বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে শিল্পপতিরা ঋণ নিয়ে থাকেন। তারা এই ঋণ নিয়ে স্থাপন করেন শিল্প প্রতিষ্ঠান, ফলে মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণখেলাপির যে অবস্থা, তাতে করে কর্মসংস্থান তো দূরের কথা, তাদের কারণে দেশের সার্বিক অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। বিতরণ করা মোট ঋণের মধ্যে ৩২.২৬ শতাংশ বা ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা বর্তমানে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ঋণের সুদের হার এবং মূল্যস্ফীতি থাকা সত্ত্বেও দেশের ব্যাংকগুলোতে ব্যক্তিগত বা কনজ্যুমার লোনের পরিমাণ ১ লাখ ৫৮ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। দেশের বেসরকারি খাতের ঋণ ১৭ দশমিক ৩১ ট্রিলিয়ন টাকায় উন্নীত হয়েছে। গত ৮ জুলাই এ বিষয়ে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে বক্তারা জানান, দেশের ব্যাংক খাতে বাণিজ্য-সংক্রান্ত ঋণ গড়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। আর উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই হার ৮০ শতাংশেরও বেশি।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট আয়োজিত এক সেমিনারে এ তথ্য তুলে ধরে বক্তারা বলেন, আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের আড়ালে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রাজস্ব আয় ও বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
গবেষক ড. আহসান হাবীব বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে ৮৫৩টি সন্দেহজনক লেনদেনের মধ্যে ৬১৯টিতেই বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ধরনের অর্থ পাচার ব্যাংক খাতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে যথেষ্ট তথ্যের আদান-প্রদান করা হয় না। এ জন্য এ খাতে অর্থ পাচার রোধে সমস্যা হচ্ছে। বাণিজ্য-সংশ্লিষ্ট ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো ইতিমধ্যেই চাপে পড়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান কমছে। যেসব ব্যাংকে সামগ্রিকভাবে খেলাপি ঋণ বেশি ওইসব ব্যাংকেই বাণিজ্য খাতে ঋণ বেশি রয়েছে।
ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ তারল্যপ্রবাহ বাড়ার কথা, সেই সঙ্গে সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান বাড়বে উৎপাদন। অথচ ব্যাংক ঋণের টাকা সুকৌশলে পাচার হওয়ায় দেশে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। সেই সঙ্গে বাণিজ্যিক অনেক ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে। দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থার মনিটরিং পদ্ধতিটা খুবই দুর্বল। আর এই সুযোগে অসৎ কিছু ব্যক্তি ব্যাংক মালিক হয়ে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে। আর এদের সঙ্গে জড়িত দেশের রাজনৈতিক নেতা ও বড় বড় আমলারা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে মোট ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকা (অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন এই তথ্য)। সংসদে দেওয়া তথ্যে অর্থমন্ত্রী জানান, সংসদ সদস্য এবং তাদের মালিকানাধীন বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলো থেকে এই বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়েছে। মোট ঋণের একটি বড় অংশই বর্তমানে খেলাপি হয়ে পড়েছে। তবে খেলাপি ঋণের একটি বিশেষ দিক উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী জানান, আদালতের নির্দেশনার কারণে ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকা বর্তমানে নিয়মিত বা অ-খেলাপি হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছে।
