বঞ্চনার বৃত্তে প্রাইভেট শিক্ষকরা

আমানুর রহমান

মতামত

শিক্ষাব্যবস্থার এক অদৃশ্য অথচ অপরিহার্য চালিকাশক্তি হলো গৃহশিক্ষকতা বা প্রাইভেট টিউটরিং, যা বিশ্বজুড়ে এখন ‘শ্যাডো এডুকেশন’ বা ছায়া শিক্ষাব্যবস্থা নামে

2026-07-16T09:46:19+00:00
2026-07-16T09:46:19+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬,
১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
মতামত
বঞ্চনার বৃত্তে প্রাইভেট শিক্ষকরা
আমানুর রহমান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬, ৯:৪৬ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
শিক্ষাব্যবস্থার এক অদৃশ্য অথচ অপরিহার্য চালিকাশক্তি হলো গৃহশিক্ষকতা বা প্রাইভেট টিউটরিং, যা বিশ্বজুড়ে এখন ‘শ্যাডো এডুকেশন’ বা ছায়া শিক্ষাব্যবস্থা নামে পরিচিত। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিক্ষা সংস্থার সমীক্ষা অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রায় সত্তর শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের পাঠ্যক্রমের ঘাটতি পূরণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রাইভেট শিক্ষকের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। শ্রেণিকক্ষের নির্ধারিত চল্লিশ বা পঞ্চাশ মিনিটের গণ্ডির বাইরে একজন শিক্ষার্থীর সুপ্ত মেধা বিকাশে এবং পড়াশোনার অন্তর্নিহিত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে গৃহশিক্ষকরাই সবচেয়ে কার্যকর ও প্রধান ভূমিকা পালন করেন। অথচ আমাদের সমাজের বিশাল একটি অংশ এই নিভৃতচারী শিক্ষাগুরুদের প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি দিতে আজও মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থাকায় তাদের এই অমূল্য অবদানকে অনেক সময়ই কেবল ব্যবসায়িক বা আর্থিক লেনদেন হিসেবে দেখা হয়, যা একজন প্রকৃত শিক্ষকের আত্মমর্যাদাকে প্রতিনিয়ত গভীরভাবে আহত করে। আমাদের সমাজকে এই কঠিন বাস্তবতা অনুধাবন করতে হবে যে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ড গঠনে এই নেপথ্য কারিগরদের নিরলস অবদান মূলধারার শিক্ষকদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

সম্মান ও পেশাগত স্বীকৃতির প্রশ্নে প্রাইভেট শিক্ষকরা যুগ যুগ ধরে এক অদ্ভুত সামাজিক অবজ্ঞার শিকার হয়ে আসছেন। ইউনেস্কোর ‘গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট’র তথ্যমতে, দক্ষিণ এশিয়ার স্কুলগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত বৈশ্বিক আদর্শ মানের চেয়ে অনেক বেশি; বাংলাদেশে যা গড়ে ১:৪০ বা ক্ষেত্রবিশেষে তার চেয়েও অধিক। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভিড়ে শ্রেণিকক্ষে প্রতিটি শিশুর প্রতি শিক্ষকের আলাদা নজর দেওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক এই বিশাল শূন্যস্থানটি অত্যন্ত দক্ষতা ও মমতার সঙ্গে পূরণ করেন গৃহশিক্ষকরা। দেশের হাজার হাজার বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেধাবী তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ পেশাজীবীরা প্রতিদিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে এই মহান দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেছেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, অনেক অভিভাবকই নিজের অজান্তে প্রাইভেট শিক্ষককে স্রেফ একজন ‘ভাড়ায় খাটা’ সাধারণ কর্মী হিসেবে বিবেচনা করেন। অকারণে খবরদারি করা বা অসম্মানজনক আচরণ করার মতো মানসিকতা কেবল একজন শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদাকেই ক্ষুণ্ন করে না, বরং শিক্ষার্থীর কোমল মনেও শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে ওঠার পথে এক অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর তৈরি করে। সত্যিকারের আলোকিত সমাজ নিশ্চিত করতে হলে সর্বাগ্রে শিক্ষককে- তিনি প্রাতিষ্ঠানিক হোন বা ব্যক্তিগত, তার প্রাপ্য সামাজিক স্বীকৃতিটুকু নিঃশর্তভাবে প্রদান করতে হবে।

