লাখাইছড়া এলাকায় টিলার ওপর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ছবি : সময়ের আলো
মৌলভীবাজারের টিলা-পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষের জীবনে বর্ষা যেন আতঙ্কের আরেক নাম। টানা বৃষ্টি হলেই টিলা ধসের শঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটে হাজারও পরিবারের। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় টিলার পাদদেশ ও ঢালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে জেলার কোথাও না কোথাও টিলা ধসের ঘটনা ঘটছে। এতে প্রাণহানির পাশাপাশি ভেঙে পড়ছে বসতঘর, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৪ বছরে মৌলভীবাজারে টিলা ও পাহাড় ধসে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। এর মধ্যে ২০২২ সালেই একাধিক টিলা ধসের ঘটনায় প্রাণ হারান অন্তত ৮ জন। এরপরও টিলা কাটা বন্ধ হয়নি। বরং জেলার বিভিন্ন এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে টিলা কেটে মাটি বিক্রি, বসতবাড়ি নির্মাণ, রিসোর্ট ও বাগান স্থাপনের অভিযোগ রয়েছে। এতে টিলার স্বাভাবিক গঠন ও মাটির স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে বর্ষা মৌসুমে ধসের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
সম্প্রতি টানা বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন স্থানে নতুন করে টিলা ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সমতলে থাকার জায়গা নেই বলে টিলাতেই ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন অনেক বাসিন্দা। ছবি : সময়ের আলো
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, একদিকে ভারী বর্ষণ, অন্যদিকে অপরিকল্পিতভাবে টিলা কাটা- দুইয়ে মিলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জেলার কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, জুড়ী, বড়লেখা, রাজনগর, কুলাউড়া ও সদর উপজেলায় বিস্তৃত টিলা ও পাহাড়ি এলাকা রয়েছে। এসব এলাকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। তাদের অধিকাংশেরই নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সামর্থ্য নেই। ফলে, প্রতি বর্ষায় ধসের আশঙ্কা নিয়েই তাদের বসবাস করতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী একটি চক্র আইন ও বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করে টিলা কেটে মাটি বিক্রি করছে। বসতবাড়ি, রিসোর্ট, বাগান ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে এসব মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। কোথাও আবার টিলা কেটে সমতল করা হচ্ছে। এতে টিলার প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মাটির ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে, ভারী বৃষ্টিপাত হলেই ধসের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গলের রাধানগর, মহাজিরাবাদ এবং কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের কালেঙ্গা এলাকায় টিলা ও সড়ক কেটে এবং ছড়া দখল করে বসতবাড়ি, রিসোর্ট ও দোকান নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, সারা বছরই জেলার বিভিন্ন স্থানে কোনো না কোনোভাবে টিলা কাটা হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে টিলা ধসের ঘটনা ঘটলে প্রশাসনের তৎপরতা দেখা গেলেও, বছরের অন্যান্য সময়ে নিয়মিত নজরদারি না থাকায় টিলা কাটা পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না।
স্থানীয়রা আরও জানান, বর্ষার শুরুতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে সতর্ক করা হয়। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ আশ্রয় বা স্থায়ী পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় সতর্কবার্তা তাদের জীবনযাত্রায় খুব একটা পরিবর্তন আনতে পারছে না।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালিঘাট ইউনিয়নের লাখাইছড়া ও আশপাশের টিলা এলাকায় বসবাসকারী সবিতা তাঁতী, শশী তাঁতী, ফ্রান্সিস কন্দ ও জয়ন্তী তাঁতী জানান, প্রতি বছর বর্ষা এলেই টিলা ধসের আতঙ্কে থাকতে হয়। ভারী বৃষ্টিতে অনেক সময় ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু সমতলে তাদের থাকার মতো জায়গা নেই। তাই বাধ্য হয়েই ঝুঁকি নিয়ে টিলায় বসবাস করছেন তারা।
তারা জানান, তিন বছর আগে তাদের পাশের টিলা ধসে ৪ জন মারা গেছেন। এখন তাদের টিলার মাটিও দুর্বল হয়ে পড়েছে। পরিবার নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২২ সালের ১৯ আগস্ট শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালিঘাট ইউনিয়নের লাখাইছড়া চা বাগানে টিলা ধসে ৪ নারী শ্রমিকের মৃত্যু হয়। একই বছর কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা এলাকায় পাহাড় ধসে একই গ্রামের ৩ শিশুর মৃত্যু হয়। ওই বছরই চাতলাপুর চা বাগানে টিলা ধসে আরও এক নারীর মৃত্যু হয়।
২০২৪ সালে কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর বনবিটের কালেঞ্জি খাসিয়া পুঞ্জিতে কাজ করার সময় টিলা ধসে এক নারীর মৃত্যু হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গৃহস্থালির কাজে ব্যবহারের জন্য টিলার মাটি সংগ্রহ করতে গিয়ে মাটিচাপা পড়ে এক স্কুলছাত্রী মারা যায়। এ ঘটনায় আরও ৩ জন আহত হন।
এ ছাড়া, টিলা কাটতে গিয়ে এবং পাহাড়ি এলাকায় বসতঘর ধসে বিভিন্ন সময়ে আরও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয়দের দাবি, টিলা ধসের অনেক ঘটনা দুর্গম এলাকায় হওয়ায় সেগুলোর সব তথ্য সরকারি হিসাব বা সংবাদমাধ্যমে আসে না। ফলে, প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদের সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, ‘যারা টিলা কাটছে, তারা পরিবেশ ও প্রতিবেশ- দুটিরই ক্ষতি করছে। টিলা কাটা মানে প্রকৃতিকে ধ্বংস করা। এতে মাটির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, ভারী বৃষ্টিতে ধসের ঝুঁকি বাড়ছে এবং মানুষের প্রাণহানি ঘটছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘টিলা কাটা বন্ধে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব টিলা রক্ষা করা সবার দায়িত্ব।’
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মাঈদুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া টিলা কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। টিলা কাটার অভিযোগ পাওয়া গেলে পরিবেশ অধিদফতরের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনা করা হয়।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের সতর্ক করা হয়েছে।’
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, ‘টিলা ধসে প্রাণহানিসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাহাড়ি জনপদে সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রতিটি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
স্থানীয়দের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে দ্রুত নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের পাশাপাশি অবৈধ ও অপরিকল্পিত টিলা কাটা বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একইসঙ্গে টিলা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে আগামী বর্ষাগুলোতেও প্রাণহানি ও পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি থেকেই যাবে।