোর ওপরও অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেন তিনি। যদিও পরে মার্কিন আদালত তার কিছু শুল্কনীতি বাতিল করে দেয়।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন প্রশ্ন উঠছে, শান্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা ট্রাম্প কি ক্রমেই আরও বেশি সংঘাত ও যুদ্ধের রাজনীতির মধ্যে জড়িয়ে পড়ছেন?
আরবিএন