ডেঙ্গু মোকাবিলা হতে হবে কৌশলী

কর্নেল নাজমুল হুদা খান

মতামত

বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই বাংলাদেশে ডেঙ্গু একটি বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়। চলতি বছরও এর ব্যতিক্রম নয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের

2026-07-16T09:06:54+00:00
2026-07-16T09:06:54+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬,
১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
মতামত
ডেঙ্গু মোকাবিলা হতে হবে কৌশলী
কর্নেল নাজমুল হুদা খান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬, ৯:০৬ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই বাংলাদেশে ডেঙ্গু একটি বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়। চলতি বছরও এর ব্যতিক্রম নয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন নতুন করে ডেঙ্গুতে রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে বরিশাল, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা অঞ্চলে আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডেঙ্গুকে প্রথম দশটি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির অন্যতম হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাদের হিসাব মতে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪ বিলিয়ন মানুষ ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে, যাদের ৭০ ভাগই এশিয়া মহাদেশের বাসিন্দা। আঞ্চলিক সংক্রমণের তালিকায় রয়েছে ১৩০টিরও বেশি দেশ। ১৯৯০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিন দশকে সংক্রমণের হার বেড়েছে ৮৫ শতাংশ। এভাবে চলতে থাকলে এ শতকের শেষ দিকে পৃথিবীর ৬০ ভাগ মানুষ ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকবে।

বাংলাদেশে ২০০০ সালে প্রথম ডেঙ্গু মহামারি আকারে দেখা দেওয়ার পর থেকে এর ধরন ও প্রকৃতির নানাবিধ পরিবর্তন ঘটেছে। বেড়েছে সংক্রমণের ঝুঁকি ও মৃত্যু হার। কালের পরিক্রমায় ডেঙ্গু সংক্রমণের সময়েরও পরিবর্তন ঘটেছে। বাংলাদেশে ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য বর্ষাকাল (জুন-সেপ্টেম্বর), বর্ষাপরবর্তী সময়কাল (অক্টোবর-নভেম্বর) এবং বিশেষ করে সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ ডেঙ্গু সংক্রমণের মাস হিসেবে তথ্য-উপাত্তে উল্লেখ রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, একুশ শতকের শেষের দিক বাংলাদেশে সারা বছরই ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হবে।

ডেঙ্গুর একটি বিশেষ ধরনের ভাইরাসের সংক্রমন ঘটলে শরীর যে প্রতিরোধ ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়; তাতে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে ওই ভাইরাসের সংক্রমণের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। কিন্তু ডেঙ্গু ভাইরাসেরও ধরনে পরিবর্তন ঘটছে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ২০০০-০২ সালের সংক্রমণে ডেঙ্গু ভাইরাসের ডিইএনভি-৩ এর আধিক্য ছিল। তবে ২০১৩-১৬ সালের দিকে ডিইএনভি-১ ও ডিইএনভি-২ ছিল সংক্রমণের মূল ধরন। ২০১৯ সালে পুনরায় ডিইএনভি-৩ এর আবির্ভাব ঘটে। অন্য ধরন ডিইএনভি-৪ এর উপস্থিতি না থাকলেও যেকোনো সময় এর সংক্রমণ ঘটবে না; সে শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

প্রকৃতি এবং উপসর্গেও পরিবর্তন ঘটেছে এ রোগের। ২০০০ সালের প্রথম মহামারিতে শতকরা ১০০ ভাগ রোগীর জ্বর, ৯০ ভাগের মাথা ব্যথা, ৮৫ ভাগের হাড়জোড়ে ব্যথা ছিল অন্যতম প্রধান উপসর্গগুলো। শতকরা ৫০ ভাগ রোগীর রক্তপাত সংক্রান্ত উপসর্গ যথা: পায়খানার সঙ্গে রক্ত পড়া ও মাড়িতে রক্ত পড়া দেখা যেত। শতকরা ১ ভাগেরও কম রোগীর ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম পাওয়া যেত। কিন্তু ২০১৯ সালের মহামারিতে জ্বরের সঙ্গে প্রধান উপসর্গ ছিল পেটে ব্যথা ও বমি; হাড়জোড়ে ব্যথা ছিল খুবই নগণ্য। রক্তপাতসংশ্লিষ্ট উপসর্গের হার ছিল খুব কম। তবে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১০ শতাংশ। সুতরাং এটি স্পষ্ট যে, ডেঙ্গু কালের বিবর্তনে ধরন ও প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটিয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