অর্থাৎ আইনি মারপ্যাঁচে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ খেলাপি তালিকার অন্তর্ভুক্ত দেখানো সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে দেশের তফসিলি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। এই অঙ্কটি দেশের মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায় যে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের পরেই খেলাপি ঋণের হারে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। তবে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ ও ঋণের টাকা বিদেশ পাচার হয়েছে। যা যুদ্ধে টাকা নষ্ট হওয়ার চেয়ে ভয়ংকর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগের সবশেষ মে মাসের হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিমালার প্রভাবে এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের মে মাসের শেষে কৃষি খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। গত মে মাসের শেষে তা ১৯২ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ১৩০ কোটি টাকায়। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষি খাতের ভূমিকা অনেক। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান ১১ দশমিক ৭১ শতাংশ।
আর দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪৬ শতাংশ কৃষি খাতের। অথচ এই কৃষি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ঋণ বিতরণের ব্যবস্থা নাই। যতটুকু আছে তাও কৃষি খাতের নামে বড় বড় কোম্পানি নিয়ে যায়। আর তারা হয় ঋণখেলাপি। কৃষি খাতে ঋণখেলাপির সিংহ ভাগই বড় ধরনের কৃষি শিল্প মালিকরা।
একজন মাঝারি কৃষক দশ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ছোট আকৃতির একটি কৃষি খামার করতে গেলে তাকে পোহাতে হয় নানা ভোগান্তি। বিশেষ করে ঋণের কাগজপত্র জোগাড় করাটা একটা মহাযজ্ঞে পরিণত হয়। ঋণের এই কাগজপত্রের মধ্যে রয়েছে তিন পুরুষের জমির মালিকানার বিবরণ, হালসন নাগাদ খাজনা, খারিজ, খামারের ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংকে নানা প্রকারের অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়, যে অ্যাকাউন্ট তার প্রয়োজন হয় না। তারপরও কৃষককে জমি মর্টগেজ দিতে হয়।
এতসব কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর ব্যাংকে দশ-পনেরোবার না গেলে কৃষক ঋণ পায় না। অপরদিকে কথিত বড় উদ্যোক্তরা (খেলাপিরা) বিনা জামানতে কোটি কোটি টাকা ঋণ পেয়ে যায়।
পিকেএসএফের ২৫ সালের একটি রিপোর্টে দেখা যায়, ক্ষুদ্র কৃষকদের অর্থায়ন করেছে পিকেএসএফ। এই অর্থায়নটা হলো পিকেএসএফের দেওয়া ঋণ। পিকেএসএফের এই ঋণের মূল সুবিধা ভোগ করে এনজিওরা। এরা এই ঋণের মধ্যস্বত্বভোগী। পিকেএসএফ থেকে এনজিওরা ২ থেকে ৫ শতাংশ হারে ঋণ নিয়ে প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ ফ্লাট রেটে এই ঋণ বিতরণ করে। আর লাভের বিরাট অঙ্কটা ভোগ করে এনজিওগুলো। বাংলাদেশের মোট কৃষকের মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি কৃষক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক। এদের মাঝে পিকেএসএফের উদ্ভাবনী কৃষি অর্থায়ন কার্যক্রমের আওতায় ১৪ লাখ কৃষষকের মাঝে ১০ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করে গত অর্থবছরে। এই ঋণ বিতরণের মাধ্যম হলো বিভিন্ন এনজিও।
পিকেএসএফ প্রবর্তিত সাশ্রয়ী আবাসন অর্থায়নের আওতায় ১১ হাজার ২৭৭টি পরিবারকে ৩২৮.৩৫ কোটি টাকার ঋণ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে তাও মধ্যস্বত্বভোগী এনজিওর মাধ্যমে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সহযোগী সংস্থাগুলোর (এনজিওর) মাধ্যমে পিকেএসএফ ৩৫ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার মাঝে ৭২ হাজার ৬২০ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। দেশে প্রান্তিক পর্যায়ের কোনো কৃষকই ঋণখেলাপি না। সরকারের উচিত কথিত বড় শিল্পপতি খেলাপির পাশে কৃষক খেলাপিদের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা।
দেশের তৃণমূল পর্যায়ে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বিতরণ করা ঋণটা আসে মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে। এরা বিরাট অঙ্কের একটা সুদ ভোগ করে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ঋণ কোনো প্রকার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। ৪৬ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান সঠিক রাখতে হলে প্রান্তিক পর্যায়ে ঋণ বিতরণ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগী এনজিওদের কর্তৃত্ব খর্ব করাটা জরুরি। সরকারি সংস্থাগুলোর সরাসরি প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে ঋণ বিতরণ করা উচিত।
উন্নয়নকর্মী
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/আআ