হরমুজ প্রণালিতে এক ট্যাঙ্কারে ইরানের গুলি বর্ষণকে কেন্দ্র করে ফের উত্তাল হয়ে উঠেছে উপসাগরীয় অঞ্চল। ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় মার্কিন বাহিনীর হামলার জবাবে বাহরাইন ও কুয়েতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে তেহরান। অন্যদিকে মার্কিন প্রক্সি বাহিনী ইসরাইলের সেনারাও আগ্রাসন চালাচ্ছে লেবাননে।
সবমিলে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। নতুন হামলা-পাল্টা হামলা কয়েক দিন আগে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে চরম পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে উভয় পক্ষই একে অপরকে চুক্তি ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত করছে এবং সংঘাত আরও বড় আকার নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংঘাতের মূল কারণ হলো হরমুজ প্রণালির শাসন ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বিমত। পারস্য উপসাগরের এই সংকীর্ণ নৌপথটি বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় পঞ্চমাংশ পরিবহন করে। যদিও আন্তর্জাতিকভাবে একে মুক্ত ও সাধারণ নৌপথ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তবে এর ভূখণ্ডীয় সীমা ইরান ও ওমানের অধীনে পড়ে।
গত ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, আগামী ৬০ দিনের জন্য প্রণালিটির নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে ইরানের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এরপর ইরান ও ওমান যৌথভাবে এ ব্যবস্থাপনা চালাবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বহুজাতিক নৌ সংস্থা গত শনিবার ওমান উপকূলের পাশ দিয়ে নতুন ও পৃথক একটি নৌরুট চালু করার ঘোষণা দেয়। এই পদক্ষেপকে ইরান সরাসরি চুক্তি লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি স্পষ্ট করে বলেছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বর্তমান ব্যবস্থাপনার বাইরে কোনো নতুন বা পৃথক ব্যবস্থা চালু করার যেকোনো প্রচেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে, প্রণালি পুনরায় চালু করার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করবে এবং উত্তেজনা বাড়াবে। তিনি জানিয়েছেন, আগামী ৩০ দিন পর্যন্ত প্রণালিটি সম্পূর্ণরূপে ইরানের তদারকিতে থাকবে।
নতুন রুট চালু করার পর থেকেই উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। গত বৃহস্পতিবার ওমান উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, এই হামলার পেছনে ইরান জড়িত। এর জবাবে শনিবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত নজরদারি কেন্দ্র, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা স্থাপনা ও ড্রোন মজুদাগারে বিমান হামলা চালায়।
এরপরই রোববার ইরানের আধা-সামরিক বাহিনী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) পাল্টা হামলা চালায়। তারা বাহরাইন ও কুয়েতের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে এবং কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। অন্যদিকে বাহরাইনের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি আট তলা আবাসিক ভবনের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে ভবনের ওপরের তলা ধ্বংস হয়ে গেলেও কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।
বাহরাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলাকে ‘পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক আগ্রাসন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ইরানের হুঁশিয়ারি স্পষ্ট। তারা বলছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা অব্যাহত রাখে, তবে আমরা যুদ্ধের অবসানের জন্য চলমান আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ করে দেব।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছেন। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ইরান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। এমন হলে একসময় আমরা সংযম হারিয়ে সামরিকভাবে কাজটি শেষ করতে বাধ্য হতে পারি। তেমনটা হলে বিশ্বের মানচিত্র থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের অস্তিত্বই মুছে যাবে।
অন্যদিকে ইরানের নেতৃত্বও পিছু হটার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেন মহেবি বলেছেন, আমরা আগেই জানতাম যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী। তাদের যেকোনো পদক্ষেপের জবাব আমরা দিয়েছি এবং ভবিষ্যতে আরও কঠোরভাবে দেব। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহসেন রেজাঈ আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, চুক্তির কোনো ধারা লঙ্ঘনের জবাব হবে দ্রুত ও চূড়ান্ত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সমঝোতা স্মারকের ব্যাখ্যাকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্ব। তেহরান মনে করছে, নির্ধারিত রুটের বাইরে চলা জাহাজগুলো সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে, তাই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তাদের অধিকার। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের যুক্তি, প্রণালিটি সবার জন্য উন্মুক্ত এবং ইরানের একক নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করছে। হরমুজ প্রণালির সংকটের সঙ্গে লেবাননের পরিস্থিতিও জটিল হয়ে উঠছে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল ও লেবানন সরকারের মধ্যে একটি কাঠামোগত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যেখানে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ ও দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ চুক্তিটি প্রত্যাখ্যান করেছে।
রোববারও সংঘাত পুনরায় ছড়িয়ে পড়ে। হিজবুল্লাহর গুলিতে একজন ইসরাইলি সৈন্য নিহত হয়, এর জবাবে ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননে বিমান হামলা চালায়। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এখন তিন পক্ষ- ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও লেবানন নিয়ে একটি নতুন ‘সংঘাত নিয়ন্ত্রণ ইউনিট’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়।
হরমুজ প্রণালিতে সংঘাতের প্রভাব বিশ্বজুড়ে পড়ছে। যদিও এখন জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। রোববার পর্যন্ত প্রায় ৮৯টি জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যা দৈনিক গড় ১৩৮টির তুলনায় অনেক কম। তবে অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
ফেব্রুয়ারিতে সংঘাত শুরু হওয়ার পর প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। সম্প্রতি চুক্তির পর দাম কিছুটা স্থিতিশীল হলেও নতুন উত্তেজনার কারণে আবার অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হবে এবং মূল্যস্ফীতি নতুন করে বাড়তে পারে।
সবমিলে বর্তমান পরিস্থিতি খুবই ভঙ্গুর। উভয় পক্ষের কঠোর অবস্থানের কারণে সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী কয়েক দিনের ঘটনাই নির্ধারণ করবে যে শান্তি ফিরবে নাকি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে বড় আকারের যুদ্ধ শুরু হবে।
সময়ের আলো/জেডি