সাধারণত টায়ার, ব্যারেল, প্লাস্টিকের ড্রাম ও জেরিকেনের মধ্যে জমা পরিষ্কার পানিতে বংশবৃদ্ধি করা পছন্দ করে। এ ছাড়া এদের বংশবৃদ্ধির জন্য আদর্শ আউটডোর স্থানগুলো হচ্ছে- বেলকনিতে থাকা গাছের পাত্র, এসির ট্রে, মাটির পাত্র ইত্যাদি। ইনডোরে ফ্রিজের ট্রে, রান্নাঘরের যার্ক, রান্নাঘর বা বাথরুমের পানি জমে থাকা ড্রেন, কুলার, বাথরুম বা সিস্টার্নে থাকা লিকেজ। অব্যবহৃত খোলা বালতি বা পানির পাত্র, ঘর সাজানোর ফুলের টব বা বনসাই প্লান্ট টব বা ইনডোর প্লান্ট টব ইত্যাদিও এর প্রজননস্থল। ঘরের ভেতরে বা বাইরে থাকা এসব স্থান দ্রুত পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। যে পানিতে এডিস মশা ডিম দিয়েছে, তা ফেলে দিলেই ডিম ধ্বংস হয়ে যাবে। এ ছাড়া সে পানিতে তেল ঢেলে, সাবান দিয়ে কিংবা ভিনেগার মিশিয়ে ডিম ধ্বংস করা যায়।

মশার বাসস্থান কিংবা বংশবৃদ্ধির স্থানে মশার ওষুধ ফগিং বা স্প্রে করে মশা ও লার্ভা ধ্বংস করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে মশার এসব কেমিক্যালের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্যান্স সৃষ্টি হয় ও কেমিক্যালগুলো ব্যয়বহুল; উপকরণ, উচ্চমাত্রার কেমিক্যালস মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক। তাই এসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

মশার কামড় থেকে প্রতিকার পেতে ব্যক্তিগত প্রতিরোধ ব্যবস্থাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু এডিস মশা দিনের বেলা কামড়ায়, তাই কামড় প্রতিরোধে, বাইরে গেলে ফুলহাতা জামা ও প্যান্ট কাযর্করী। এ ছাড়া ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার, শরীরের খোলা অংশে রেপেলেন্ট ব্যবহার, মশা প্রতিরোধী অ্যারোসোল, কয়েল বা ফাস্ট কার্ড, মসকুইটো কিলার বাল্ব, ল্যাম্প, কয়েল, কিলার ব্যাট, রেপেলার মেশিন, কিলার ট্র্যাপ ইত্যাদির ব্যবহারের মাধ্যমে নিরাপদে মশার প্রতিরোধ করা যেতে পারে। বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য না হলেও জৈব ও জেনেটিক প্রযুক্তিতে মশা নিয়ন্ত্রণ অনেক ক্ষেত্রে উপযোগী ও কার্যকরী। ডেঙ্গু ভ্যাকসিন ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে সংক্রমণ, রোগের তীব্রতা, হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যু রোধ করে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গু ভাইরাস ১-৪ এর বিরূদ্ধে কার্যকরী ডেঙ্গু ভ্যাকসিন সফলতা পেয়েছে। তাই আর্থ-সামাজিক দিক বিবেচনায় শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের এ টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা ফলপ্রসূ হতে পারে।

সীমিত স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা, অবকাঠামো, জনবল ও প্রস্তুতির মধ্যেও আমাদের দেশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান ডেঙ্গু রোধে সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছে। দেশের সব জেনারেল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু ওয়ার্ড ও কর্নার খোলা হয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সম্ভব সব প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষার সামগ্রী পাঠানো হচ্ছে সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। সংশ্লিষ্ট ব্লাড ব্যাংকগুলোকে সক্রিয় ও প্রয়োজনীয় রক্তের মজুদ বৃদ্ধির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশনগুলোতে জনসচেতনতা বাড়ানো ও প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে জরিমানা করছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ মশকের বংশবৃদ্ধি ও মশা নিয়ন্ত্রণ কাজ করছে। ডেঙ্গু মহামারি নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলে সারা দেশে এর প্রতিরোধ যুদ্ধ জোরদার করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিস মশার বংশবৃদ্ধির মূলে আঘাত হানতে হবে। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে টেকসই প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে তথ্য সমৃদ্ধ জরিপ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ছক প্রস্তুত, ডেঙ্গু ভাইরাসের ধরন ও গতি-প্রকৃতির ওপর গবেষণা এবং সারা দেশে দ্রুত সহজলভ্য রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব হলে আমরা দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিমুক্ত হতে সক্ষম হব।

ডেঙ্গু মহামারির বিরুদ্ধে যুদ্ধটি সমাজের সবার, সব স্তরের মানুষের। সবার হাতে হাত মিলিয়ে শুধু নিজের ঘরে বা আঙিনায় এডিস মশার বংশবৃদ্ধির ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান থাকলে আজই ধ্বংস করে ফেলি। এডিস মশার বংশবৃদ্ধি রুখে দেওয়ার প্রাথমিক কাজটিতে সফল হলেই এ মহামারির বিরুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব।

লেখক : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, পরিচালক মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল

সময়ের আলো/জেডআই


  বিষয়:   ডেঙ্গু  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: