দেশে বর্ষা মানেই প্রকৃতির উচ্ছ্বাস, নদীর প্রাণ ফিরে পাওয়া, কৃষিজমিতে নতুন সম্ভাবনার জন্ম। কিন্তু এই বর্ষাই যখন অতি ভারী বৃষ্টিপাত, পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রকৃতির সৌন্দর্য মুহূর্তেই রূপ নেয় শোকের প্রতীকে।
প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে একই ধরনের দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি ঘটে। পাহাড়ধসে মানুষ মারা যায়, বাড়িঘর ধ্বংস হয়, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, হাজারো পরিবার নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটায়। অথচ এই বিপর্যয়ের অধিকাংশই কোনো আকস্মিক বা অপ্রত্যাশিত ঘটনা নয়; বরং বহু আগে থেকেই পূর্বাভাসযোগ্য এবং প্রতিরোধযোগ্য।
আবহাওয়া অধিদফতর কয়েক দিন আগেই জানিয়ে দেয় কোথাও ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা জানে। স্থানীয় প্রশাসনের কাছেও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়, বসতি এবং মানুষের তালিকা থাকে। তারপরও প্রতি বছর প্রাণহানি ঘটে। প্রশ্ন হলো- সমস্যা কোথায়? প্রকৃতির কাছে মানুষের পরাজয়, নাকি আমাদের প্রস্তুতির ব্যর্থতা?
দুর্যোগকে পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও দুর্যোগজনিত প্রাণহানি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আগাম সতর্কতা, বাধ্যতামূলক সরিয়ে নেওয়া, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে একই ধরনের
প্রাকৃতিক ঝুঁকি সফলভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও সেই সক্ষমতা গড়ে তোলা অসম্ভব নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
সম্প্রতি ভারী বর্ষণে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসে শিশু ও নারীসহ কয়েকজনের মৃত্যু আবারও আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। একই সময়ে পার্বত্য অঞ্চলেও প্রাণহানির খবর এসেছে। অসংখ্য মানুষ ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়েছে। কোথাও পাহাড় ভেঙে পড়েছে, কোথাও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, কোথাও জলাবদ্ধতায় নগরজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি বৃহত্তর পরিবেশগত সংকটের বহিঃপ্রকাশ।
বাংলাদেশের পাহাড়গুলো প্রাকৃতিকভাবে খুবই সংবেদনশীল। এগুলোর মাটি শক্ত পাথরের নয়; বরং নরম ও ক্ষয়প্রবণ। ফলে টানা বৃষ্টির সময় পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ে। যদি সেই পাহাড়ের গাছ কেটে ফেলা হয়, মাটি খুঁড়ে বসতি তৈরি করা হয় কিংবা ঢালের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করা হয়, তা হলে পাহাড়ধসের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ বৃষ্টি শুধু শেষ ধাক্কাটি দেয়; বিপর্যয়ের ভিত্তি তৈরি হয় বছরের পর বছর ধরে চলা অব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ ধ্বংসের মাধ্যমে।
পাহাড় কাটা বাংলাদেশে নতুন কোনো সমস্যা নয়। আবাসন, ইটভাটা, সড়ক নির্মাণ, অবৈধ দখল কিংবা বাণিজ্যিক স্বার্থে বছরের পর বছর পাহাড় কেটে সমতল করা হয়েছে। অনেক জায়গায় বন উজাড় করে ফলদ ও বাণিজ্যিক গাছ লাগানো হয়েছে। এতে পাহাড়ের স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়েছে, মাটির বন্ধন দুর্বল হয়েছে এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা কমেছে। ফলে অল্প সময়ের প্রবল বর্ষণও ভয়াবহ ভূমিধসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এ বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে দরিদ্র জনগোষ্ঠী। কারণ নিরাপদ আবাসনের সুযোগ না থাকায় তারা পাহাড়ের পাদদেশে কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে বসবাস করতে বাধ্য হয়। তারা জানে বিপদ আছে, তবু প্রতিদিনের জীবিকার তাগিদে সরে যেতে পারে না। তাদের কাছে বেঁচে থাকার চেয়ে বড় বাস্তবতা হলো মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই। তাই পাহাড়ধসে নিহত ব্যক্তিদের কেবল দুর্ভাগ্যের শিকার হিসেবে দেখলে ভুল হবে; তারা উন্নয়নবৈষম্য ও সামাজিক অবহেলারও শিকার।
রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের পরিস্থিতি আরও জটিল। অল্প জায়গায় বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস, পাহাড় কেটে তৈরি আশ্রয়, সীমিত অবকাঠামো এবং প্রাকৃতিক বন ধ্বংস- সব মিলিয়ে সেখানে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সরকারের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও এত বিশাল জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন। তবে কঠিন বলেই দায়িত্ব কমে যায় না। বরং আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর করা এখন সময়ের দাবি।
আমাদের দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই সতর্কবার্তা প্রচারে জোর দেওয়া হয়, কিন্তু সেই সতর্কবার্তা বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয় না। মাইকিং করা হয়, লিফলেট বিতরণ করা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা দেওয়া হয়, কিন্তু অনেক মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ছেড়ে যায় না। কারণ তাদের বিকল্প আশ্রয় নেই, সম্পদ হারানোর ভয় আছে কিংবা তারা বিপদের মাত্রা বিশ্বাস করে না। এ অবস্থায় প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু সতর্ক করা নয়; প্রয়োজনে আইনগত ক্ষমতা ব্যবহার করে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া।
২০০৭ ও ২০১৭ সালের ভয়াবহ পাহাড়ধসের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে স্পষ্ট শিক্ষা রেখে গেছে। সেই সময় শত শত প্রাণহানি হয়েছিল। তদন্ত কমিটি হয়েছিল, সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল, বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছর পরই সেসব সুপারিশের অধিকাংশই হারিয়ে যায় প্রশাসনিক ফাইলের ভিড়ে। ফলে ইতিহাস আবারও নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। আবহাওয়া অধিদফতর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর, বন বিভাগ, স্থানীয় সরকার, জেলা প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন- সবাইকে একই পরিকল্পনার আওতায় কাজ করতে হবে। তথ্যের আদান-প্রদান, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং মাঠপর্যায়ে সমন্বিত অভিযান প্রাণহানি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। শুধু জরুরি ব্যবস্থা নিলেই চলবে না; দীর্ঘমেয়াদে পাহাড় সংরক্ষণকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।
অবৈধ পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। বন উজাড় বন্ধ করতে হবে। দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণ বাড়াতে হবে। পাহাড়ি এলাকায় নির্মাণকাজের জন্য কঠোর পরিবেশগত মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। যারা পরিবেশ ধ্বংস করে মুনাফা অর্জন করছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে এই সংকট কখনোই কমবে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এই বাস্তবতাকে আরও জটিল করে তুলছে। গবেষণা বলছে, ভবিষ্যতে অল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়তে পারে। অর্থাৎ অতীতের অভিজ্ঞতা দিয়ে ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলা করা যাবে না। এখন প্রয়োজন জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো, আধুনিক পূর্বাভাস প্রযুক্তি এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে দুর্যোগ প্রস্তুতি গড়ে তোলা।
পাহাড়ধসের সঙ্গে নগর পরিকল্পনার সম্পর্কও গভীর। চট্টগ্রামের মতো শহরে জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ, খাল দখল এবং পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ একই সমস্যার অংশ। প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করলে তার মূল্য মানুষকেই দিতে হয়। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশগত ভারসাম্যকে অগ্রাধিকার না দিলে ভবিষ্যতের ক্ষতি আরও ভয়াবহ হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং স্থানীয় সংগঠনগুলোকেও সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। পাহাড়ধসের ঝুঁকি, নিরাপদ আচরণ, জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র এবং উদ্ধার কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। শুধু দুর্যোগের সময় নয়, সারা বছরই সচেতনতা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত জ্ঞানকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষ প্রকৃতির আচরণ সম্পর্কে মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তাদের অভিজ্ঞতা আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করলে দুর্যোগ মোকাবিলা আরও কার্যকর হতে পারে।
বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশ্বে অনেক ক্ষেত্রেই প্রশংসিত। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা, আগাম সতর্কতা এবং আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি। সেই অভিজ্ঞতা পাহাড়ধস মোকাবিলায়ও কাজে লাগানো সম্ভব। প্রয়োজন শুধু একই গুরুত্ব, একই পরিকল্পনা এবং একই রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী বর্ষায় আমরা আবারও শোকের সংবাদ পড়ব, নাকি সফল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার গল্প শুনব। পাহাড়কে রক্ষা করা মানে শুধু গাছ সংরক্ষণ নয়; এটি মানুষের জীবন, জীবিকা, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা। তাই এখনই সময় প্রতিক্রিয়াশীল নয়, প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের। কারণ দুর্যোগের পরে শোক প্রকাশ করা সহজ, কিন্তু দুর্যোগের আগে জীবন বাঁচানোই একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয়।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/এসএকে