গো-খাদ্যের চড়া দাম, দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য আর অনিশ্চিত বাজারের মাঝেই কুরবানির প্রস্তুতি সারছে গাইবান্ধা জেলার পৌনে দুই লাখ পশুর খামারি এবং প্রান্তিক কৃষক ও চর-দ্বীপচরের মানুষ।
ভোরের আলো ফোটার আগেই সাজ্জাদ রহমান রাসেলের দিন শুরু হয় গোয়ালঘরে। খড় দেওয়া, পানি দেওয়া, গায়ে হাত বুলানো- মাসের পর মাস ধরে যত্নে বড় করা পশুগুলোর দিকে তাকালে মায়া লাগে।
কিন্তু ঈদ যত এগিয়ে আসছে, সেই মায়ার চেয়ে বড় হয়ে উঠছে একটাই প্রশ্ন- হাটে গিয়ে কি পোষাবে? রাসেলের কথায়, খৈল-ভুসির দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ওষুধের খরচও বেড়েছে।
এত কষ্ট করে পাললাম, হাটে যদি দালালরা দাম না দেয় তা হলে লোকসান গুনতে হবে। কথাগুলো বলতে বলতে একটু থামলেন গাইবান্ধার এই খামারি। শুধু সাজ্জাদ নন, এবার ঈদুল আজহার আগে গাইবান্ধার হাজারো খামারি ও ক্রেতার মুখে একই উদ্বেগ।
একদিকে জেলায় পশুর জোগান চাহিদার চেয়ে বেশি, অন্যদিকে দালাল-ফড়িয়ার দাপট আর বাড়তি উৎপাদন খরচের খড়গে দুপক্ষই কোণঠাসা।
পৌনে দুই লাখ পশু, তবু চিন্তা কাটছে না : জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের হিসাব বলছে, এ বছর গাইবান্ধার সাতটি উপজেলায় কুরবানিযোগ্য মোট পশু প্রস্তুত হয়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৯৮৩টি। জেলার নিজস্ব চাহিদা ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০টি অর্থাৎ উদ্বৃত্ত থাকবে ৩৯ হাজার ৪৮৩টি পশু যা দেশের অন্যান্য জেলায় সরবরাহ করা সম্ভব। সংখ্যার হিসাবে গাইবান্ধা এগিয়ে আছে নিঃসন্দেহে।
জেলার ১৭ হাজার ৩৩১টি খামার এবং প্রান্তিক কৃষক ও ১৬৫টি চর-দ্বীপচরের মানুষের ঘরে এখন মজুদ রয়েছে ৩৭ হাজার ৬৬০টি ষাঁড়, ৩ হাজার ৫৭২টি বলদ, ২২ হাজার ৪৬০টি গাভি, ১৫৩টি মহিষ, ১ লাখ ২ হাজার ৭৮৮টি ছাগল এবং ১০ হাজার ২৮৯টি ভেড়া।
এ ছাড়াও রয়েছে বিপুলসংখ্যক দুম্বা। কিন্তু সংখ্যার এই স্ফীতি খামারিদের মুখে হাসি আনতে পারছে না। কারণ বাজার এখনও নিজস্ব নিয়মে চলে- আর সেই নিয়মে খামারির চেয়ে দালালের ক্ষমতাই বেশি।
হাট ৩২টি, তবু বাজার এখনও জমেনি : কুরবানির পশু বেচাকেনার জন্য এবার জেলায় মোট ৩২টি হাট নির্ধারণ করা হয়েছে- ১৯টি স্থায়ী, ১৩টি অস্থায়ী। পাশাপাশি সুযোগ রাখা হয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও খামার পর্যায়ে সরাসরি বেচাকেনার।
সরেজমিন জেলার বেশ কয়েকটি হাটে গিয়ে দেখা গেছে, বেশিরভাগ হাটেই নিরাপত্তা বেষ্টনী আর অবকাঠামো তৈরির কাজ চলছে। পশু আসছে কম, ক্রেতাও নেই তেমন। হাটের চা দোকানে বসে এক ইজারাদার বললেন, আর পাঁচ-সাত দিন পরেই দেখবেন ঠাসাঠাসি ভিড়। এখন শুধু বাজার গরম হচ্ছে।
দালালের খড়গে কাটা পড়ে দুপক্ষই : গাইবান্ধার পশুর হাটে প্রতি বছর ঈদের আগে একটি অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে- দালাল ও ফড়িয়াদের চক্র। এদের কাজের ধরন সহজ কিন্তু কার্যকর। ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে ঢুকে পড়া, দাম নিয়ে কানে কানে কথা বলা এবং লেনদেনের একটা অংশ নিজেদের পকেটে ঢোকানো।
এই চক্রের কারণে বছরের পর বছর ধরে কোণঠাসা খামারি ও ক্রেতারা। দালালের দৌরাত্ম্যে খামারিরা যেমন সঠিক দাম পায় না, তেমনি বাড়তি দামে পশু কিনতে হয় ক্রেতাদের।
আলাপকালে স্থানীয় একজন ক্রেতা ক্ষোভ মেশানো গলায় বললেন, বিক্রেতাকে বলে দাম কম, ক্রেতাকে বলে দাম বেশি। মাঝখান থেকে নিজেরা নেয়। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কিছুটা বিকল্প হলেও প্রান্তিক খামারি ও বয়স্ক ক্রেতাদের কাছে সেই সুযোগ এখনও সীমিত।
প্রশাসন বলছে, নজর থাকবে : গাইবান্ধা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এবার হাটগুলোতে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিশেষ মেডিকেল টিম মোতায়েন করা হবে। রোগাক্রান্ত বা দুর্বল পশু যেন কুরবানির হাটে না আসে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি থাকবে।
একই সঙ্গে জাল নোট শনাক্তে ব্যবস্থা এবং দালাল চক্র নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, চাহিদার তুলনায় পশু বেশি আছে, সরবরাহে কোনো সমস্যা হবে না।
আমরা চাই ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই যেন সুষ্ঠু পরিবেশে লেনদেন করতে পারেন। তবে স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের এই আশ্বাস কতটুকু মাঠে কার্যকর হবে সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ন্যায্য দামই আসল প্রশ্ন : ঈদুল আজহা মানে শুধু পশু বেচাকেনার উৎসব নয়, এটি লাখো খামারির সারা বছরের পরিশ্রমের হিসাব মেলানোর মৌসুম। গাইবান্ধায় পশু আছে, হাট আছে, প্রশাসনিক পরিকল্পনাও আছে।
কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় খামারি সাজ্জাদের প্রশ্নটি এখনও ঝুলে থাকে বাতাসে খরচ উঠবে তো?
এই একটি প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করে দেবে এবারের কুরবানির ঈদ গাইবান্ধার খামারিদের জন্য আনন্দের না কষ্টের।