সম্মান ও স্বীকৃতির অভাবকে ছাপিয়ে গৃহশিক্ষকদের পারিশ্রমিকের বিষয়টি চরম বৈষম্য ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ঘেরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিভিন্ন সময়ের মূল্যস্ফীতির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত এক দশকে জীবনযাত্রার ব্যয়, যাতায়াত খরচ ও দ্রব্যমূল্য বহুগুণ বাড়লেও সেই অনুপাতে গৃহশিক্ষকদের পারিশ্রমিকের কোনো যৌক্তিক পরিবর্তন হয়নি। বরং মাস শেষে অনেক আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন শিক্ষককে তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিকের জন্য অভিভাবকদের কাছে সংকোচের সঙ্গে ধরনা দিতে হয়; এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অদ্ভুত সব অজুহাতে তা বকেয়াও রাখা হয়। দেশের হাজারো মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী মূলত এই টিউশনির সামান্য আয়ের ওপর নির্ভর করেই নিজেদের উচ্চশিক্ষা ও পরিবারের চাকা সচল রাখেন। কিন্তু কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা, সংগঠন বা শ্রমিক অধিকারের সুনির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় না থাকায় গৃহশিক্ষকদের পারিশ্রমিক নির্ধারণে প্রতিনিয়ত চরম অবমূল্যায়ন ঘটে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট ঠেলে যাতায়াত, পড়ানোর পূর্বপ্রস্তুতি এবং মেধার যে নিরবচ্ছিন্ন বিনিয়োগ তারা করেন, মাস শেষে প্রাপ্ত অর্থ সেই হাড়ভাঙা পরিশ্রমের সিকি ভাগও মূল্যায়ন করতে পারে না। পারিশ্রমিক নিয়ে বাজারের পণ্যের মতো এ ধরনের দরকষাকষি এবং অবমূল্যায়ন কেবল একজন শিক্ষকের ঘামের অবমাননা নয়, এটি সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থারই এক নীরব অবক্ষয়।

একটি সুস্থ, মেধাভিত্তিক ও উন্নত সমাজ বিনির্মাণে প্রাইভেট শিক্ষকদের অবদানকে আর কোনোভাবেই প্রান্তিক বা খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তাদের অক্লান্ত শ্রম, মেধা ও নীরব ত্যাগের ওপর ভর করেই লাখো শিক্ষার্থী কাক্সিক্ষত ফলাফল অর্জন করে এবং দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের মজবুত ভিত রচিত হয়। তাই গৃহশিক্ষকতাকে কেবল একটি খণ্ডকালীন পেশা বা বেকারত্বের সাময়িক সমাধান হিসেবে অবজ্ঞা না করে, একে একটি অত্যন্ত সম্মানজনক ও গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক পেশা হিসেবে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন আনার পাশাপাশি পারিশ্রমিক প্রদান ও নির্ধারণে অনেক বেশি মানবিক, শ্রদ্ধাশীল ও যৌক্তিক মাপকাঠি অনুসরণ করা অপরিহার্য। যেদিন আমরা একজন প্রাইভেট শিক্ষককে কেবল অর্থের বিনিময়ে বিদ্যাদানকারী কোনো কর্মী না ভেবে, সন্তানের মানসিক ও বৌদ্ধিক বিকাশের একজন পরম আত্মীয় ও অবিচ্ছেদ্য অভিভাবক হিসেবে মন থেকে মেনে নিতে পারব, ঠিক সেদিনই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তার কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, স্নাতক, হাবীবুল্লাহ বাহার কলেজ, ঢাকা

সময়ের আলো/জেডআই


  বিষয়:   প্রাইভেট শিক্ষক  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: